সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস ও দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতির মাত্রা কমানো এবং সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পাইলট ভিত্তিতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে ঢাকার দুই এলাকায় মোটসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে। এ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা যেখানে পৌনে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার বিশ্ব ব্যাংক।
‘বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা’ শীর্ষক প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সর্বশেষ বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে জাতীয় মহাসড়ক এন-৪ এবং এন-৬ মহাসড়কের ৭০ কিলোমিটার করে মোট ১৪০ কিলোমিটার সড়ক নিরাপদ করা হবে। পাইলট এই প্রকল্পের আওতায় ৫ হাজার কিলোমিটার সড়কের ইন্টারন্যাশনাল রোড অ্যাসেসমেন্ট প্রোগ্রাম (আইআরএপি) মূল্যায়ন, মাঝারি মাত্রার পূর্তকাজ, সড়কে সাইন ও মার্কিং, সড়ক নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় ক্রাশ ডাটা সিস্টেম এবং ইন্টিগ্রেটেড ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনসিডেন্ট ডিটেকশন সিস্টেম (আইটিএমআইডিএস) স্থাপন করা হবে; স্বতন্ত্র তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের মাধ্যমে বিআরটিএ’র বিদ্যমান তথ্য ব্যবস্থাপনা, গাড়ির নিবন্ধন ডাটাবেজ, ড্রাইভার লাইসেন্সিং এবং অর্থ প্রদান কার্যক্রমের সমন্বয় সাধন; দুটি জেলায় সড়ক নিরাপত্তা কমিটি গঠন করা হবে। এছাড়া পথচারীর নিরাপত্তা সুবিধা বৃদ্ধি, ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রম বাস্তবায়ন; প্রকল্পভুক্ত এলাকায় দুর্ঘটনা পরবর্তী স্বাস্থ্য পরিচর্যা ব্যবস্থার উন্নয়ন, ট্রমা রেজিস্ট্রি এবং ট্রমা সেন্টার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
একই সঙ্গে মাদারীপুরের শিবচরে হাইওয়ে পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমে হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, বাংলাদেশ পুলিশ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও অংশীজনের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানো হবে। বাণিজ্যিক গাড়িচালক গণের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে প্রকল্পের আওতায়। নিরাপদ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে দেশব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রচার কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হবে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় বলছে, সড়ক দুর্ঘটনাজনিত জখম এবং মৃত্যু বাংলাদেশে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০১৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩৭৬ জন নিহত হয়েছে। জনসংখ্যার হারের বিবেচনায় উন্নত দেশের তুলনায় এদেশে মৃত্যুহার তিনগুণেরও বেশি। বাংলাদেশ টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অভিজ্ঞতা অর্জন করলেও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর যে সংখ্যক লোক আহত ও নিহত হয় তা জিডিপির ২-৩ শতাংশের প্রভাব পড়ে। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ৩.৬ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এবং মৃত্যুর হার অর্ধেক কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা কমানো এবং সড়ক নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এটি বিশ্ব ব্যাংক প্রস্তাবিত রোড সেফটি প্রোগ্রাম (২০২০-২০৩০) এর আওতায় ১ম পর্যায়ের একটি প্রকল্প।
প্রকল্পের কার্যক্রমসমূহকে তিনটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম অংশের মাধ্যমে, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় করা, দুটি জাতীয় মহাসড়কের প্রতিটির ৭০ কি.মি. দৈর্ঘ্যরে অংশে নিরাপদ সড়ক প্রতিপাদন শীর্ষক পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন, টাঙ্গাইল ও বগুড়ায় সড়ক নিরাপত্তা উদ্যোগ তেমন, জেলা পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা কমিটি তৈরি, দুর্ঘটনা কবলিত ব্যক্তিদের জন্য বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, হাসপাতাল কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদান ইত্যাদি বাস্তবায়ন এবং ঢাকা শহরের দুটি এলাকায় (বনানী ও মোহাম্মদপুর) মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স চালু করা ইত্যাদি কার্যক্রম এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অংশ-২ এ রয়েছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়ন। নির্ধারিত সড়ক করিডোরসমূহে ব্যাপকমাত্রায় সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা এবং এর আওতায় ৫০০০ কি.মি. মহাসড়কের মাঝারি মাত্রার পূর্ত কাজ, সড়ক নিরাপত্তা সরঞ্জামসমূহ, সাইন এবং মার্কিং স্থাপন; ক্রাশ ডাটা সিস্টেম স্থাপন এবং আইন প্রয়োগ জোরদারকরণ, ৩টি হাসপাতালে ইমার্জেন্সি সেবা প্রদানের ইউনিটসমূহ উন্নতকরণের লক্ষ্যে মাঝারি মানের পূর্তকাজ করা হবে। প্রকল্পের পাইলট অংশে ইন্টিগ্রেটেড ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম স্থাপন ও মনিটর করা হবে। এর আওতায় কন্ট্রোল রুম স্থাপন, সিসিটিভি স্থাপন, অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনেশন ইত্যাদির রয়েছে। এ ছাড়াও বিআরটিএ বিভিন্ন সেবা যেমন মোটরযান রেজিষ্ট্রেশন, ড্রাইভার লাইসেন্সিং এবং ফি পরিশোধ সহজ করা হবে।
৩য় অংশের মূল কাজ কারিগরি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি করা। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, ন্যাশনাল রোড সেফটি অথরিটি (এন আর এস এ) এর ব্লু-প্রিন্ট প্রস্তুতকরণ, রোড সেফটি অডিট একারডেশন সিস্টেম প্রতিষ্ঠা, হাইওয়ে পুলিশদের প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন।
