প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৫ মাস পর ওই প্রকল্পের অধীনে চার কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। তাদের ওই নিয়োগ প্রকল্পভিত্তিক হলেও পরে অবৈধ প্রক্রিয়ায় রাজস্ব খাতে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে একজন কোম্পানি সচিব, উপমহাব্যবস্থাপক একজন এবং দুজন ব্যবস্থাপক রয়েছেন, যারা প্রায় ২৩ বছর ধরে দিব্যি চাকরি করে যাচ্ছেন।
আরপিজিসিএলের কৈলাশটিলা এলপিজি প্রকল্পে বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য ১৯৯৭ সালের ২১ মে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দিন থেকে মাত্র ৭ দিনের মধ্যে আগ্রহী প্রার্থীর আবেদনপত্র ডাকযোগে পৌঁছানোর কথা বলা হয়। আবেদন জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখ থেকে প্রায় ১ বছর ৪ মাস পর ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকল্পের আওতায় ওই চার কর্মকর্তা নিয়োগ পান। অথচ এর আগে ওই বছরের ১৪ এপ্রিল এলপিজি প্রকল্পের কমিশনিং শেষে এর মেয়াদ সমাপ্ত হয়। এক দিন পরই শুরু হয় প্ল্যান্টের উৎপাদন ও রাজস্ব আয়।
মেয়াদ উত্তীর্ণ প্রকল্পের আওতায় এ নিয়োগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা জানান, তাদের যখন নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন রাজস্ব আয় শুরু হয়ে গেছে। বেতন-ভাতার অর্থ নিয়ে সমস্যা না থাকায় তাদের নিয়োগেও ঝামেলা হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কোম্পানি সচিব ফরিদ আহম্মদ ওই চার কর্মকর্তার একজন। তিনি প্রকল্পের আওতায় ক্রয়/ভা-ার কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। একই পদে নিয়োগ পান মোহাম্মদ বুরহানুদ্দিন, যিনি এখন প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক (এইচআর)। অপর দুজন কাজী সালমা খাতুন ও নাহিদ সুলতানা চৌধুরী জুনিয়র অফিসার (কম্পিউটার) হিসেবে প্রকল্পভিত্তিক নিয়োগ পান একই সময়ে। বর্তমানে তারা যথাক্রমে সংস্থাপন ও ভান্ডার শাখায় ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তাদের নিয়োগপত্রের শর্তে বলা আছে, ‘আপনার এই নিয়োগ সম্পূর্ণ প্রকল্পভিত্তিক হিসেবে গণ্য হইবে।’ কিন্তু পরে তাদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি পদোন্নতিও দেওয়া হয়েছে।
১৯৯৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তাদের কর্তৃপক্ষ যে নিয়োগপত্র দেয়, সেখানে ওই বছরের ১ অক্টোবরের মধ্যে যোগদানের কথা বলা হয়। প্রতিষ্ঠান থেকে যেদিন নিয়োগপত্র দেওয়া হয়, সেদিনই কর্মস্থলে যোগদান করেন কাজী সালমা খাতুন। তিনি তার যোগদানপত্রে মেডিকেল চেকআপ শেষে প্রয়োজনীয় সনদ ও অন্যান্য দলিল পরে জমা দেওয়ার আবেদন করেন। একই দিনে নিয়োগপত্র গ্রহণ ও যোগদানপত্র জমা নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে।
এ ব্যাপারে কাজী সালমা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ করে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। অন্যরাও এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ৯ এপ্রিল রাজধানীর নিকুঞ্জে আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যাবেদ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। কোম্পানি সচিব ফরিদ আহম্মদের কাছে গেলে তিনি মন্তব্য করতে চাননি। মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আলমগীর সরকারের কক্ষে গিয়ে তাকেও পাওয়া যায়নি। পরে তাকে ফোন করা হলে তিনি প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হিসেবে ব্যবস্থাপক (জনসংযোগ ও আইন) রাবিয়া হকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু রাবিয়াকে অফিসে পাওয়া না যাওয়ায় পরে তাকে ফোন করে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, পত্রিকার বিজ্ঞাপনের বিষয় নিয়ে কথা না হলে এগুলো কী সব বলছেন? বলেই ফোন রেখে দেন তিনি। পরে ফোন করা হলে তিনি তা কেটে দেন।
ব্যবস্থাপনা পরিচালককে তার দপ্তরে না পেয়ে পরদিন ফোন করা হয় তার মুঠোফোন নম্বরে। তিনি ফোন না ধরে তার দপ্তরের উপব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মঞ্জুর মোরশেদকে দিয়ে এই প্রতিবেদকের কাছে ফোন করে জানতে চান কেন তাকে ফোন দেওয়া হয়েছে। এ সময় নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানা দরকার তা জানানো হলে মঞ্জুর বলেন, ‘স্যার মিটিংয়ে। বিষয়টি তাকে জানানো হবে।’
পরে মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও যাবেদ চৌধুরী আর ফোন রিসিভ করেননি। তবে তার দপ্তরের টেলিফোনে অন্তত তিন দফা ফোন করা হলে জানানো হয়, ‘বিষয়টি স্যারকে জানানো হয়েছে। কিন্তু তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত। কখনো বলা হয়, তিনি অফিসের বাইরে আছেন।’
নানাভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলে তিনি তা কৌশলে এড়িয়ে যান এবং সময়ক্ষেপণ করলেও শেষ পর্যন্ত তার মতামত পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ গত রবিবার তার মুঠোফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে বিষয়বস্তু লিখে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু গতকাল সোমবার পর্যন্ত তার কোনো সাড়া মেলেনি।
আরপিজিসিএলের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ তেল-গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন। নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে আরপিজিসিএল প্রকল্প ও রাজস্ব খাতে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে পদোন্নতি নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তা দ্রুত নিরসনের চেষ্টা চলছে। এ জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। আবারও কমিটি গঠন করা হবে। প্রয়োজনে বোর্ড মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
১৯৯৮ সালে কোম্পানির ১১৪তম বোর্ড সভায় মেয়াদ উত্তীর্ণ প্রকল্পের পদ ও সরঞ্জামাদি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু জনবলের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া না হলেও ২০০০ সালের ২২ মে আরপিজিসিএল একটি সাকুুলার জারি করে প্রকল্পের জনবলও রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করে। কোনো ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া ছাড়াই প্রকল্প থেকে সরকারি ওই কর্মকর্তাদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ শেষে প্রায় দুই বছর ওই কর্মকর্তাদের রাজস্ব খাতে নেওয়ার আগে তারা কীভাবে চাকরি করেছেন, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
সংস্থাপন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ ও পরিকল্পনা বিভাগের বিভিন্ন সময়ের পৃথক পরিপত্রে বলা হয়েছে, ‘১৯৯৭ সালের পহেলা জুলাই হতে চালু প্রকল্পের (২য়/৩য় পর্যায়সহ) ক্ষেত্রে প্রকল্প সমাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট জনবলের বেতন-ভাতা প্রদানের আর কোনো অবকাশ নেই। নিয়োগ চুক্তি শর্ত অনুযায়ী তাদের নিয়োগপত্রই অব্যাহতিপত্র হিসেবে এবং প্রকল্প সমাপ্তির পরদিন থেকে প্রকল্পের জনবল কর্মরত নাই বলে গণ্য হবে। প্রথম পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্পের লোকবলকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্বিতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানান্তরিত করা যাবে না। উন্নয়ন প্রকল্পের নিয়োগপত্র প্রকল্প সমাপ্তিতে চাকরি হতে অব্যাহতিপত্র হিসেবে গণ্য হবে।’
১৯৯১ সালের ৫ নভেম্বর সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের অপর এক পরিপত্রে বলা হয়, উন্নয়ন প্রকল্পের পদ এবং রাজস্ব খাতভুক্ত পদ ও নিয়োগবিধি সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ায় উভয়ের পারস্পরিক নিয়োগ/পোস্টিং/বদলি/পদোন্নতি বিধিবহির্ভূত। উন্নয়ন প্রকল্পের চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে কিছু শর্তে তাদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শর্ত হলোÑ রাজস্ব খাতভুক্ত পদের নিয়োগবিধির শর্ত পূরণ করে অন্যান্য প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তাকে নির্বাচন লাভ করতে হবে।
পরিকল্পনা বিভাগের পরিপত্র অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়োগের জন্য জনবলের নিয়োগপত্র প্রকল্প পরিচালকের দেওয়ার কথা থাকলেও আরপিজিসিএলের ওই চার কর্মকর্তার নিয়োগপত্রে সই করেন তৎকালীন উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) গাজী সোবেদুর রহমান।
