দেশের দ্বীপজেলা, চর ও পার্বত্য এলাকার মতো দুর্গম জনপদের মানুষের কাছে বিদ্যুতের আলো ছিল স্বপ্নের মতো। সেই স্বপ্নপূরণে সরকার পদক্ষেপ নিলেও দুর্নীতি-অনিয়মে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী দেশব্যাপী শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা দেন। দক্ষিণ এশিয়ায় শতভাগ মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় অবশ্য প্রথমেই বাংলাদেশ আনছে এমনটি নয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত শ্রীলঙ্কা, দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ ও পাহাড়বেষ্টিত ভুটানে শতভাগ মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে ২০১৯ সালের মধ্যেই। সেখানে বাংলাদেশের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ এলাকা বিদ্যুতের আওতায় রয়েছে। সরকার জানাচ্ছে, বাকি মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে চলতি বছরের মধ্যেই। আশা করা হচ্ছে অবকাঠামো ও ভৌগোলিক কারণে যেসব অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, সেসব এলাকায় সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে দেশব্যাপী শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা সফল হবে। এ ক্ষেত্রে, সৌরবিদ্যুতের প্যানেলের উচ্চমূল্য ও উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে। এমতাবস্থায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থ ব্যয়ে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বিনামূল্যের সোলার প্যানেল স্থাপনে বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলায় একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে। গত সোমবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোর্ডের বরাদ্দ দেওয়া ৯৫৪টি সোলার প্যানেল স্থাপন নিয়ে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহিম এবং ওই ইউনিয়নের মেম্বার মো. আবদুল মমিন, মেম্বার মানিক ত্রিপুরা এবং মেম্বার মহরম আলীসহ আরও কয়েকজন সোলার প্যানেল দেওয়ার নামে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা আদায় করেছেন। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ৯৫৪ জনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে জমা দেওয়া হয়। গত ২১ মার্চ বোর্ডের চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা ও ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল আলম চৌধুরী বাটনাতলী ইউনিয়নে সোলার প্যানেল বিতরণ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনে গেলে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশ পায়। পরে সোলার প্যানেল বিতরণ কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরত দিয়ে নতুন করে তালিকা করতে বলা হয়। কিন্তু এ নির্দেশনা আমলে না নিয়ে প্রস্তাবিত সুবিধাভোগীদের পরিবারের স্বামীর পরিবর্তে স্ত্রী, স্ত্রীর পরিবর্তে স্বামী, বাবার পরিবর্তে ছেলে, ভাইয়ের পরিবর্তে বোন, বোনের পরিবর্তে ভাইকে রেখে নতুন করে তালিকা করা হচ্ছে।
সোলার প্যানেল দেওয়ার নামে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার সত্যতা গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তেও ধরা পড়েছে। এর সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি ছাত্রলীগ নেতা, ইউনিয়ন পরিষদের কর্মচারী ও স্কুল শিক্ষকদের জড়িত থাকার কথাও উঠে এসেছে তদন্তে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় সমাজে দুর্নীতি-অনিয়ম কোনো শ্রেণি-পেশার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই পরিস্থিতি এক ভয়াবহতারই ইঙ্গিত দেয়। দেখা যাচ্ছে সরকারের যে কোনো শুভ উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও ঘোষণা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই দুর্নীতিগ্রস্ত পরিস্থিতিই প্রধান বাধা। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড জানাচ্ছে, প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের ৯৫৪টি সোলার প্যানেল বর্তমানে বিদ্যালয়ের মেঝেতে পড়ে আছে অযতেœ। এভাবে সরকারি অর্থ নষ্ট করার দায় বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা এড়াতে পারেন না।
সরকারের জ্বালানি মহাপরিকল্পনায় ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ ক্লিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০৩০ সাল নাগাদ সৌরশক্তি থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাড়ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার। কমছে কয়লা, তেলসহ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার। অন্যদিকে, নিজেদের কয়লা ও তেল না থাকলে প্রথাগত জ্বালানিতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় অনেক বেশি। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং উৎপাদন ব্যয়ের সার্বিক বাস্তবতা আমলে নিলে সবুজ জ্বালানির নীতি গ্রহণই এখন সর্বোত্তম পন্থা। নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে সবুজ জ্বালানির সবুজ বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন সত্যি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুর্নীতি-অনিয়ম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেই সঙ্গে দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি সরকারি সম্পত্তির অপচয় রোধে কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে।
