সুষ্ঠু নির্বাচনের দৃষ্টান্ত দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৩, ০৪:২৩ এএম

বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন। তিনি বলেন, বিশ্ব বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা চাইছি তারা (বাংলাদেশ) অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে উদাহরণ তৈরি করুক। গত সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে স্টেট ডিপার্টমেন্টে  বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ তাগিদ জানান। যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রত্যাশার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন দ্বাদশ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে বলে নিশ্চিত করে বলেন, বাংলাদেশে একটি ‘মডেল’ নির্বাচন হবে। এরইমধ্যে সরকার সব ধরনের পরিবেশ তৈরি করেছে। আর এ বিষয়ে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাই।

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের সম্পর্কের ৫০ বছর উপলক্ষে ব্লিঙ্কেনের আমন্ত্রণে ওয়াশিংটন সফর করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন। দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য মতে, ড. মোমেনের এই সফরে আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনই প্রাধান্য পেয়েছে। এ সময় মোমেন আরও বলেন, শুধু সরকার নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে পারবে না। সেজন্য সব বিরোধী দলকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হবে না। ইতিমধ্যে সরকার সব ধরনের পরিবেশ তৈরি করছে। ব্লিঙ্কেন যখন দৃষ্টান্তমূলক নির্বাচনের কথা বলেন তখন মোমেন বলেছেন সবার সহযোগিতার মাধ্যমেই সরকার একটি মডেল নির্বাচন করতে চায়। এরইমধ্যে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা সব রাজনৈতিক দলকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

মোমেন বৈঠকে বলেছেন, নির্বাচন কমিশন এই সরকারের অধীনে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বৈঠকে বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

এদিকে এই বৈঠক সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তি ও মোমেনের বক্তব্যের ভিডিও থেকে জানা যায়, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে ড. এ কে আব্দুল মোমেন একটি সংবাদ সম্মেলনে বৈঠক সম্পর্কে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে একটি মডেল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি ব্লিঙ্কেনকে নিশ্চয়তা দিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেছেন।

নির্বাচন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করার পাশাপাশি এই নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যবেক্ষক পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানান ড. মোমেন। তিনি বলেন, আমরা বলেছি নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হবে। আমরা তোমাদের পর্যবেক্ষকদের স্বাগত জানাই। তবে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দলীয় মনোভাবাপন্ন কেউ যাতে পর্যবেক্ষক না হয়, সেটাও আমরা তাদের বলেছি।

মোমেন বলেন, এছাড়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে যেমন কথা হয়েছে, তেমনি, ব্যবসায় বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলো উঠে এসেছে বৈঠকে।

বৈঠকের শুরুতে ব্লিঙ্কেন বলেন, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ব্যাপক পরিসরে, যা বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিকভাবে, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক, জলবায়ু পরিববর্তন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসহ প্রভৃতি খাতে দুই দেশ একযোগে কাজ করে আসছে।

মিয়ানমারে সেনা নিপীড়নের মুখে দেশটি থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মানবিক আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবাধিকারের পাশাপাশি সম্পর্ককে শক্তিশালী ও গভীর করার উপায় খুঁজে বের করার জন্য একসঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম প্রতিরোধে জিরো টরালেন্স দেখাবে বাংলাদেশ। দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা যেসব ঘটনা ঘটছে, নির্যাতনের কথা বলা হচ্ছেÑ তা বিচ্ছিন্ন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বাংলাদেশ সরকারও চায়, এ কারণে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিতে ভোটের সিস্টেম পরিবর্তন করা হচ্ছে। 

বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পাঠাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ জানিয়েছেন বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ড. মোমেন মার্কিন সরকারকে কভিড-১৯ মোকাবিলায় উদার সহায়তা এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে প্রেরিত উষ্ণ বার্তার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেরিত একটি চিঠি হস্তান্তর করেন।

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ ইমরান, দূতালয় উপপ্রধান ফেরদৌসী শাহরিয়ার, মহাপরিচালক (উত্তর আমেরিকা) খন্দকার মাসুদুল আলম এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কাউন্সেলর ডেরেক শোলে, জনসংখ্যা, শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট মিস জুলিয়েটা ভালস নয়েস, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং শ্রম বিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অফ স্টেট কারা ম্যাকডোনাল্ড, দক্ষিণ এবং মধ্য এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অফ স্টেট আফরিন, ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের মানবাধিকার ইস্যুতেও সমালোচনা করেছে দেশটি। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের নানা তৎপরতা নিয়ে খোলাখুলিভাবে সমালোচনা করেছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও মন্ত্রীরা। এদিকে সোমবার বাংলাদেশের সংসদে এক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছেন।

ওয়াশিংটনে সোমবার বৈঠকের আগে ব্লিঙ্কেন বলেন, দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং মানবাধিকার ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে যাচ্ছে।

ডিজিটাল আইনে সাংবাদিক হয়রানিতে উদ্বেগ : ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যবহারসহ নানাভাবে বাংলাদেশে সাংবাদিক ও সুশীল সমাজকে ভয় দেখানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন।

গতকাল ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখ্য উপমুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল ব‌লেন, ব্লিঙ্কেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে গণমাধ্যম এবং সুশীল সমাজের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং ভয় প্রদর্শনের বিষ‌য়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নিয়ে সমালোচনা আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত