গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও চোখের জলে গতকাল বৃহস্পতিবার দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ গরিবের ডাক্তারখ্যাত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে শেষবারের মতো বিদায় জানিয়েছেন। আজ শুক্রবার বাদ জুমা জানাজা শেষে সাভারে তার প্রতিষ্ঠিত গণবিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দাফন করা হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তৃতীয় দফা জানাজার আগে তার একমাত্র ছেলে বারিশ চৌধুরী জানান, তার মরদেহ দান করা হবে না। সাভার গণবিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দাফন করা হবে।
গত মঙ্গলবার রাত ১১টায় রাজধানীর ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থান মারা যান জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। বার্ধক্যজনিত সমস্যাও দেখা দিয়েছিল তার। তার ছেলে বারিশ চৌধুরী পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন বেলার সদস্য হিসেবে কাজ করছে। একমাত্র মেয়ে দেশের বাইরে স্টাফ নার্স হিসেবে কাজ করেন। তবে বাবার অসুস্থতার খবরে আগেই দেশে ফিরেছিলেন।
গতকাল সকালে চৈত্র সংক্রান্তিতে তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হন শত শত মানুষ। সেখানে নির্মিত একটি অস্থায়ী মঞ্চে রাখা হয় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মরদেহ। এ সময় পাশে ছিলেন স্ত্রী শিরীন হকসহ পরিবারের সদস্যরা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে গার্ড অব অনার দেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) হেদায়েতুল ইসলাম।
জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জানাজায় অংশ নেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম আমীর-উল ইসলামসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। পরে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জাফরুল্লাহ চৌধুরী একজন আদর্শ বাঙালি। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। খবরের কাগজে কেউ কেউ লিখেছেন ‘পিপলস ডক্টর’। সাধারণ মানুষের ডাক্তার শুধু নন, সাধারণ মানুষের জন্য একজন খাঁটি, অকৃত্রিম বাঙালি। আমাদের বর্তমান চিকিৎসা সম্বন্ধে পরিবর্তন বা দৃষ্টিভঙ্গির নতুন চিন্তার পথিকৃৎ তিনি।’
জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মরদেহে বিএনপির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে তার অসাধারণ ভূমিকা এবং তার গণস্বাস্থ্যের যে ধারণা সাধারণ মানুষ যেন স্বাস্থ্যসেবা পায়, সবার কাছে যেন এটি পৌঁছায়, সে জন্য তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন। তার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতাল, ওষুধ, ওষুধ নীতি সবগুলোই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এটি ছিল তার স্বপ্ন। তার স্বাস্থ্যনীতি, যেভাবে তিনি করতে চেয়েছেন পুরোপুরি হয়তো করতে পারেননি। যদি করতে পারতেন তাহলে দেশের সবাই স্বাস্থ্যসেবা পেত।’
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আজকে আমরা গর্ব করি যে, আমাদের ওষুধ ৩০০ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়। সেই ওষুধ প্রণয়নে তার ছিল অবিচল প্রচেষ্টা এবং সেই প্রচেষ্টায় এটা সম্ভব হয়েছে। আমি বলব, তিনি রাজনীতি করেননি ঠিকই কিন্তু রাজনীতিতে বিবেকের কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি থেকেছেন এবং মানুষকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।’
গণ অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘কয়েকশ বছর পরপর একটি জাতিতে এমন একজন মানুষ জন্মায়। আমি উনাকে মনে করি আমাদের অঘোষিত অষ্টম বীরশ্রেষ্ঠ। তিনি ছিলেন প্রেরণার উৎস।’
কবি ও প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তার মৌলিক জায়গা ছিল গণস্বাস্থ্য। জাফরুল্লাহ একদিকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা, আজকে আমরা সেই হিসেবে তাকে সম্মান দিয়েছি। যারা তাকে সম্মান দিয়েছেন তাদের কাছেও আমরা কৃতজ্ঞ। তরুণদের কাছে আমার আবেদন হবে, তার কাছ থেকে শেখা যে, জীবন বলতে কী বোঝায়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘নানা মাত্রায় নানা বিবেচনায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দীর্ঘদিন মানুষের মনে থাকবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তিনি সম্মান পেয়েছেন।’
পরে দুপুর আড়াইটার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে তার একমাত্র ছেলে বারিশ চৌধুরী বলেন, ‘আমার বাবার সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল, তার দেহ মেডিকেল সায়েন্সের জন্য দান করে যাবেন। আমরা প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে দান করতে চেয়েছিলাম। দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগও করেছি। তবে তারা সম্মান দেখিয়ে বলেছে, বাবার গায়ে ছুরি লাগাতে পারবেন না। তারা শ্রদ্ধা থেকেই এটি জানিয়েছেন। আমাদেরও আর এখানে কিছু করার নেই। তাই আগামীকাল সাভারে (গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে) জানাজা শেষে সেখানে তাকে দাফন করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, কিন্তু দেশ স্বাধীন হলেও তার যুদ্ধ শেষ হয়নি। তার যুদ্ধ শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চলেছে।’
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জানাজা শেষে বিকেল ৪টায় ধানম-ি গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চতুর্থ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তারপর মরদেহ ফ্রিজাব ভ্যান অ্যাম্বুলেন্স গাড়িতে সাভার গণস্বাস্থ্যে কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে সাভার গণস্বাস্থ্যে কেন্দ্রে মরদেহসহ গাড়ি থাকবে। বাদ জুমা সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেইন গেটের বাম পাশে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে কবর দেওয়া হবে। এর আগে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত মরদেহ সর্বসাধারণের দেখার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
