বেরিয়ে এসেছে থলের বেড়াল। কেন নারী ফুটবলারদের অলিম্পিক বাছাইতে খেলতে পাঠানোর জন্য বিশাল অঙ্কের টাকা চেয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, কেন অযৌক্তিক দামে তারা জার্সি বল ও মোজা কিনতে চেয়েছিল সেসবের নেপথ্য কারণ বেরিয়ে আসছে একে একে। আর্থিক অনিয়ম এবং ফিফার দেওয়া তহবিলের অর্থের সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়াতে বাফুফের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগকে ২ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে ফিফা। সেই সঙ্গে করেছে জরিমানা। সোহাগের এই আর্থিক অনিয়মে শাস্তি পাওয়াটা প্রমাণ করে বাফুফের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি সংস্কৃতি, সর্বোচ্চ মহলের পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে যা আদতে সম্ভব নয়।
আর্থিক কেলেঙ্কারির দায়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগের নিষিদ্ধ হওয়াকে দেশের জন্য লজ্জার বলে মন্তব্য করেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এমপি। শনিবার দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘দিনের পর দিন যে তারা (বাফুফে) অন্যায়গুলো করেছে, এটা আজ প্রমাণিত। তারা যে আমাদের ভাবমূর্তি সংকটে ফেলেছে, এতে আমরা খুবই লজ্জিত এবং আমি মনে করি এই ধরনের মানুষদের বিচার হওয়া উচিত।’ বাফুফের নির্বাহী কমিটি থেকে পদত্যাগ করা সাবেক ফুটবলার আরিফ হোসেন মুন বলেন, ‘সোহাগের দুর্নীতি ধরা পড়েছে মানে ফুটবলের সব ভালো হয়ে যাবে, এমন কল্পনা করা কঠিন নয়। তবে আমি নিজে এই ফেডারেশনে থেকে ফুটবলে দুর্নীতি ও অনিয়মের যে রূপ দেখেছি, এখান থেকে খেলাটিকে বাঁচানো কঠিন।’ তিনিও মনে করেন সর্বোচ্চ মহলের প্রশ্রয় না পেলে এত অনিয়ম করা সম্ভব নয় সোহাগের পক্ষে, ‘সোহাগ ফুটবল ফেডারেশনের কর্মচারী। তার একা কিছু করার সাধ্য নেই। মনিবের সায় ছাড়া একজন কর্মচারী কখনো এ পর্যায়ে অনিয়ম-দুর্নীতি করতে পারে না। সে এত কিছু করছে কিন্তু ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান ও বাফুফে সভাপতি জানেন না, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’
বাফুফে অবশ্য অতীতে অনেকবারই শাস্তির মুখে পড়েছে ফিফার। সেটা বেশিরভাগ সময়েই কোচদের বেতন ঠিক মতো না দেওয়ার কারণে। ফিফার অর্থ খরচে অনিয়মের দায়ের মতো বড় কলঙ্ক নিয়ে সাধারণ সম্পাদকের নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানার মতো বড় শাস্তি এবারই প্রথম। ১ জানুয়ারি ২০১৭ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, এই সময়ের ভেতরকার লেনদেনে বড় অঙ্কের ফাঁক আবিষ্কার করে ফিফার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কন্ট্রোল রিস্কস। তাদের পরামর্শে এই সময়ে বাফুফের আর্থিক হিসাব-নিকাশ খতিয়ে দেখে বিডিও এলএলপি নামের একটি আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর্থিক তদন্তে বেরিয়ে আসে সোহাগের হাত ধরে বাফুফের অনেক আর্থিক কেলেংকারির খবর। তদন্তকারীরা (ইনভেস্টিগেটরি চেম্বার) বাফুফের লেনদেনে দুটি বড় গরমিল পেয়েছেন। মিথ্যে দলিল দস্তাবেজের ব্যবহার আর সন্দেহজনক লেনদেন।
২০২০ সালের জুন মাসে জাতীয় ফুটবল দলের খেলা সামনে থাকায় সে জন্য ন্যাশনাল টিমস কমিটি জার্সি ও অন্যান্য স্পোর্টসওয়্যার ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। আগ্রহী তিনটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ছিল স্পোর্টস লিঙ্ক, রবিন এন্টারপ্রাইজ ও স্পোর্টস কর্নার। সোহাগসহ পাঁচজন মিলে স্পোর্টস লিঙ্কের পক্ষে ক্রয়াদেশের অনুমোদন দেন। ক্রয়াদেশের পরিমাণ ছিল ৩০,০২৭ মার্কিন ডলার। তিনটি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহপত্রেই একই বানান ভুল দেখা যায়, তিনটির মুদ্রণ ও নকশা ছিল একই রকম। দুটো প্রতিষ্ঠান ছিল পাশাপাশি দুটো দোকান, একটি প্রতিষ্ঠানের মোবাইল নম্বর ছিল ভুল। এক দোকানের মালিক অন্য দোকানের কর্মচারী, এবং সই সাবুদ ছিল জাল। আর্থিক তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণ, এই সবগুলো কোটেশন ভুয়া, এবং একই ব্যক্তির তৈরি।
২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে, বাফুফে ১৩,৯২১ মার্কিন ডলারে ৪০০টি ফুটবল কেনে। সরবরাহকারী হিসেবে দরপত্র দেয় মারিয়া এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স এইচ ইউ জামান ট্রেডিং ও অফেলিয়াস ক্লজেট। সোহাগসহ মোট পাঁচজন মিলে অফেলিয়াস ক্লজেটের দরপত্র অনুমোদন করে ক্রয়াদেশ দেন। অথচ তদন্তে বেরিয়ে আসে, যে ঠিকানা দিয়েছে অফেলিয়াস ক্লজেট, সেই ঠিকানায় এমন কোনো দোকানই নেই। আর অফেলিয়াস ক্লজেটের ব্যবসা হচ্ছে মেয়েদের কাপড় সেলাইয়ের, তাদের কোনো আমদানির লাইসেন্সও নেই। অফেলিয়াস ক্লজেটের পক্ষ থেকে কোনো চালান দেওয়া হয়নি অথচ বাফুফে তাদের পুরো পাওনা পরিশোধ করেছে। আর্থিক নিরীক্ষকদের মত, এমন কোনো বল আদৌ কেনা হয়নি। এই ক্রয়াদেশ পুরোটাই বানোয়াট এবং অনেক অসংগতিপূর্ণ। এছাড়া অন্য দুই প্রতিষ্ঠানের দরপত্রে ফটোকপির ওপর স্বাক্ষর করা, মূলকপি নেই।
২০১৯ সালের নভেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ওমান সফরের জন্য বাফুফে বিমান টিকিট বাবদ আলমারওয়াহ ইন্টারন্যাশনালকে ১৯,৯২৫ মার্কিন ডলার পরিশোধ করে। এই ক্রয়ের বেলায় দরপত্র দিয়েছিল আরও দুটো প্রতিষ্ঠান, পূরবী ইন্টারন্যাশনাল আর মাল্টিপ্লেক্স ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস। এখানেও ফিফার তদন্তে বেরিয়ে আসে, পূরবী ইন্টারন্যাশনাল একটি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান যারা বিমান টিকিট সরবরাহ করে না। তিনটি দরপত্রেই একই রকম বানান ভুল এবং একই রকম ভাষার ব্যবহারে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের সন্দেহ, তিনটি দরপত্র একই প্রতিষ্ঠান পাঠিয়েছে। ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রামের তহবিল থেকে দুটো চেকের মাধ্যমে এই টিকিটের দাম শোধ করা হয়। তদন্তে ফিফা জানতে পারে পূরবী ইন্টারন্যাশনাল ও মাল্টিপ্লেক্স ট্র্যাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস এরকম কোনো দরপত্র জমা দেয়নি।
ঘাস ছাঁটার মেশিন (লনমোয়ার) কেনাতেও দুর্নীতির তথ্য এসেছে অনুসন্ধানে। একই রকম বানান ভুল তিন সরবরাহকারীর দরপত্রে, একই রকম নকশা, শারমিন এন্টারপ্রাইজের নম্বরে ফোন করলে ফোনের ওপাশ থেকে বলা হয় শোভা এন্টারপ্রাইজ। অথচ দুটো আলাদা প্রতিষ্ঠান। যাদের কাছ থেকে ক্রয় করা হয়েছে, সেই বাংলাদেশ হার্ডওয়্যারের রসিদে বানান দুই রকম, তারিখবিহীন দরপত্র এমন নানান অসংগতি। এছাড়াও জার্সি ক্রয়, পানির পাইপ মেরামতসহ নানান খরচের হাতে লেখা মেমো, ভাউচার এসব দেখিয়েছে বাফুফে। সবই অনুমোদন করেছেন সোহাগ। পানির পাইপ বদলে ৩ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে যা প্রশ্নবিদ্ধ।
এছাড়াও ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম, যা উন্নয়নশীল দেশে ফিফা একটি বিশেষ তহবিল যেখান থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু খাতে অর্থ ব্যয় করার কথা সেখান থেকেও অর্থ সরিয়েছেন সোহাগ। মহিলা ফুটবল দলের ভ্রমণ ও বেতনের খাতে ১০৭,৬৩৪ মার্কিন ডলার খরচের কোনো নথি দেখাতে পারেনি বাফুফে। জাতীয় দলের কোচ ও টেকনিক্যাল স্টাফদের বেতন নগদে পরিশোধ করা হয়েছে দেখানো হয়েছে আবার ব্যাংক লেনদেনেও দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ একই মানুষদের দুইবার বেতন দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক খরচ দুইবার করে দেখানো হয়েছে। নিয়ম ভেঙে ফিফা ফরোয়ার্ড তহবিল থেকে ক্লাবগুলোকে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে ১২৪,৫৩৫ ডলার, এর ভেতর ৫৩,৫৮৮ ডলার দেওয়া হয়েছে নগদ। এই লেনদেনের কোনো নথি নেই। দীর্ঘ ৫১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে এমন নানান আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ও প্রমাণ দিয়েছে ফিফা, যার কারণেই শাস্তি পেতে হয়েছে সোহাগকে।
