প্রকৌশলীর মানবিক প্রকৌশল

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৩, ০১:২৩ এএম

একটি দুর্ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল তাকে। ছুটে গিয়েছিলেন দুর্ঘটনাস্থলে। তারপরও গবেষণা, সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি আর প্রচারাভিযানের মাধ্যমে তিনি বদলে দিয়েছেন ট্রাকের আকার। যার ফলাফল এখন এ পণ্যবাহী যানটির সঙ্গে অন্য যানবাহনের ঘটনা বহুলাংশে কমে গেছে। এ ব্যক্তি হলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েটের) শিক্ষক অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তিনি একই সঙ্গে দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালকও।

বিধি অনুযায়ী, গাড়ির শ্রেণি পরিবর্তন অবৈধ। যে মডেলের গাড়ি কেনা হবে তার ধরন অনুযায়ী চওড়া, উচ্চতা, লম্বা একই থাকতে হবে। আইনে সুনির্দিষ্টভাবে বলা থাকলেও ট্রাকের ক্ষেত্রে আকৃতি বদলে বাম্পার স্থাপন, চওড়া বাড়িয়ে শোল্ডার ও অ্যাঙ্গেল বসানো হতো। এর ফলে দেশে অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়কের চলাচলের সময় ট্রাকের বডির অতিরিক্ত অংশ, শক্ত ও ধারালো অংশের কারণে দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে গেছে শত শত প্রাণ।

বিষয়টি নজরে আসে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হকের। তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক। ট্রাকের বডি বদলে লম্বা ও চওড়া করার ফলে সৃষ্ট দুর্ঘটনাগুলোকে মুখোমুখি সংঘর্ষ বলা হতো। গণমাধ্যমগুলো সেভাবেই খবর প্রচার করত। প্রায় দেড় দশক আগে ড. সামছুল হকের মাথায় ঢোকে এটা মুখোমুখি নয়, পাশর্^সংঘর্ষ। সড়ক দুর্ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে তিনি সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়গুলো গণমাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা শুরু করেন। প্রথম থেকে তিনি বলেছেন, ট্রাকের বডি পরিবর্তন করে চওড়া, লম্বা বাড়ানো এবং শক্ত বাম্পার ও অ্যাঙ্গেলের কারণ এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। বাসের পাশের অংশ দুর্বল হওয়ায় ট্রাকের শক্ত অংশের ধাক্কায় একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এসব মুখোমুখি সংঘর্ষ নয়, পাশর্^সংঘর্ষ। আর এসব ঘটছে ট্রাকের অতিরিক্ত অংশের কারণে।

অধ্যাপক সামছুল হক বলছিলেন, ‘২০০৮ সাল পর্যন্ত এ বিষয়ে গবেষণা ও গণমাধ্যমে লেখালেখি ও কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলাম। তবে একটি দুর্ঘটনা আমাকে আর বসে থাকতে দেয়নি। ২০০৮ সালে ক্যাম্পাস ছুটি হলে বুয়েটের শেষবর্ষের এক শিক্ষার্থী গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় যাওয়ার পথে ট্রাক-বাসের পাশর্^সংঘর্ষে মারা যান। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার করপাইয়ে রাতের বেলায় একটি সড়ক দুর্ঘটনা হয়। সেখানে অনেকে মারা যায়।’

ওই দুর্ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে খোলা ট্রাকে প্লাস্টিকের ড্রামে করে অ্যাসিড নিয়ে আসছিল। ট্রাকের ত্রিপলও দেওয়া ছিল না। দুর্ঘটনাস্থলে সড়কের পাশে একজন নারীকে বাঁচাতে গিয়ে বাসটি রং সাইডে আসে। বিপরীত দিক থেকে যে ট্রাকটি আসছিল সেও অনুমান করেছিল হয়তো দুর্ঘটনা হবে না। যেকোনো চালক গাড়ির মাথা বের করতে পারলে বোঝে যে পেছনটাও বেরিয়ে যাবে। কিন্তু ওই ট্রাকের বর্ধিতাংশ থাকায় দুর্ঘটনা ঘটে।’

অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, ‘আমাদের দেশের ট্রাকমালিকরা বেশি মালামাল নেওয়ার জন্য চেচিসটা নিয়ে আসে দেশের বাইরে থেকে আর বডিটা তৈরি করে দেশে। গাড়ি তৈরির সময় চওড়া, উচ্চতা, দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে দেয়। এটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।’ তিনি বলেন, ‘ট্রাকের শোল্ডার বাসের সঙ্গে লেগে দুর্ঘটনা ঘটে। শোল্ডারই ট্রাকের সবচেয়ে সবল জায়গা। সেখানে আবার শ্রমিকদের ওঠানামা করাতে পাটাতন দেওয়া হয়। এসব পাটাতন যখন বাসের সঙ্গে লাগে তখন তাতে ছুরির মতো বাস কেটে যায়। এ ছাড়া ট্রাকের দুপাশে বড় বড় অ্যাঙ্গেল দেওয়া হতো। দুর্ঘটনায় এসব অ্যাঙ্গেল বাস ও যাত্রীদের শরীরে বল্লমের মতো বিঁধে যেত।

ড. সামছুল হক বলেন, ‘আমার ছাত্র নিহত হওয়ার আগেই বেশ কিছু দুর্ঘটনার খবর বিশ্লেষণ করে বিষয়টা পরিষ্কার হয়েছিলাম। আমার ছাত্র যখন মারা গেল তখন আমার বিবেকের ভিত নড়ে গেল।’ এরপর তিনি দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যান, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন। পুলিশ ফাঁড়ি, থানা ও চিকিৎসকদের কাছে যান। ফায়ার সার্ভিসের কাছে যান। অংশীজনদের কাছেও যান।

ড. সামছুল হক বলছিলেন, ‘কুমিল্লায় ট্রাক ও বাসের পাশর্^সংঘর্ষে নিহতদের একজনের পেটের ভেতর অ্যাঙ্গেল ঢুকে গিয়েছিল। সেটা পেটের ভেতর মোচড় খায়। বড়শির মতো তা যাত্রীকে ঝুলিয়ে রাখে। পুলিশ অনেক চেষ্টা করেও অ্যাঙ্গেল থেকে ওই লোককে ছাড়াতে পারেনি। পরে সেটা কেটে অ্যাঙ্গেলসহ মরদেহ দাফন করা হয়।’ এ দুর্ঘটনায় সরকারের পাশাপাশি অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বে আলাদা একটি তদন্ত হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গবেষণা করে কারণ অনুসন্ধান করতে পারলেও বুয়েটের এ শিক্ষকের পক্ষে কারণ দূর করতে যা করা তা করা সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তা দরকার। তদন্ত কাজ শেষে তিনি একটি প্রেজেনটেশন তৈরি করেন। এরপর একটা সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। ২০১৬ সালে এমন একটি সুযোগ এসে যায় ড. হকের কাছে। সরকারের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ মোটরযানের এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালা ২০১২ বাস্তবায়নসংক্রান্ত একটি সভা আহ্বান করে। সেখানে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, দপ্তর, সংস্থা ও অংশীজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে তিনি নির্ধারিত ইস্যুর পাশাপাশি ট্রাকের বর্ধিতাংশের কারণে সৃষ্ট দুর্ঘটনার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

এরপর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বিআরটিএর কারিগরি নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে যেসব ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান আকার পরিবর্তন ও বর্ধিত করা হচ্ছে, তা ঝুঁকিপূর্ণ কি না দেখার জন্য একটি কমিটি করা হয়। ২০১৬ সালে ওই বিষয়ে একাধিক সভা হয়েছে। ওই বছরের শেষের দিকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ট্রাকের অবৈধ অংশ অপসারণ কাজ শুরু করে। ওই বছরের ২০ অক্টোবর বিআরটিএর পক্ষ থেকে প্রথম বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের অ্যাঙ্গেল, অননুমোদিত বাম্পার এবং ট্রাকের বডিতে লাগানো ধারালো হুক অপসারণসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। আর ২০১৭ সাল থেকে বিআরটিএ বর্ধিতাংশ রয়েছে এমন ট্রাকের ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়া বন্ধ করে। বিআরটিএর পাঁচ বছরের চেষ্টায় ট্রাকের বর্ধিতাংশ এখন আর দেখা যায় না।

এমন সংস্কার কীভাবে সম্ভব হলো জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘আবেগ ও ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করেছি।’ চলার পথে কখনো হতাশা এসেছিল কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালে দেশের ৬৪ জেলার পরিবহন মালিকদের নিয়ে বিআরটিএর এলেনবাড়ী অফিসে যে সভা হয়েছিল সেখানে পরিবহন মালিকরা আমাকে অনেক গালাগালি করেন, হতভম্ব হয়ে গেলাম। শুধু রাজাকার বলা বাদ রাখল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক পরিবহন মালিক আমাকে উদ্দেশ্য করে আঁতেল বললেন। তখন খুব হতাশ বোধ করেছি। অনেক খারাপ লেগেছে। তবে কিছুক্ষণ পর সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল।’

ড. সামছুল বলেন, ‘ওই সভায় পরিবহন মালিক সমিতির নেতা খন্দকার এনায়েতউল্লাহ চিৎকার দিয়ে পরিবহন মালিকদের থামিয়েছিলেন এবং আমার প্রেজেনটেশনের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। এরপর তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা মালিকদের বলেছিলেন, “তোরা এতদিন কুয়ার পানি খাইছস। তোদের বাপ-দাদাও খাইছে। এখন ট্যাবের পানি খাস কেন। দেশ এগিয়েছে। তোরা পিছিয়ে থাকবি কেন। আমি এটা মেনে নিচ্ছি। তোদেরও মানতে হবে”। এরপর বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা শান্ত হন।’

ওই সভায় ছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. ওসমান আলী। বুয়েটের এ অধ্যাপকের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রাকের বর্ধিতাংশের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে, এটা প্রথমে ধরিয়ে দেন ড. সামছুল হক। তিনি আমাদের বুঝিয়েছেন। সরকারকে বুঝিয়েছেন। পরে আমরা উদ্যোগী হয়ে ট্রাকের বর্ধিতাংশ বাদ দেওয়ার বিষয়টা বাস্তবায়ন করেছি। এটা আইনগতভাবেও অবৈধ ছিল। এখন তো এমন দুর্ঘটনা নেই বললেই চলে।’

বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রুস্তম আলী খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রায় চার লাখ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান রয়েছে। এর মধ্যে কাভার্ড ভ্যান ও কিছু ট্রাকে বর্ধিতাংশ যুক্ত করা হয়েছিল। বিষয়টা নিয়ে বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনে বারবার বলা শুরু করেন। বিআরটিএ ও মন্ত্রণালয় এটা পরিবর্তনে কমিটি গঠন করে। একটা পর্যায়ে আমরাও দেশ-বিদেশের ট্রাকের অবকাঠামো বিশ্লেষণ করে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘আগে মালিকরা ভালোভাবে না জানার কারণে এটা করে থাকতেন। এখন জানার পর আর করছেন না। আর বিআরটিএও ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয় না। সব মিলিয়ে খুব ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটা সবার জন্য ভালো হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত