গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলায় সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে। প্রতিদিন ঝরছে তরতাজা প্রাণ। রাজধানী ঢাকা এবং জাতীয় সড়ক ও মহাসড়কে গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ফেরাতে চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। নানা সময়ে নানা হাঁকডাক হলেও এসবে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এত ব্যর্থতার মধ্যেও হাতিরঝিল চক্রাকার বাস সার্ভিস দেশে শৃঙ্খলিত বাস চলাচলে অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। প্রকল্প এলাকায় একটি কোম্পানির আওতায় স্বতন্ত্র বাস সার্ভিস চালুর পর সাত বছরেও ঘটেনি কোনো দুর্ঘটনা।
হাতিরঝিল প্রকল্পটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালের অক্টোবরে হাতিরঝিল প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। প্রকল্প প্রক্রিয়ার শুরু থেকে হাতিরঝিলের ভেতরে ও বাইরে বাস ঢুকতে না দেওয়ার পরামর্শ ছিল। দেশের খ্যাতিমান পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও প্রকৌশলীরা প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী হাতিরঝিল প্রকল্প এলাকায় চক্রাকার বাসসেবা চালুর সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর হাতিরঝিল চক্রাকার বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করা হয়। চারটি বাস দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে চলাচল করছে ১৪টি বাস। বিকল্প হিসেবে আরও ৬টি প্রস্তুত রাখা হয়। সকাল ৭টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বাসগুলো চলাচল করে। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার যাত্রী চলাচল করে। ৫ থেকে ৭ মিনিট অন্তর বাসগুলো স্টপেজ ছেড়ে যায়। সর্বনিম্ন ভাড়া ১৫ টাকা। আর পুরো প্রকল্প এলাকা ঘুরে আসতে খরচ হয় ৪০ টাকা। এই বাসরুটের দূরত্ব ১০ কিলোমিটার। শুরু থেকে এইচআর ট্রান্সপোর্ট হাতিরঝিল চক্রাকার বাস সার্ভিস পরিচালনা করছে। প্রকল্প সূত্রে আরও জানা যায়, দুই ধরনের বাস রয়েছে হাতিরঝিলে। ৩২ সিটের ৮টি বাস এবং ২২ সিটের ৬টি বাস। সিটগুলো রাউন্ট সিস্টেম। গোলাকার হয়ে বাসের ভেতরে বসেন যাত্রীরা। এতে খোলামেলা পরিবেশ পাওয়া যায়। চক্রাকার বাস সার্ভিসের স্টপেজ রয়েছে, বউবাজার, কুনিপাড়া, শুটিং ক্লাব, মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, মহানগর প্রজেক্ট ও মধুবাগ।
১৯ এপ্রিল ২০২৩। সরেজমিন ঘুরে দেখা হয় হাতিরঝিল চক্রাকার বাস সার্ভিস। দুপুর ২টায় টিকিট নিয়ে স্টপেজের সামনে লাইনে থাকা যাত্রীরা শৃঙ্খলিতভাবে বাসে উঠলেন। সরকারি ছুটির কারণে বাসে যাত্রীর চাপ কম ছিল। আমাকে বহন করা বাসে যাত্রী ছিল ১৪ জন। নির্দিষ্ট স্টপেজে বাস থামে, যাত্রীরা নেমে যাচ্ছেন। যাত্রীদের মধ্যে কোনো হুড়োহুড়ি লক্ষ করা যায়নি। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ চড়ছেন হাতিরঝিল চক্রাকার বাসে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয় বাসগুলো। এজন্য যাত্রীরা চলাচলে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
বাসে কথা হয় মহানগর প্রজেক্টের বাসিন্দা ডা. হাসিবুল হাসান শান্তর সঙ্গে। তিনি বলেন, বাস সার্ভিস চালু হওয়ার পর থেকে নিয়মিত বাসে চলাচল করি। খুব দ্রুত চলাচল করা যায়। যানজটের কবলে পড়তে হয় না। শৃঙ্খলিতভাবে চলাচল করে। চলাচল আরামদায়ক। অবশ্য শহরের অন্যান্য বাসের তুলনায় এখানে ভাড়া একটু বেশি।
ওই বাসে কথা হয় বেগুনবাড়ি এলাকার বাসিন্দা ও কারওয়ান বাজার মাছ বাজারের শ্রমিক মো. আজিজুল ইসলামের সঙ্গে। লুঙ্গি পরে বাসে বসা এই শ্রমিক আগ্রহী হয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাতিরঝিলের চক্রাকার বাসের কারণে আমরা খুব সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারি। যানজটের ধকল সামলাতে হয় না। অন্য এলাকা দিয়ে চলাচল করতে অনেক সময় লাগে।
সরকার সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে না পারায় দেশে দুর্ঘটনা বাড়ছে। দেশের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি নিয়ে কাজ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশনের হিসাব বলছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বাড়ছে। ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন। ২০২২ সালে মারা গেছেন ৬ হাজার ৫৮৪ জন।
সড়কে কোন পরিবহন কত চলবে সেটা নির্ধারণ করতে পারছে না সরকার। এ জন্য বেড়ে যাচ্ছে যানবাহনের সংখ্যা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব বলছে, গত মার্চ মাস পর্যন্ত দেশের যানবাহনের সংখ্যা ৫৬ লাখ ৮৬ হাজার ৯১৭টি। এরই মধ্যে ঢাকার যানবাহনের সংখ্যা ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ১১৪টি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্যমতে, পদ্মা করিডর চালু হওয়ার পর গত বছরের ২৫ জুন থেকে গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ২৭৯ দিনে ২২২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে মারা গেছেন ২৬৪ জন। এ হিসাব বলছে, পদ্মা করিডরে দিনে প্রায় একজন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে বিশৃঙ্খল গণপরিবহনব্যবস্থা বিরাজমান। এ জন্য বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশ^ব্যাপী কোম্পানিভিত্তিক গণপরিবহন পরিচালনা করা হয়, সেখানে প্রতিযোগিতা থাকে না। আর প্রতিযোগিতা না থাকলে সেখানে দুর্ঘটনা ঘটার কারণ থাকে না। বিশ^ব্যাপী এই পদ্ধতি জনপ্রিয় হলেও এ দেশে এই পদ্ধতিও ব্যর্থ হতে বসেছে। ঢাকায় দুই মেয়র বাসরুট রেশনালাইজেশন পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে রীতিমতো নাকাল হচ্ছেন। এ পদ্ধতির সফলতা দেখাতে না পারলে মানুষ এতে বিশ্বাস রাখবেন না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে শৃঙ্খলিত গণপরিবহনের একমাত্র উদাহরণ হাতিরঝিল চক্রাকার বাস সার্ভিস। প্রকল্পের শুরু থেকে বুয়েট যুক্ত ছিল। সেখানে আমরা রাজউককে পরামর্শ দিয়েছিলাম এককভাবে স্বতন্ত্র বাস সার্ভিস পরিচালনা করতে। রাজউক সেটার সফল বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। যার সুফল নগরবাসী ভোগ করছেন। চালু হওয়ার পর থেকে প্রায় সাত বছর সময়ে সেখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। কোনো আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
হাতিরঝিল চক্রাকার বাস সার্ভিস পরিচালনা করেন এইচআর ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির সুপারভাইজার শওকত হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাতিরঝিল চক্রাকার বাস সার্ভিস খুব ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে। রাজউক আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছে, আমরা সেভাবে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। যাত্রীরাও আমাদের সেবায় সন্তুষ্ট। তবে ভাড়া একটু বেশি হওয়ায় অনেক সময় যাত্রীরা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। নির্ধারিত এলাকায় উন্নতমানের সেবা নিশ্চিত করতে এর চেয়ে কম ভাড়ায় বাস চালাতে অসম্ভব হবে।
জানতে চাইলে হাতিরঝিল প্রকল্প পরিচালক ও রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী এ এস এম রায়হানুল ফেরদৌস দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাতিরঝিল ঢাকার ভেতরে হলেও এটা একটা পর্যটন এলাকা। এ জন্য শুরুতে স্বতন্ত্র বাস সার্ভিসের পরামর্শ আসে। সে সময় বুয়েট এবং অন্য বিশেষজ্ঞরা আমাদের সঙ্গে কাজ করেন। সবাই বাংলাদেশি, তাদের পরামর্শক্রমে এটা করা হয়েছে। তিনি বলেন, হাতিরঝিল চক্রাকার বাস সার্ভিস খুব ভালো সেবা দিচ্ছে। যাত্রীরাও খুশি। পর্যটন এলাকা এবং যাত্রীসেবার মান ঠিক রাখতে সাধারণ বাসের চেয়ে ভাড়া একটু বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে।
