এ সপ্তাহের বিতর্ক, হিন্দি চলচ্চিত্র আমদানি

রুচি বদলে দেওয়ার ভয়ংকর বাণিজ্য দস্যুতা

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৩, ১০:৪১ পিএম

পঞ্চাশ দশকের শেষ ভাগ। তখন বাংলা ও বাঙালির চেতনায় স্বাধিকারের দৃঢ়প্রত্যয়। প্রাদেশিক সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তারই প্রস্তাবনায় পাস হলো, পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বিল। ১৯৫৭ সালের ১৯ জুন বিলটি কার্যকর হলো। প্রতিষ্ঠিত হলো এফডিসি। কী উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এফডিসি?

তখন ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনো সুযোগ ছিল না। যেতে হতো পাকিস্তানের লাহোরে। পূর্ব পাকিস্তানে কিছুই নেই। যে কারণে উর্র্দু এবং হিন্দি ছবির একচেটিয়া বাজার। এমন প্রতিযোগিতার মধ্যেই, বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হতে থাকল। আস্তে আস্তে চলচ্চিত্রের বাজার দখল করল বাংলা চলচ্চিত্র।

১৯৫৬ সালে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ দিয়ে যাত্রা শুরুর পর, ষাট এবং সত্তর দশকে অসাধারণ কিছু নান্দনিক ছবি নির্মিত হয়। ১৯৫৬ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত মোট ২২৪টি ছায়াছবি ঢাকায় তৈরি হয়েছে। ২২৪টি ছায়াছবির মধ্যে ৫৯টি ছায়াছবি উর্দু ভাষায় নির্মিত, বাকি ১৬৫টি ছায়াছবি বাংলা ভাষায় নির্মিত। স্বাধীন বাংলাদেশে, বিশেষ করে আশির দশক পর্যন্ত ঢাকাই চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ ছিল। আমরা পেয়েছি রাজ্জাক, কবরী, ববিতা, সুচন্দা, চম্পা, শাবানা, শবনম, এটিএম শামসুজ্জামান, সাঈফুদ্দীন, সুচরিতা, সোহেল রানা, ফারুক, উজ্জ্বল, জসীম, টেলিসামাদ, দিলদার, রাজীব, হুমায়ুন ফরীদি, মান্নাসহ অনেককে। শিল্পী তৈরির প্রক্রিয়া কী কারণে ধ্বংস হলো? কেনইবা ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ বন্ধ করে দেওয়া হলো? আমরা তো এর মাধ্যমেই সালমান শাহ, মৌসুমীকে পেয়েছিলাম।

আশির দশকের শেষ দিকে এমডি হলেন সালাউদ্দিন জাকি। তার হাতেই আমরা পেলাম চমৎকার একটি বাংলা ছবি ঘুড্ডি। এরপর সম্ভবত ’৯০ দশকে খলনায়ক রাজীব এমডি হওয়ার পর, এ পর্যন্ত আমলার বাইরে এমডি হয়েছেন ম. হামিদ এবং পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর? বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (এফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কী ধরনের উন্নয়নে কাজ করেন, আমরা জানি না। শুধু দেখি, একের পর এক এমডি আসেন। এখন তথ্য মন্ত্রণালয়ের আমলারা হন এমডি! বর্তমান এমডিও সেই তথ্য মন্ত্রণালয়ের একজন আমলা! কেন? আমলাদের বাইরে চলচ্চিত্রবোদ্ধা ও প্রশাসনিক যোগ্যতা কারও নেই? জানি না, তাদের মধ্যে চলচ্চিত্র জ্ঞান কতটুকু! এই শিল্প প্রসারে তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিচক্ষণতা, নিশ্চয়ই সেলুলয়েডে গভীর প্রভাব ফেলে। বলতেই হবে এটা আমাদের অজ্ঞতা। জানি না, কর্তৃপক্ষকে কোন বটিকা সেবন করিয়ে বছরের পর বছর এই কালচার চলছে?   

লক্ষ করলে দেখা যাবে, ’৯০ দশক থেকে শুরু হলো চলচ্চিত্রের নিম্নগামিতা। একদিকে হিন্দি চলচ্চিত্রের নকল চিত্রনাট্য, অন্যদিকে ভালগারিজম। একই সঙ্গে রহস্যজনকভাবে বন্ধ হয়ে গেল নতুন মুখের আগমন। সিনেমা হল থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে গেল মধ্যবিত্ত দর্শক। হলের পরিবেশ এবং নগ্ন সিনেমার আধিক্যে হারিয়ে গেল মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

সালমান শাহ, মৌসুমীর পর আর কোনো নতুন মুখ এলো না। বিচ্ছিন্নভাবে এলেন শাবনূর, পপি, শাকিব খান, পূর্ণিমা, রিয়াজ, ফেরদৌস, শাবনাজ, নাঈম, তামান্না, শাকিল, বাপ্পারাজ, রতœাসহ কয়েকজন। বর্তমানে যারা ঢাকাই চলচ্চিত্র জগতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের অধিকাংশেরই বাজনার চেয়ে খাজনা বেশি। অপু বিশ্বাস, বুবলি, পরীমনি, শুভ, সিয়াম, পূজা চেরী, বাপ্পী, ইমন, নিরব, সাইমনসহ আরও তরুণ নায়ক-নায়িকা যারা আছেন, তারা তেমন কোনো দর্শক চাহিদা তৈরি করতে পারছেন না। অবশ্য এই দোষ, শুধু নায়ক-নায়িকাদের দিলে অন্যায় হবে। এদের যারা তৈরি করবেন, সেই যোগ্য পরিচালক-নির্দেশকের প্রকট অভাবের কারণেই ঢাকাই চলচ্চিত্রের দৈন্যদশা। তবে সব কিছু ছাপিয়ে, জয়া আহসান নিজেকে দুই বাংলাতেই জনপ্রিয় করে তুলেছেন। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বাজার অনেক ছোট। দেশের বাইরে এর কোনো বাজার নেই বললেই চলে। এর বিপরীতে হিন্দি চলচ্চিত্রের রয়েছে বিশ্বব্যাপী বিশাল নেটওয়ার্ক। ভারত তো বটেই, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হিন্দি চলচ্চিত্রের চাহিদা ব্যাপক। এমন বাস্তবতার মধ্যে, হিন্দি চলচ্চিত্র আমদানির সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শেষ পেরেক ঠুঁকে দেওয়া হলো। ফাইভ স্টার হোটেলের সুস্বাদু খাবারের পর কেউ আর ফুটপাতের খাবার খায় না। মানুষের রুচি বদলে দেওয়ার এই ভয়ংকর বাণিজ্য দস্যুতার বিরুদ্ধে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের এক হওয়া দরকার। 

কীভাবে দেশের চলচ্চিত্রের মান আরও উন্নত করা যায়, কীভাবে সিনেমা হলগুলোকে রক্ষা করা যায়, কীভাবে মধ্যবিত্ত দর্শককে আবার হলমুখী করা যায় সেই বিষয়ে চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের জোরালো ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। ভালো চিত্রনাট্য তৈরি করতে পারেন, ভালো গান লিখতে পারেন, ভালো আলোক নির্দেশক, আলোকচিত্রী এবং একজন ভালোমাপের চিত্রপরিচালক দরকার। তাহলেই উন্নত রুচির যোগ্য অভিনেতা-অভিনেত্রী তৈরি হবে।

শুধু বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র দিয়ে, বৃহৎ এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব না। এর বাইরে যদিও বাণিজ্যিক ধারার কিছু বিশ্বনন্দিত ছবি বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে। এই ধারাকে আরও বেগবান করা দরকার। সমাজের উচ্চবিত্তদের এ বিষয়ে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের এমন দুর্দশার কথা হয়তো অনেক আগেই ভেবেছিলেন জনপ্রিয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম। যে কারণে তার হাত ধরেই বাংলাদেশে শুরু হয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলন। সেই ’৮৪ সালেই তিনি নির্মাণ করেন দেশের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আগামী। এরপর থেকে দেশে এক ধরনের বিপ্লব শুরু হয়েছে, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে। একই সঙ্গে বিদেশের অসংখ্য চলচ্চিত্র উৎসবে আমাদের এসব ছবিগুলোই প্রদর্শিত এবং পুরস্কৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে, নন্দিত পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং কলাকুশলী।    

বাণিজ্যিক ধারার হিন্দি চলচ্চিত্র আমদানি করে, এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব না। এর ফলে ঢাকাই ছবির মানও উন্নত হবে না। শুধু সিনেমা হলের ‘বাণিজ্য’ চিন্তা করে, এমন সিদ্ধান্ত হবে ভয়ংকর অপরিণামদর্শিতা এবং আত্মঘাতী। আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের গৌরবজনক ইতিহাসের কথা মনে রেখেই, সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা দরকার।  

আশা করি,  এ ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মোহমুক্ত হবেন। প্রত্যাশা থাকবে হিন্দি ছবি না, ঢাকাই চলচ্চিত্রই নন্দিত হবে বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে। শুধু সিনেমা হল টিকিয়ে রাখার স্বার্থে, হিন্দি চলচ্চিত্র আমদানি অসম্ভব দেউলিয়াপনা। আমরা উর্দু ছবির নাগপাশ ছিঁড়ে এ কারণে বের হয়ে আসিনি যে, হিন্দি ছবি গ্রাস করে নেবে আমাদের চলচ্চিত্র। আর এটা তো গ্রাস না, একেবারে মুখের সামনে নিয়ে খাবার উঁচু করে ধরা! এখন দেখার বিষয়, সেই ‘হাঁ’ কত বড় হয়? বাংলাদেশের উজ্জ্বল চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে কল্পনা করেছে কেউ!

লেখক

সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত