নীরবেই কি প্রস্থান সাইলেন্ট কিলারের!

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৩, ০২:৫০ পিএম

নীরব ঘাতক বা ‘সাইলেন্ট কিলার’ উপাধি পাওয়া মাহমুদউল্লাহর বুঝি নীরবেই বিদায় বলে দিতে হচ্ছে জাতীয় দলকে। ২০২৩ বিশ্বকাপ খেলে জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করার বিলাসিতা আপাতত দেখাতে পারছেন না তিনি, এমনটাই মনে করেন ক্রিকেট বিশ্লেষক ও কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিম। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের সবশেষ আসরে ফরচুন বরিশাল দলের কোচ হিসেবে মাহমুদউল্লাহকে কাছ থেকেই দেখেছেন ফাহিম, জেনেছেন তার মনোজগৎটাও।

দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপে ফাহিমের অভিমত, নির্বাচকরা যদি উদার দৃষ্টিভঙ্গি না দেখান তাহলে গড়পড়তা পারফরম্যান্সে দলে ফেরার দরজাটা খুলবে না মাহমুদউল্লাহর জন্য।

পঞ্চ পা-বদের একজন হলেও মাহমুদউল্লাহ ঠিক বাকি চারজনের কাতারে নন, অন্তত পারফরম্যান্সের মাপকাঠিতে। মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার অধিনায়কত্ব নিয়ে যতই গালগল্প হোক না কেন, পারফরমার হিসেবেও মাশরাফী কম নন। চোটগ্রস্ত হওয়ার আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলারদের একজন ছিলেন। পড়ন্ত বেলায় স্লো-মিডিয়াম পেস বোলিং করলেও বুদ্ধিদীপ্ত কাটারের মিশেলে ব্যাটসম্যানদের ভালোই বিভ্রান্ত করেছেন।

সাকিব আল হাসান তো বিশ্বের সেরাদেরই কাতারে। তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিম দেশের সেরা ব্যাটসম্যান, টেস্টে দেশে ও দেশের বাইরে বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ম্যাচ জেতানো ইনিংস তো আছেই, সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১২ হাজারের বেশি রান। তাদের তুলনায় পরিসংখ্যানে বড্ড পিছিয়ে মাহমুদউল্লাহ। ৫০ টেস্টেও ৩ হাজার রান হয়নি তার, ২১৮ ওয়ানডে খেলেও হয়নি ৫ হাজার রান। ১২১ আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলার পরও রান ২১২২। অর্থাৎ টেস্ট ওয়ানডেতে গড় মধ্য তিরিশ আর টি-টোয়েন্টিতে প্রায় ২৪। স্ট্রাইক-রেট ১১৭।

সতীর্থরা যতই মাহমুদউল্লাহর ত্যাগ, অবদান অনেক কিছুর কথা সংবাদ সম্মেলনে বলে বলে দলে তার উপস্থিতিকে যৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে যান না কেন, সত্যি কথা হচ্ছে এমন নিম্ন-মাঝারি গড় নিয়ে কেউ কিংবদন্তির কাতারে নাম লেখাতে পারেন না। মাহমুদউল্লাহ আসলে পেরেছেন ২০১৫ বিশ্বকাপে তার দুটো শতরানের সুবাদে। সেবারই প্রথম বিশ্বকাপে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের শতরানের দেখা পাওয়া। তাও আবার এক জোড়া!

সেই সাফল্যই মাহমুদউল্লাহকে শামিল করে দেয় পা-বকুলে, যেটা আরও পোক্ত হয় ২০১৭ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২২৪ রানের ম্যাচ জেতানো জুটিতে। টেস্টে মাহমুদউল্লাহ বরাবরই খানিকটা নিষ্প্রভ, সীমিত ওভারের ক্রিকেটেই তার সাফল্য তুলনামূলকভাবে বেশি। টেস্ট দল থেকে বাদ পড়ার প্রায় বছর দেড়েক পর ফের ডাক পেয়ে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে শতরান করে দিয়েছিলেন অবসরের ঘোষণা।

টি-টোয়েন্টি দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ হয়তো হবে না তার, কারণ নির্বাচকরা তাকে বাদ দিয়েছেন টি-টোয়েন্টির সবশেষ কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে, গেল বছরের এশিয়া কাপের পর থেকেই আর নেই মাহমুদউল্লাহ। বাকি থাকল ওয়ানডে, সেখানেও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে সিরিজে দলে জায়গা পাননি মাহমুদ্দউল্লাহ। রাখা হয়নি ইংল্যান্ডের চেমসফোর্ডে হতে যাওয়া ৩ ওয়ানডের সিরিজের দলেও।

ফাহিম মনে করছেন, দলে ফেরাটা কঠিন মাহমুদউল্লাহর জন্য, ‘মুশফিক ছয়ে ব্যাট করতে নেমেছে তাওহীদ হৃদয়কে জায়গা দিতে। সেই ভূমিকায় সে ভালোও করেছে। রিয়াদের (মাহমুদউল্লাহ) জন্য কাজটা তাই কঠিন। এই ধরনের ক্রিকেটারদের মানসিকতা হচ্ছে তারা বড় ইনিংস খেলতে চায়, সেজন্য লম্বা সময় উইকেটে থাকতে চায়। যে কারণে রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে। আমি তাকে ফরচুন বরিশালে বুঝিয়েছি যে টি-টোয়েন্টিতে ২৫ বলে ৩০ রান করার চেয়ে ৪ বলে ১০ রান অনেক সময় বেশি উপকারী দলের জন্য। তবে ইদানীং তাকে দেখে মনে হচ্ছে খেলার অ্যাপ্রোচে একটু বদল এনেছে, আরেকটু আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলছে।’

চলতি ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে মোহামেডানের হয়ে খেলছেন মাহমুদউল্লাহ। জাতীয় দলে না থাকায় শুরু থেকেই খেলছেন। ১১ ম্যাচে ১০ ইনিংসে ২৮৪ রান, গড় ২৮.৪ আর স্ট্রাইক রেট ৮৮.৪৭। পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস দুটো, নিচু সারির দল সিটি ক্লাবের বিপক্ষে বিকেএসপিতে ৫৯ বলে ৭১ রানের ইনিংস আর ফতুল্লায় ব্রাদার্স ইউনিয়নের বলে ৬৮ বলে ৫৮। দুটো দলই সুপার লিগে উঠতে ব্যর্থ। বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে একটাই ভালো ইনিংস মাহমুদউল্লাহর, শেখ জামালের বিপক্ষে ৫১ বলে ৪৮ রান। ১ মে শুরু হচ্ছে সুপার লিগ পর্ব।

এই পাঁচটা ম্যাচই মাহমুদউল্লাহর ক্যারিয়ারের রূপরেখা এঁকে দেবে বলে মনে করেন ফাহিম, ‘সুপার লিগের পাঁচটা ম্যাচে সে কেমন করে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাকে গড়পড়তা বা মাঝারি কিছু নয়, খুব ভালো কিছু করতে হবে। না হলে ফেরা মুশকিল। নির্বাচকরা যদি খোলা মন নিয়ে ভাবেন যে ভালো করলেই রিয়াদকে নিয়ে নেব, তাহলে ভালো করলে সে হয়তো বিশ্বকাপে খেলবে কারণ তার অভিজ্ঞতাটার দরকার আছে। কিন্তু নির্বাচকরা যদি মনে করেন তাকে আর দরকার নেই, তাহলে হাজার ভালো খেললেও সে দলে আসবে না।’

এই ব্যাপারে কোচ চন্দিকা হাথুরুসিংহের একটা প্রভাবও থাকতে পারে বলে মনে করেন ফাহিম, ‘একজন কোচ যখন আসে, তখন খুব স্বাভাবিক সে নিজস্ব একটা পদ্ধতি তৈরি করতে চায়। নতুনরা তার সেই পদ্ধতিতে ভরসা করে যেটা পুরনোরা করে না। কোচও চায় সামনের দিনগুলোতে যাদের নিয়েই বেশি কাজ করতে হবে, তাদের পেছনেই যতটা সম্ভব শ্রম দিতে।’

আর দিন দুয়েক পরেই সিলেটে শুরু হবে আয়ারল্যান্ড সিরিজের ক্যাম্প। যেখানে হাই পারফরম্যান্স দলের কয়েকজনকেও হয়তো নেওয়া হবে পরখ করে দেখতে আর প্রস্তুতি ম্যাচে দুই একাদশ গড়তে। মাহমুদউল্লাহ সিলেট কিংবা বিলেত কোনো যাত্রাতেই নেই। তার সামনে মে দিবসে আবাহনীর বিপক্ষে অগ্নিপরীক্ষা। সাকিব, মেহেদি মিরাজরা না থাকায় বড় সুযোগও। ইয়াসির রাব্বির ব্যর্থতার সঙ্গে সুপার লিগে নিজের সাফল্য, এই দুইয়ের যোগফলেই বিশ্বকাপের দরজা খুলতে পারে মাহমুদউল্লাহর জন্য। না হলে এক সময়ের নীরব ঘাতককে বিদায় নিতে হবে নীরবেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত