পবিত্র রমজানের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি আমরা। রমজানের শেষ রাতগুলোতে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে দোয়া ও ইবাদতের গুরুত্ব অপরিসীম। এসব রাত মনের সব কথা আল্লাহর কাছে খুলে বলার শ্রেষ্ঠ সময়। কান্না হচ্ছে দোয়া কবুলের এক বড় অস্ত্র। মহান আল্লাহ সেই ভগ্ন হৃদয়ের দোয়া কবুল করেন, যে হৃদয় অন্য সবকিছু থেকে আশা হারিয়ে একমাত্র আল্লাহর দয়ার সাগরে ভাসিয়ে দেয় আশার ভেলা। নবী-রাসুলরা নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর দরবারে এমনভাবে কেঁদে কেঁদে মোনাজাত করতেন, যেন তাদের চেয়ে বড় পাপী আর কেউ নেই! আমরা নিষ্পাপ নই, তাই আমাদের মোনাজাতগুলো হওয়া উচিত অনেক অনেক বেশি অশ্রুসিক্ত।
ইবাদতের জায়নামাজে ও নামাজের মধ্যে আমাদের মনে করা উচিত, এটাই হয়তো জীবনের শেষ নামাজ এবং আজকের রোজাই হয়তো জীবনের শেষ রোজা। এই মোনাজাতই হয়তো পার্থিব জীবনের শেষ মোনাজাত। কালই যদি মারা যাই, আমরা জানি না আমাদের জন্য বেহেশত না দোজখ অপেক্ষা করছে! তাই সব সময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থেকে সৎকাজ করে যাওয়া এবং পরকালের পাথেয় সঞ্চয়ে সচেষ্ট হওয়া উচিত। আমরা যদি অন্যায়ভাবে কোনো ব্যক্তির সম্পদ ও সম্মানের ক্ষতি করে থাকি, তাহলে মৃত্যুর আগেই তার কাছ থেকে ক্ষমা চাইতে হবে এবং ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করতে হবে।
কোনো মানুষ যদি নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে চায়, তাহলে মৃত্যুর চিন্তা তার জন্য সবচেয়ে বড় সংস্কারক ও পরামর্শদাতা। মৃত্যু এমন এক অনিবার্য বিষয়, যা এড়ানোর সাধ্য কারও নেই। বড় বড় পরাক্রান্ত জালেমও মৃত্যুর কথা স্মরণে সৎ ও খোদাভীরু বান্দায় পরিণত হতে পারে। আমরা কেউ জানি না, কখন আয়ু ফুরিয়ে যাবে। তাই বিচার দিবসের ভোগান্তির কথা মনে রেখে আমাদের উচিত সব ধরনের অসৎ ও মন্দ স্বভাব এখনই ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া।
বলা হয়, পরকালের একটি দিন দুনিয়ার এক হাজার বছরের সমান দীর্ঘ! দোজখের আগুনের উত্তাপ এত বেশি যে সেই উত্তাপের বিন্দুমাত্র আঁচ যদি এই পার্থিব বিশ্বে এসে পড়ত বিশ্ব জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যেত! পরকালে আমাদের বিদ্যা-বুদ্ধি ও ধন সম্পদ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। আমরা নিরন্ন ও দরিদ্রদের সহায়তা না করে থাকলে সে বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে। অযৌক্তিক কোনো অজুহাত সেদিন কাজে আসবে না। আমরা যৌবনকালকে কীভাবে ব্যয় করেছি তার হিসাব সেদিন দিতে হবে। আমরা বয়স্ক এবং এমনকি বৃদ্ধ হওয়ার পরও কেন মন্দ কাজ বা পাপের আকর্ষণ ছাড়তে পারিনি, সে বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে। আমরা খোদার দেওয়া জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে কি অন্যদের সুপথ দেখানোর চেষ্টা করেছি? স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের যথাযথভাবে ধর্ম এবং অধর্ম সম্পর্কে সচেতন করেছি কি? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি নেতিবাচক হয়, তবে পরকালে আমাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এসব থেকে বাঁচার মোক্ষম উপায় দোয়া ও মোনাজাত।
বুজুর্গ আলেমরা বলেন, রমজানের রাতগুলোতে দোয়া-মোনাজাত যেন মহান আল্লাহর সঙ্গে প্রেমালাপ ও প্রেমাস্পদের জন্য নিজেকে সবচেয়ে বিনীত করার আকুল মহড়া। এমন সব রাতে বহু পাপ ও অত্যন্ত কম বা নগণ্য ভালো কাজের কথা স্মরণ করে বলা উচিত, ‘হে আল্লাহ, আমরা অনুতপ্ত পাপী বলেই তুমি আমাদের ক্ষমা করো ও রক্ষা করো দোজখের আগুন থেকে তোমার অপার করুণায়। হে সর্বোচ্চ দাতা ও দয়ালু, তোমার প্রিয় বন্ধুর প্রতি অশেষ দরুদ পাঠানোর অসিলায় ক্ষমা করো আমাদের। আমরা রোজাপালনের চেষ্টা করেছি, সেই চেষ্টাটুকু কবুল করো। হে আল্লাহ, শয়তানের অবিরাম কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকতে তোমারই সাহায্য চাইছি। হে মহাকৌশলী ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ, আমাদের দোয়াকে কবুল ও মঞ্জুর করো।
লেখক : দেশ রূপান্তরের সহসম্পাদক
