যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাবেক দুই নেতাকে গুলি করে হত্যার পর থেকে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়নের মানুষ। গত ২৫ এপ্রিল রাতে জেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাকিব ইমামকে বশিকপুরের পোদ্দার বাজার এলাকায় সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। এর পর থেকে পোদ্দার বাজারসহ ইউনিয়নটির ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীসহ পুরো জনপদের মানুষের মধ্যে ভর করে অজানা আতঙ্ক। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশি টহলসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হলেও সেই আতঙ্ক কাটেনি।
বশিকপুরের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের নেতারাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বলছে, এই ইউনিয়নে রয়েছে অবৈধ অস্ত্রধারী শতাধিক সন্ত্রাসী। জীবন বাঁচাতে এসব অস্ত্রধারীদের অনেকেই চাঁদা দিয়ে থাকেন। এসব অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীরা গ্রেপ্তার না হলে বশিকপুর শান্ত হবে না। ১৯৯৮ সাল থেকে শুরু করে বশিকপুরে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড চলছে। তখন থেকে এ পর্যন্ত ২৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে এই এলাকায়। এছাড়াও সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ে ১২ জন পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। কেউ হারিয়েছেন পা, কেউবা আবার হারিয়েছেন চোখ। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও নির্মূল করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
বশিকপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জোড়া খুনের পর থেকে পোদ্দার বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতি খুব কম। রাজনৈতিক দলের নেতারা ছাড়াও সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে বলে জানিয়েছেন অনেকে।
ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আমির হোসেন বলেন, ১৯৯৭ সাল থেকে হানাহানির শুরু। তখন থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি বালাইশপুর গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মফিজ উল্যা, একই গ্রামের ছাত্রলীগ নেতা মো. ফয়সাল, আওয়ামী লীগ নেতা মো. সোলায়মান, ফতেহধর্মপুর গ্রামের ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হারুন, নন্দীগ্রামের আওয়ামী লীগ কর্মী মো. আহসান উল্যা, ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা মো. রতন ও চৌধুরী মিয়া, রশিদপুর গ্রামের ইউনিয়ন যুবলীগের সহসভাপতি মো. আলাউদ্দিন, বিরাহিমপুর গ্রামের ছাত্রলীগ নেতা মো. রোমান, বশিকপুর গ্রামের রিয়াদ এবং ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি ও রোকনপুরের হাবিবুর রহমান বাবুলকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
তিনি আরও বলেন, হত্যা ছাড়াও যুবলীগ কর্মী রোকনপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম হিরু ও কাশিপুর গ্রামের যুবলীগের ওয়ার্ড সভাপতি মনির হোসেনের পায়ে গুলি এবং বিরাহিমপুর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. খোকন ও বশিকপুর গ্রামের ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা মানিকের পা ভেঙে পঙ্গু করে দেওয়া হয়। এছাড়া আরও অনেক নেতাকর্মীকে গুলি করে ও মারধর করে আহত করা হয়।
বশিকপুর ইউনিয়নে অবৈধ অস্ত্রধারী শতাধিক সন্ত্রাসী রয়েছে দাবি করে আমির হোসেন বলেন, ‘অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীরা গ্রেপ্তার না হলে বশিকপুর শান্ত হবে না। আমরা বর্তমানে আতঙ্কে আছি, জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। স্বদেশেও যেন পরবাসে রয়েছি। খুনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবি করছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বশিকপুর গ্রামের একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, ‘বশিকপুরে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এখানে রয়েছে অস্ত্রধারী শতাধিক সন্ত্রাসী। যাদের মধ্যে অন্যতম এক সময়ের জামায়াতকর্মী ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান, যিনি বর্তমানে থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তার বিরুদ্ধে ৫টি হত্যা মামলা রয়েছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে পোদ্দার বাজারের অনেকে এদের চাঁদা দিয়ে থাকে।’
একই ধরনের তথ্য দেন বশিকপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপপরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক সামছুর রহমান পাটোয়ারী। তিনি বলেন, ‘১৯৯৮ সাল থেকে বশিকপুরে হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। এ পর্যন্ত ২৪ খুনের ঘটনা ঘটেছে এলাকায়, ১২ জন পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। কেউ পা হারিয়েছেন, কেউ চোখ হারিয়েছেন। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও নির্মূল করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।’
বশিকপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান খোকন বলেন, ‘১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার আসার পরে বশিকপুরে কাসেম জিহাদী বাহিনী গঠন করে। গড়ে তোলে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনী। এর পর থেকে ইউনিয়নে শুরু হয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। খুন হয় ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মো. সেলিম, ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. জাহাঙ্গীর আলম খোকন, ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি মো. ইস্রাফিল, যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ, মো. মোরশেদ, কামাল, ৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবদল কর্মী সুমন এবং রিয়াদ। এছাড়াও আহত হয় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৫০ নেতাকর্মী।’
তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি জোড়া খুনের মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়েছে কাসেম জেহাদীকে। আধিপত্য বিস্তার, ইউপি নির্বাচন ও দলীয় কোন্দলে আওয়ামী লীগেরও অনেক নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার এবং খুনিদের উপযুক্ত বিচার না হলে সন্ত্রাসের এই জনপদে শান্তি ফিরে আসবে না।’
পোদ্দার বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. হারুন জানান, জোড়া খুনের পর পোদ্দার বাজার এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক নেমে আসে। বর্তমানে বাজারে লোকজন তেমন একটা আসছে না। কেনাবেচা খুব কম, ট্রাকের চালকরা মাল নিয়ে বাজারে আসতে চায় না ভয়ে। এই হত্যাকাণ্ড দোকানিদের মারাত্মক ক্ষতি করেছে।
বশিকপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চন্দ্রগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবুল কাসেম জেহাদীর সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে আমার ছোট ভাই সাবেক যুবলীগ নেতা নোমান ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রাকিব নিহত হয়েছে। এভাবে আর যেন কোনো লাশ না পড়ে সেজন্য প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের তাগিদ দিয়েছেন লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু। তিনি বলেন, ‘মাসিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সভায় আমি বরাবর বলে আসছি সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা দরকার। যদি তা না করা যায় তা হলে খুন-খারাবি, অসামাজিক কার্যকলাপ দেখা দেবে সমাজে। প্রশাসন তৎপর না হওয়ায় বশিকপুরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বশিকপুরের হারুন, আলাউদ্দিন ও জোড়া খুনের ঘটনা সব একই সূত্রে গাঁথা। এখানে লাদেন বাহিনী ছিল। তার অনুসারীরা এখনো আছে, তাদের কাছে অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। প্রশাসনকে তৎপর হতে হবে। বশিকপুরে হত্যাকা-ের ঘটনায় মানুষ আতঙ্কিত।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলার পুলিশ সুপার মো. মাহফুজ্জামান আশরাফ বলেন, ‘জোড়া হত্যাকাণ্ডের পর সাদা পোশাকে ডিএসবি ও ডিবি পুলিশ এলাকায় অবস্থান করছে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে। স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্পে একজন উপপরিদর্শক ছিল, সেখানে একজন পরিদর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বশিকপুরের চেয়ারম্যানসহ জনগণের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ কাজ করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জোড়া হত্যাকাণ্ডের পর মানুষ মুখ খুলতে শুরু করেছে। মানুষ প্রতিবাদী হচ্ছে। এটা পুলিশের তৎপরতার কারণে সম্ভব হচ্ছে। আমি এলাকায় গিয়েছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। বর্তমানে যে সমস্যা আছে তা কেটে যাবে। জোড়া খুনের মামলার ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অন্যদের ধরতে চেষ্টা করছি।’
