স্বস্তির যাত্রা শান্তির ফেরা

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৩, ০৫:২৫ এএম

তীব্র গরমের অস্বস্তি ছাড়া পবিত্র ঈদুল ফিতরের যাত্রা ছিল প্রায় স্বস্তির। ফিরতি পথেও নির্বিঘ্নে রাজধানী ফিরছেন কর্মজীবী মানুষরা। গতকাল সোমবার রাজধানীর সায়েদাবাদ, মহাখালী বাস টার্মিনাল, যাত্রাবাড়ী এলাকা ও কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, ফিরতি পথে কোনোরকম ভোগান্তি ছাড়াই ফিরছে মানুষ। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন মহাসড়ক ও সড়কে নির্বিঘ্নে রাজধানীতে ফেরার খবর পাওয়া গেছে। এক মাস রোজা শেষে চাঁদ দেখা সাপেক্ষে গত শনিবার পালিত হয় পবিত্র ঈদুল ফিতর। গত বুধবার থেকে সরকার ঘোষিত ঈদের ছুটি শুরু হয়ে তা শেষ হয় গত রবিবার। তবে গতকালও অসংখ্য মানুষ স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে রাজধানী ছেড়েছেন।

দুপুর ২টার দিকে যাত্রাবাড়ী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পদ্মা সেতু অভিমুখী বাসের কাউন্টারগুলো লোকে-লোকারণ্য। কেউ আসছেন, কেউবা যাচ্ছেন। ঈদযাত্রায় কয়েক দিন এই এলাকায় তীব্র যানজট ছিল। বিশেষ করে পদ্মা সেতু হয়ে আসা বাসগুলো ফের সেতু অভিমুখী যাত্রা করতে বেগ পেতে হয়েছিল। এ জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট ও বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ ছিল। গতকাল পরিবহনসংশ্লিষ্টরা ধারণার ভিত্তিতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফিরতি যাত্রায় মানুষ আসছেন কম। তবে যত লোক আসছেন তার প্রায় কাছাকাছি মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন। যাওয়া ও আসা হচ্ছে স্বস্তি ও নির্বিঘেœ। আর যাত্রী কম থাকায় বাড়তি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই। এর আগে ঈদযাত্রায় দক্ষিণবঙ্গের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন বাসে বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ থাকলেও গতকাল তা প্রায় ছিল না বললেই চলে।

পদ্মা সেতু হয়ে বরিশালগামী ‘বিএমএফ’ পরিবহনের সুপারভাইজার তাপস বলেন, যাত্রী কম আসছে। যাচ্ছেও কম। পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল ফের চলাচল বাড়াতে বাসের যাত্রী কমেছে। ফকিরাপুলের একটি বেসরকারি সংস্থার চাকুরে তাওহিদের সঙ্গে কথা হয় যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এলাকায়। আলাপকালে বলেন, পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে গোপালগঞ্জ গিয়েছিলাম। যাত্রাপথে গরমের ভোগান্তি ছিল। ফিরতি পথে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ঢাকায় ফিরেছি।

ঢাকা থেকে শরীয়তপুরগামী ‘বেপারি পরিবহন’র কাউন্টার ম্যানেজার শরীফ মিয়া বলেন, এখনো অনেক মানুষ ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন। পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু হওয়ার পর মানুষ নিশ্চিন্তে যাচ্ছেন ও আসছেন। বরিশালগামী ‘গুনগুন পরিবহন’র কাউন্টার ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম বলেন, অনেকে বর্ধিত ছুটিতে আছেন। যাত্রী একটু কম হলেও কোনো ভোগান্তি ছাড়াই মানুষ আসছেন। ঈদের আগে ফিরতি যাত্রায় বাসের যাত্রী কম থাকায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা বাড়তি নেওয়া হলেও এখন আগের ভাড়াতেই যাত্রী নিচ্ছেন তারা। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ও জনপথের মোড় এলাকায় দূরপাল্লার বাস কাউন্টারগুলোতে গতকাল যাত্রীর তেমন ভিড় দেখা যায়নি। ফিরতি পথে সিলেট, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা থেকে ছেড়ে আসা বাসের কিছু আসন খালি দেখা গেছে। ঢাকা থেকে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ ও লাকসামগামী ‘আল-বারাকা এক্সক্লুসিভ লিমিটেড’ পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার সবুজ মিয়া বলেন, ফিরতি পথে ৪০ আসনের বাসে যাত্রী আছেন সর্বোচ্চ ২৫ জন। বিপরীতে যাত্রাপথেও প্রায় একইসংখ্যক যাত্রী যাচ্ছেন।

রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে আসা ‘এনা পরিবহন’র যাত্রী মো. আমিনুর বলেন, এবারের ঈদে ভোগান্তি ছাড়াই গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম। ফেরার পথেও কোনো যানজট পাইনি। দীর্ঘ কয়েক বছর পর এমন ঈদযাত্রা হলো। হানিফ পরিবহনে ঢাকায় ফেরা নজরুল ইসলাম বলেন, সড়কে গাড়ির চাপ নেই। বেশ ভালোই লাগল এবারের ঈদের যাত্রা। তবে সামনের দিনগুলোর ঈদযাত্রা যেন এমন স্বস্তি পাওয়া যায় সে প্রত্যাশা সরকারের কাছে।

এদিকে প্রিয়জনের সঙ্গে টানা পাঁচ দিন ছুটি কাটানোর পর রেলপথে ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন রাজধানীর কর্মজীবী মানুষরা। কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছেড়ে আসা ট্রেন থেকে শত শত মানুষ নামছেন। অন্যদিকে যারা ঈদের সময়  যেতে পারেননি তারা এখন ট্রেনে চেপে গন্তব্যে যাচ্ছেন।

একাধিক যাত্রী আলাপকালে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অন্যবারের তুলনায় এবারের ঈদযাত্রা ছিল স্বস্তির। ঈদের আগে বাড়ি যেতে সেভাবে ভোগান্তি পোহাতে হয়নি। ঠিক তেমনি এখন বাড়ি থেকে কর্মস্থলে আসতেও কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয়নি। এখন পরিবারের অন্য সদস্যদের রেখে আপাতত একাই এসেছেন অনেকে। অনেকে আবার পুরো পরিবারসহ এসেছেন। কমলাপুর রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার আফসার উদ্দিন বলেন, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ছয়টি লোকাল ও ১৪টি আন্তঃনগর ট্রেন ঢাকায় আসে। সারা দিনে ৫০টি ট্রেন ঢাকায় আসার কথা রয়েছে।

সিলেট থেকে আসা যাত্রী মো. সুমন বলেন, ঢাকায় একটি হোটেলে কাজ করি। দোকান খুলতে হবে। তাই ঈদের ছুটি শেষে নির্বিঘেœ ঢাকায় ফিরলাম। ভাওয়াল এক্সপ্রেসের যাত্রী মো. হাসান মিয়া বলেন, যাত্রাপথে আসতে কোনো সমস্যা হয়নি। খুব ভালোভাবে আসতে পেরেছি। মূলত এবার অনলাইনের মাধ্যমে টিকিট কাটায় অনেকটাই বদলে গেছে ঈদযাত্রা।

আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের যানজটমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে অনেকটা চমক সৃষ্টি করেছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি)। মহাসড়কে যানবাহনের শৃঙ্খলা, ট্রাফিক পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিরলস প্রচেষ্টা আর সঠিক মনিটরিংয়ের কারণে যানজটমুক্ত পরিবেশে ব্যস্ততম গাজীপুর মহানগরীর দুটি মহাসড়ক দিয়ে নির্বিঘেœ গন্তব্যের উদ্দেশে গেছেন লাখ লাখ যাত্রী। যাত্রা নির্বিঘœ করতে ঈদের অনেক আগে থেকেই নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করে জিএমপি।

জিএমপি কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম জানান, ঈদ কেন্দ্র করে পুলিশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ট্রাফিক বিভাগ নিয়মিতভাবে জাতীয় মহাসড়কে, আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং অসংখ্য শাখা সড়কে সুশৃঙ্খলভাবে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করেছে।

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, বঙ্গবন্ধু সেতু-ঢাকা মহাসড়কে ২৭ বছরের মধ্যে ঈদযাত্রায় স্বস্তিতে বাড়ি ফিরেছে ঘরমুখো মানুষ। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ও স্থানীয় প্রশাসনের সার্বক্ষণিক তৎপরতার কারণে দীর্ঘদিন পর ঈদযাত্রা নির্বিঘœ হওয়ায় পরিবহন চালক-যাত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা খুব খুশি। এ বছর স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ যাত্রী পদ্মা সেতু দিয়ে বাড়ি গেছেন। এ ছাড়া মহাসড়ক ঢাকা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেনে (সাইড রোডসহ) প্রশস্তকরণ করা এবং বাকি সাড়ে ১৩ কিলোমিটার মহাসড়কে ডিভাইডারবিহীন দুই লেন একমুখীকরণ (উত্তরবঙ্গমুখী) ও ঢাকাগামী পরিবহনগুলো ভূঞাপুর লিংক রোড ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়ায় দীর্ঘদিনের যানজটের অবসান হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যাও প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার জানান, মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘœ করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করার ফলে এবার ভোগান্তি হয়নি। জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ, সড়ক বিভাগ ও বাসেক (বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ) সবাই মিলে সড়ক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে মানুষ যাতায়াত করতে পেরেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত