ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড় করার আগেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নিশ্চিত হতে চায় আগামী বাজেটে সংস্থাটির দেওয়া শর্তের কতটা অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। আর এ পর্যন্ত সরকার সংস্থার দেওয়া শর্ত কতটা বাস্তবায়ন করেছে। এসব খতিয়ে দেখতে সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে একটি দল আগামী ২৫ এপ্রিল বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। দলটি ২ মে পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
ইতিমধ্যে আইএমএফের শর্ত পূরণের অগ্রগতি ও এক্ষেত্রে সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রতিবেদন তৈরি করছে। যা আইএমএফ দলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র আরও জানায়, বিশেষভাবে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে আইএমএফের দেওয়া শর্তের কতটা অন্তর্ভুক্ত হবে তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রতিনিধিদল। বৈঠকে বাজেট সহায়তা নিয়েও আলোচনা হবে। সংস্থাটির এ দলে তিন থেকে চার জন সদস্য থাকবেন বলে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আইএমএফের স্টাফ কনসালটেশন মিশন আসার কথা জানিয়ে বিভিন্ন সংস্থার কাছে এরই মধ্যে চিঠি পাঠিয়েছেন আইএমএফের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান (আবাসিক প্রতিনিধি) জয়েন্দু দে। চিঠিতে আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের হালনাগাদ পরিস্থিতি প্রস্তুত রাখতে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর প্রধানদের অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রায় প্রতি বছরই জাতীয় বাজেট প্রস্তাব ঘোষণার আগেই আইএমএফের একটি মিশন বাংলাদেশে আসে। অন্যবারের চেয়ে এবারে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার ঋণ ও বাজেট সহায়তা পেতে আইএমএফের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চায়। সংস্থাটির দেওয়া সব শর্ত মানতে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবারে আইএমএফের সফরে মূলত দেখা হবে ঋণ পেতে যে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে বলা হয়েছিল তা কতটা আগামী বাজেটে আনা হবে। সংস্কারের কতটা এরই মধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে বা এ বিষয়ে প্রস্তুতি চলছে। বাজেট সহায়তার বিষয়েও আলোচনা হবে বলে শুনেছি। তবে এটা ঠিক একবারেই সব আনা সম্ভব হবে না। তবে ঘোষণা করতে পারে সরকার।
ঋণদানকারী সংস্থাটি অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে সরকারের আয় বাড়াতে সবচেয়ে জোর দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে কর এবং কর বহির্ভূত খাতই সরকারের আয়ের অন্যতম উৎস। এবারে আইএমএফ শুধু শর্তের তালিকা দিয়েই থেমে থাকেনি। শর্ত পূরণের ছক কষে দিয়েছে, কবে নাগাদ, কোন খাত থেকে কী পদ্ধতিতে এসব শর্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। এরই মধ্যে আইএমএফের একটি দল এনবিআরের বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে। শর্তের বেশির ভাগ আগামী অর্থবছরের বাজেটে অন্তর্ভুক্তিতে ঋণদানকারী সংস্থার পক্ষ থেকে এনবিআরের ওপর চাপ আছে। বিশেষভাবে ভ্যাট অব্যাহতি কমানো বা তুলে নিতে সংস্থাটির পক্ষ থেকে অনড় অবস্থানে আছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আইএমএফ মার্চের মধ্যে সরকারকে কমপক্ষে ২ লাখ ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা কর আদায় করার শর্ত দিয়েছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এনবিআর রাজস্ব আদায় করেছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। মার্চের সাময়িক হিসাবে এনবিআরের রাজস্ব আদায় ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
অন্যদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের সাময়িক হিসাব থেকে দেখা যায়, এনবিআর বহির্ভূত কর আদায় হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। ভ্যাট অব্যাহতি তুলে নিতে এনবিআর হিসাব কষছে। এরই মধ্যে এনবিআর চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, আর কত কাল ভ্যাট অব্যাহতি দিয়ে রাখা হবে। শিল্পসহ সব খাততে সক্ষম হতে হবে।
আইএমএফের শর্তের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা আনা এবং যথাযথ পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যয়ের খাত ও পরিমাণ সম্পর্কিত হিসাব খতিয়ে দেখবে আইএমএফ। একই ভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় সম্পর্কেও জানানো হবে। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা বহির্ভূত ভর্তুকি হ্রাস করতে হবে।
ঋণ অনুমোদনের পরই আইএমএফ সতর্ক করেছিল, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ৩০ বিলিয়ন বা ৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলার হতে পারে। এতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়বে সরকার। ঋণদানকারী সংস্থার শর্ত আছে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। আইএমএফ বলেছে, যথাযথ নীতি গ্রহণ করা সম্ভব হলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের রিজার্ভ ৩ হাজার ৪২০ কোটি ডলারে এবং পরের দুই অর্থবছরে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার করে রিজার্ভ বাড়তে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে দেশের রিজার্ভ ৫ হাজার ৩১০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছানো সম্ভব। এবারে আইএমএফ দলটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর জন্য সরকার কী কৌশল গ্রহণ করেছে বা করবে বলে পরিকল্পনা করেছে। বিশেষভাবে আসছে বাজেট প্রস্তাবে এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তা বিস্তারিত জানাতে হবে আইএমএফ দলকে।
বাংলাদেশ ব্যাংক যে পদ্ধতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গণনার হিসাব করে, তাতে পরিবর্তন আনার শর্তও দিয়েছে আইএমএফ। আইএমএফের এ শর্তে সম্মতি জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা বাজেট বাস্তবায়নেও আইএমএফের শর্ত রয়েছে, মার্চের মধ্যে সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতে হবে এবং খরচও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি করার কথা বলা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৪১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ৪৫ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক মন্দা ও ডলার সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতে চেষ্টা চলছে। আগামী বাজেটেও তার প্রতিফলন থাকবে।
আইএমএফের দেওয়া সব শর্ত পূরণ করার অঙ্গীকারের পরেই গত ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর তিন দিন পরই প্রথম কিস্তি হিসেবে ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার ছাড় করে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরে মোট সাত কিস্তিতে ঋণের বাকি অর্থ দেওয়ার কথা রয়েছে। সেই হিসাবে বাকি আছে আরও ছয় কিস্তি। তবে সরকারের শর্ত পূরণের অগ্রগতি এবং সরকারের প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরেও ছাড় করা হতে পারে। ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ পেতে সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে।
