দেশের মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা ১১টি। বিগত দিনগুলোতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে মূলধন ঘাটতি পূরণে বাজেট থেকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এবার সরকারি বাজেট সহায়তা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিসহায়তা ছাড়াই ব্যাংকগুলোকে পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এক কথায়, কোনো জোগান ছাড়াই ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণে গুরুত্ব এই আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, মূলধন সংরক্ষণ নিয়ে এবার খুবই শক্ত অবস্থান নিয়েছে আইএমএফ। গত ২৫ ও ২৬ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে দফায় দফায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সুদের হারের সীমা তুলে দেওয়া, ডলারের একক রেট নির্ধারণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির ভূমিকা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানিতে ভর্তুকি কর্তন, ঋণের যথাযথ ব্যবহার, খেলাপি হ্রাস, ব্যাংকের পরিদর্শন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে ঝুঁকিভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা আনা, ব্যাংকের পাশাপাশি বীমা, মিউচুয়াল ফান্ড, ক্ষুদ্রঋণসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডাটাভিত্তিক হালনাগাদ তথ্য, পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন সম্পর্কে তথ্য চেয়েছে আইএমএফ।
২০২২ সালের শেষ তিন মাসে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ নবায়নের মাধ্যমে নিয়মিত করার পরও ব্যাংক খাতে মূলধন পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে- গত বছরের ডিসেম্বর শেষে সরকারি-বেসরকারি ১১ ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে আছে। এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার ৭০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি ব্যাংকের মূলধন ভিত্তির অনুপাত (সিএআর) ঋণাত্মক ধারায় নেমেছে। এ ছাড়া ঘাটতিতে থাকা বেশ কয়েকটি ব্যাংক বছরের পর বছর বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি নিয়ে চলছে। এ ধরনের পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতির দুর্বলতা নির্দেশ করে। মূলত বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই ব্যাংকগুলোতে মূলধন সংকট দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নানা ছাড় ও নিবিড় তদারকির পরও তাদের মূলধন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। অন্যদিকে কিস্তি পরিশোধে ছাড় আর ঋণ নবায়নের শর্ত শিথিলের সুযোগ নিয়ে অনেকে বছরের পর বছর ব্যাংকের টাকা ফেরত না দিয়েও খেলাপিমুক্ত থাকছেন।
আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাসেল-৩ নীতিমালার আলোকে ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ অথবা ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি সে পরিমাণ মূলধন রাখতে হচ্ছে। কোনো ব্যাংক এ পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে মূলধন ঘাটতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিয়মানুযায়ী, ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের জোগান দেওয়া অর্থ ও মুনাফার একটি অংশ মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। কোনো ব্যাংক মূলধনে ঘাটতি রেখে তার শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারে না। এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলো কোনো স্থানীয় ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন করার আগে ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে থাকে।
সূত্র জানাই, বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে রাষ্ট্রের মালিকানাধীন চার ব্যাংক- সোনালী, অগ্রণী, রূপালী ও জনতা ব্যাংক। ডিসেম্বর শেষে চার ব্যাংকেরই শুধু মূলধন ঘাটতি হয়েছে ৯ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। এর ফলে আন্তর্জাতিক মানদ-ে পিছিয়ে পড়ছে ব্যাংকগুলো। এমনি পরিস্থিতিতে ন্যূনতম মূলধন ১০ শতাংশে উন্নীত করতে আগামী জুন পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বলা হয়েছে, আগামী জুনের মধ্যে মূলধন সংরক্ষণ ন্যূনতম সীমার মধ্যে আনতে হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের পরিমাণও কমাতে হবে।
জানা গেছে, আইএমএফের কাছ থেকে বাংলাদেশকে ঋণ সহায়তা হিসেবে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার পেতে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য শর্তগুলোর মধ্যে ব্যাংকিং খাত সংস্কার করতে হবে। আর এজন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে। কমাতে হবে খেলাপি ঋণ। মূলধন ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। এটা পূরণ করার জন্যই বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের মধ্যে অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। অগ্রণী ব্যাংকের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ২২.৩১ শতাংশ। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি হয়েছে চার হাজার ৪২২ কোটি টাকা এবং মূলধন ঘাটতি তিন হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা।
জনতা ব্যাংকের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার হয়েছে ১৮.২৪ শতাংশ, রূপালী ব্যাংকের ১৬.৫৬ শতাংশ এবং সোনালী ব্যাংকের ১৫.৪৩ শতাংশ। বৈঠকে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ন্যূনতম মূলধন ১০ শতাংশের ওপরে উন্নীত করতে হবে। আগামী জুনের মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের হার কমপক্ষে ১০ শতাংশ উন্নীত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ডিসেম্বরে মূলধন ঘাটতির তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে- রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক। আর বিশেষায়িত খাতের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী
কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে আছে। আগের তিন মাসেও এই ১১ ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে ছিল। ওই সময় ব্যাংকগুলোর ঘাটতির পরিমাণ ছিল আরও বেশি, প্রায় ৩২ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা।
