ঈদ সামনে রেখে চাঁদাবাজরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের হুমকি-ধকমিতে ব্যবসায়ীরা তটস্থ। প্রতিবাদ করলেই বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে দোকানপাট। ইতিমধ্যে চাঁদাবাজদের একটি তালিকা করা হয়েছে। তালিকাটি পুলিশ ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদর দপ্তর পর্যালোচনা করছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। এই তালিকায় পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পাশাপাশি কিছু গণমাধ্যমকর্মীর নামও এসেছে।
এক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, ফুটপাত থেকেই বেশি চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। ফুটপাতে বেচাকেনা বেড়ে যাওয়ায় দৈনিক চাঁদার হারও বাড়িয়ে দিয়েছে চাঁদাবাজরা। আগে দোকানপ্রতি দৈনিক ৩০০ টাকা আদায় করা হলেও তা এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। দোকানের আয়াতনভেদেও বাড়ানো হয়েছে চাঁদার হার।
ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাঁদাবাজদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম ছদ্মবেশে সক্রিয়। পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসছে তা কিছুটাও হলেও সত্য। ওই সব দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যদের আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। ব্যবসায়ীদের ওপর এমন অত্যাচার রোধে গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। দ্রুতই এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা যদি সরকারি দলের হয় তাও ছাড় পাবে না।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দেশ রূপান্তরকে জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে অন্তত সহস্রাধিক চাঁদাবাজ। তাদের লালন-পালন করছেন থানা পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। ঈদ সামনে রেখেই ফুটপাত ও মার্কেটে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ওরা। কিছুতেই তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
তাদের কাছে ব্যবসায়ীরা দিন দিন অসহায় হয়ে পড়েছেন। নিয়মিত চাঁদা না দিলে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
সম্প্রতি কয়েকটি মার্কেটে আগুনের ঘটনায় অনেকে ফুটপাতকেন্দ্রিক কেনাকাটা করছেন। গত পরশু উত্তরা বিজিবি মার্কেটে আগুন লাগার পর অনেকে এখন ওই সব এলাকার ফুটপাতে ব্যবসা করছেন। আর এ কারণে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে চাঁদার রেট। একইভাবে গুলিস্তানের সুন্দরবন মার্কেটের সামনে ফুটপাতে কাপড়ের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। যেখানে আগে ৩০০ টাকা দিলেই লাইম্যানরা সন্তুষ্ট থাকত।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঈদ সামনে রেখে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চাঁদাবাজরা। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নাম ভাঙিয়ে নিত্যদিন চাঁদা ওঠাচ্ছে লাইনম্যানরা। তাদের টার্গেট অস্থায়ী কাঁচাবাজার, খাবারের দোকান, রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে বসানো দোকানপাট।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, তারা অসহায়। পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতারা মিলে চাঁদা আদায় করে। আবার কতিপয় গণমাধ্যমকর্মীও আছে। তাদের সঙ্গে পুলিশের একটি অংশের যোগাযোগ আছে। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে চাঁদাবাজরা ধরা পড়ে। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই জামিনে বের হয়ে আসে। চাঁদাবাজরা এখন মোবাইল ফোনের পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ভাইবার, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন। পুলিশ সরাসরি না এসে লাইনম্যান দিয়ে চাঁদাও ওঠাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গলি, দৈনিক বাংলার মোড়, দিলকুশা রোড, মৌচাক মার্কেট, আইডিয়াল স্কুল, নিউমার্কেট, গুলিস্তান, উত্তরা, মিরপুর, শাহআলী, গাবতলী, কারওয়ান বাজারসহ অন্তত ৫০টি স্থানে সরেজমিনে দেখা গেছে, হাজার হাজার দোকানপাটের কোনোটি বৈধ, কোনোটি অবৈধ। এসব দোকানপাট থেকে নিয়মিত চাঁদা ওঠানো হচ্ছে। কাঁচাবাজার, ভ্যানগাড়ি, ব্যাটারিচালিত রিকশা, কাপড়ের দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হচ্ছে।
ইস্কাটন রোডের একপাশ দখল করে বসেছে অর্ধশতাধিক মাছের দোকান, ১৭৫টি কাঁচা সবজির দোকান, ১৫টি মুরগির দোকান ও কয়েকটি মাংসের দোকান। মাছ, মুরগি ও মাংসের প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক চাঁদা আদায় করা হচ্ছে ৫০০ টাকা করে। সবজির দোকান থেকে ১৫০ টাকা। তা ছাড়া মুরগি ও মাংস ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অগ্রিম নেওয়া হয়েছে। মগবাজার মোড় থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত রাস্তার ফুটপাতে বাজার বসিয়ে প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকার বেশি হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি।
পুলিশের তথ্যানুযায়ী, মিরপুর এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার হকার রয়েছেন। তাদের কাছ থেকে গড়ে ২০০ টাকা করে প্রতিদিন ৬০ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে ডায়াবেটিক হাসপাতাল পর্যন্ত ফুটপাতে চাঁদা তোলেন সিদ্দিক ও জাফর। গ্রামীণ ব্যাংক ভবন পর্যন্ত ফুটপাতের দায়িত্বে আছেন জালাল। ওই এলাকার ফুটপাতে চাঁদা ওঠান রিপন, রুবেল, ইমরান তালুকদার, মুসতাকিম ফয়সাল ও গাল কাটা পারভেজ। মিরপুর ১ নম্বরের শাহআলী মাজার সংলগ্ন মহিলা কলেজের গেট থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশনের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন পর্যন্ত ফুটপাতে চাঁদা তোলেন লাইনম্যান সুরুজ আলী। সিটি করপোরেশন মার্কেট থেকে মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের সামনের এলাকায় আছেন লাইনম্যান নয়ন ও রুবেল। বাগদাদ মার্কেটের সামনে টাকা ওঠান আনোয়ার। গ্রামীণফোন সেন্টারের সামনে রবিউল, পল্টন মিয়া ও ফুট কবির ওরফে বরিশাইল্লা কবির, মুক্তবাংলা মার্কেটের সামনে আবুল কালাম ও সেলিম। ক্যাপিটাল টাওয়ারের সামনে আকবর, মুক্তিপ্লাজা মার্কেটের সামনে নুরু, হক প্লাজার সামনে শাহ আলম, শাহ আলী, ১ নম্বর বেড়িবাঁধ এলাকায় নাবিল খান কাঁচাবাজার ও ফুটপাতের নিয়ন্ত্রক। তার বাহিনীতে রয়েছে ফারুক ওরফে জি মার্ট ফারুক, ছোট করিম, রাজু, শাহ আলম, মাইনুদ্দিন, সৌরভ, দীপু ও সম্রাট। মিরপুরের হজরত শাহ আলীর মাজার, সনি সিনেমা হল ও চিড়িয়াখানার ফুটপাত দখল করে দোকান নিয়ে বসা হকারদের কাছ থেকে প্রতি মাসে কোটি টাকার চাঁদা আদায় করছে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা। অভিযোগ রয়েছে, বিশাল চাঁদার বাজার থেকে সংগৃহীত চাঁদার ভাগ যাচ্ছে পুলিশের পকেটেও।
স্থানীয় সূত্রমতে, নিউমার্কেট এলাকায় ফুটপাতেও চাঁদাবাজি হচ্ছে দেদার। সায়েন্সল্যাব থেকে নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত উভয় পাশের ফুটপাত ও মূল সড়কের অর্ধেক দখল করে বসেছেন সহস্রাধিক হকার। স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার হকার রয়েছেন ওই এলাকায়। দোকানভেদে প্রতিদিন ৩০০-৫০০ টাকা করে চাঁদা ওঠানো হচ্ছে। টাকা আদায়ে লাইনম্যানের রয়েছে একাধিক সহযোগী। নীলক্ষেত বইপট্টি থেকে চাঁদা তোলেন শাহিন ও তার সহযোগী শহিদ চাচা। বলাকা সিনেমা হলের সামনে লাইনম্যান সেলিম ও আরিফ। চাঁদনীচক মার্কেট ও গাউছিয়ার সামনের ফুটওভার ব্রিজে হকারদের থেকে চাঁদা আদায় করেন লাইনম্যান কালাম। নিউমার্কেটের পূর্ব পাশে (২ ও ৩ নম্বর গেট) চাঁদা তোলেন আনিস ও মিজান। ঢাকা কলেজ গেট থেকে সায়েন্স ল্যাব পর্যন্ত ফুটপাতগুলোয় চাঁদা তোলেন রফিক, ইসমাইল, মজনু, বাচ্চু, আকবর ও আলম। গাউছিয়া মার্কেটের সামনে ইব্রাহিম ও হোসেন, তাহের, মোর্শেদ, সিরাজ ও মুসা মিয়া, নিউমার্কেটের পূর্ব পাশে আবদুস সাত্তার মোল্লা ও শাহাদাৎ, নিউ সুপার মার্কেটের পাশে আবদুল জলিল, নিউ মার্কেটের ওভারব্রিজের ওপর খোকন ও কালাম চাঁদা তোলে। বলাকা সিনেমা হল ও মার্কেটের সামনের ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলেন মাইনুল, আমিনুল, সেলিম ও মিজান। রহমান কমপ্লেক্সের সামনে ফুটপাতের লাইনম্যান শিপন ও রানা। নিউ সুপার মার্কেটের সামনে জুতাপট্টি এলাকায় চাঁদা তোলেন জলিলের নাতি জনি।
নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, চাঁদার টাকা কতিপয় পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় কয়েক ব্যক্তির মধ্যে ভাগাভাগি হয়। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ও পেছনে মহাসড়ক দখল করে কাঁচাবাজার বসে প্রতিদিন। আছে লেগুনা, ট্রাক ও পিকআপস্ট্যান্ড। এখানে দৈনিক কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। তা ছাড়া যাত্রাবাড়ী মাছ, ফল ও কাঁচাবাজারে ট্রাক-পিকআপে মাছ নিয়ে এলেই বেপারিদের গুনতে হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। আবার নামে-বেনামেও তোলা হচ্ছে চাঁদা। মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে অবৈধ দোকান ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত শনির আখড়া, রায়েরবাগ, মাতুয়াইল, তুষারধারা, সাদ্দাম মার্কেট, মহাসড়কের ওপর ফুটপাত দখল করে অবৈধ সিএনজি, ইজিবাইক ও অটোরিকশা, প্রাইভেট কার স্ট্যান্ড এবং সড়কের দুই পাশে দোকান বসিয়ে চলছে বেপরায়া চাঁদাবাজি। কতিপয় পুলিশ সদস্যের যোগসাজশে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা নামধারীরা চাঁদা ওঠাচ্ছেন। এখানে লাইনম্যান হিসেবে কাজ করছেন বাদশা ও রনি। যাত্রাবাড়ী ট্রাফিক পুলিশবক্স থেকে সুফিয়া প্লাজা পর্যন্ত সড়ক ও ফুটপাতে ৩০টি দোকান থেকে দৈনিক ১০০-২০০ টাকা করে আদায় করেন সোনামিয়া নামে এক লাইনম্যান।
নাম প্রকাশ না করে মিরপুর ও গুলিস্তান এলাকায় দুজন ব্যবসায়ী বলেন, বিভিন্ন এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামেও চাঁদা তোলা হচ্ছে। খিলগাঁওয়ে জিসান, মিরপুরের শাহাদাত ও লিটু, কারওয়ান বাজারের আশিক, বাড্ডার মেহেদী, মগবাজারের রনি, আদাবরের নবী, মোহাম্মদপুরের কালা মনির, শাহ আলীর গাজী সুমন, পল্লবীর মোক্তার, কাফরুলের শাহীন সিকদার, যাত্রাবাড়ীতে ইটালি নাসির, জুরাইনের কচির নাম ব্যবহার করছে চাঁদাবাজ চক্র।
