ভুয়া বিল-ভাউচার বানানো ও জালিয়াতির অভিযোগে বাফুফের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে ফিফা। তাতে মনটা বড্ড খারাপ বাফুফে বস কাজী সালাউদ্দিনের। কাছের লোকের বিরুদ্ধে ফিফার সিদ্ধান্ত মানতেও পারছেন না, আবার এড়াতেও পারছেন না। কষ্ট বুকে চেপে দীর্ঘদিনের দোসরকে পাকাপাকি বিদায়ের কঠিন সিদ্ধান্ত গতকাল নিতে হয়েছে সালাউদ্দিন ও তার নেতৃত্বাধীন নির্বাহী কমিটিকে। তবে সোহাগের আপৎকালীন বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন দীর্ঘদিনের একান্ত সচিব ইমরান হোসেন তুষারকে। এমন নিয়োগে ফুটবল সংশ্লিষ্ট অনেকেই ইমরানকে সোহাগের ছায়া হিসেবেই মনে করছেন। তাদের শঙ্কা, ইমরান সামনে থাকবেন পুতুল হয়ে। পেছন থেকে কলকাঠী নাড়বেন সোহাগই।
গতকাল বিকেলে দেড় ঘণ্টার জরুরি সভা শেষে বাফুফে সভাপতিকে বেশ ম্রিয়মাণ মনে হয়েছে। সেভাবে তিনি কথাও বলেননি। অবশ্য তাকে কথা বলার সুযোগই দেননি সিনিয়র সহসভাপতি সালাম মুর্শেদী। আগ বাড়িয়ে একের পর এক প্রশ্নের উত্তর নিজের মতো করেই দিয়েছেন এই সংগঠক। প্রশ্নগুলোর সঙ্গে উত্তরের সাদৃশ্য মেলেনি অনেক ক্ষেত্রেই। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই সালাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা জরুরি সভা করেছি সাধারণ সম্পাদকের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে। নতুন করে সাধারণ সম্পাদক নেব। তবে তার আগে একজন ভারপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া আমরা একটা বিশেষ কমিটি করেছি, যা হয়েছে তা তদন্ত করে দেখার জন্য। চার সহসভাপতি ছাড়াও কমিটিতে থাকবেন তিন নির্বাহী সদস্য এবং অডিট কমিটির তিনজন। তারা ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেবেন কীভাবে এসব হয়েছে এবং কেন হয়েছে। আমরা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আপনাদের ৩০ দিনের মধ্যে দেব। বিষয়টি আপনাদের যেমন পছন্দ হয়নি, তেমনি আমাদেরও পছন্দ হয়নি। আমরা নিশ্চিত করতে চাই যাতে এ রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি জীবনে আর কখনো না ঘটে।’
এরপর সালাম মুর্শেদি ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বাফুফে সভাপতির সাত বছরের পিএস এবং প্রটোকল ম্যানেজার ইমরান হোসেন তুষারের নাম বলেন। এরপরই সোহাগের পথ রুদ্ধ করার কথা জানিয়ে সালাম বলেন, ‘সাধারণ সম্পাদক দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছে ফিফার মাধ্যমে। পরে যাতে আর সে কখনো বাফুফেতে কাজ করতে না পারে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাফুফের প্রশাসনিক কাজগুলো চালিয়ে নিতে আমরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে ইমরান হোসেন তুষারকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে তিন মাসের জন্য নিয়োগ দিচ্ছি। এই নিয়োগ বড়জোর ছয় মাস। এর মধ্যে নিয়মের মাধ্যমে পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সাধারণ সম্পাদক নিয়োগ দেব।’ সোহাগ কোনো দুর্নীতি করেননি, তবে কিছু কেনাকাটার প্রক্রিয়া ঠিকমতো করেননি বলেই শাস্তি পেয়েছেন দাবি করেছেন সালাম। বাফুফের ফিন্যান্স কমিটির সভাপতি বলেই সংবাদ সম্মেলনের প্রায় পুরোটা সময় তিনি নিজেকে এবং ফিন্যান্স কমিটিকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করে গেছেন, ‘ফিফার ৫১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ফিন্যান্স কমিটিকে নিয়ে কোনো কথা বলা হয়নি। শেষ তিন বছরে ফিন্যান্স কমিটির অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটেছে। ফিফা ও এএফসি থেকে তদন্ত করতে যারা এসেছে, তারা আমাদের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। আমরা নগদ টাকা ব্যবহার কমিয়েছি এখন অ্যাকাউন্ট পেয়ি চেকের মাধ্যমে লেনদেন হয় শতকরা প্রায় ৯৮ ভাগ। এখানে কোনো দুর্নীতির বিষয় লেখা হয়নি। হয়েছে ক্ষমতার অপব্যাবহার। তাই তার (সোহাগের) ফেরার কোনো সুযোগ আমরা রাখিনি।’
এদিকে সোহাগকান্ড তদন্তে ১০ সদস্যের কমিটি করেছে বাফুফে। চার সহসভাপতি ইমরুল হাসান, কাজী নাবিল আহমেদ, আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক, মহিউদ্দিন আহমেদ মহির সঙ্গে নির্বাহী সদস্য সত্যজিৎ দাস রূপু, জাকির হোসেন চৌধুরী ও ইলিয়াস হোসেন আছেন তদন্ত কমিটিতে। এ ছাড়া অডিট কমিটির তিনজন মিলে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেবেন। একই সঙ্গে সোহাগের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করা হবে কি না, সেটা তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখবে বলে জানান সালাম।
মাগরিবের আজানের মিনিট খানেক আগে শেষ হওয়া সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে সোহাগের ব্যর্থতার দায় নিজেরা নেবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সালাউদ্দিন ও সালাম দুজনই বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন। তবে শেষ মুহূর্তে সালাম ভুলই স্বীকার করেছেন এভাবে, ‘এখন থেকে আপনারা দেখবেন সবকিছু। আমরা যে ভুল করেছি, তা যেন আর না হয়, সেদিক থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’ সোহাগের পথ রুদ্ধ করে সালাউদ্দিনরা যেন এত বছরের অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ভারও বিদায় করে দিতে চাইলেন। মুখে তারা সব ঠিক করে দেওয়ার কথা বললেও আদতে কি সব দায় থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারবেন তারা। সোহাগের জায়গায় যে সালাউদ্দিন বসিয়েছেন নিজের লোকই।॥
