যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ চীনের চেয়ে তিনগুণ

আপডেট : ০৪ মে ২০২৩, ০১:১২ এএম

বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ঋণসহ নানা বিষয় নিয়ে চীনের সঙ্গে পশ্চিমাদের দূরত্ব রয়েছে। বাংলাদেশেও চীনের ঋণ, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বিতর্ক ও আলোচনা রয়েছে। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঋণদাতা দেশ হিসেবে জাপানের নাম উঠে আসলেও চীনও পিছিয়ে নেই। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ চীনা ঋণে। তবে ঋণ প্রদানে এই দুই দেশ এগিয়ে থাকলেও সরাসরি বিনিয়োগে পিছিয়ে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব দেশকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশে এখনো শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। 

বাংলাদেশে ৪১০ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের, যা মোট বিনিয়োগের ১৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আর বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্র চীনের বিনিয়োগ ১৩৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ চীনের তিনগুণ। অবশ্য বাংলাদেশে বিদেশিদের যে বিনিয়োগ তা সমকক্ষ দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশের প্রতিযোগী রাষ্ট্র ভিয়েতনামে ২০২২ সালে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল রেকর্ড ২৭ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। গত ৩০ বছরে দেশটিতে গড়ে ৭ বিলিয়নের বেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এসেছে। অপরদিকে ২০২২ সালে বাংলাদেশে বিনিয়োগ এসেছে ৩ দশমিক ৩৪ বিলিয়নের সামান্য বেশি।

অবশ্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে ২০২২ সালে বিদেশি বিনিয়োগ বিশ্বজুড়েই কমেছে। এ সময় বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ কমে গেছে। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ গেছে। তবে ২০২২ সালে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ কম হলেও তা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগ ২ হাজার ১১৬ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় (১০৬ টাকা দরে) ২ লাখ ২৪ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। বিদেশি বিনিয়োগের ১৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ বা ৪১০ কোটি ডলার এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ৪৩ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্র চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ ১৩৪ কোটি ডলার বা ১৪ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ২৭৫ কোটি বা ২৯ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা বেশি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, দেশে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে বিশে^র বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে আসা বিনিয়োগের হার কমেছে ৩৬ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। ২০২২ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে নিট ৭০ কোটি ৩৮ লাখ ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে বাংলাদেশে। কিন্তু আগের প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এ বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল নিট ১১০ কোটি ডলার। তবে বাৎসরিক হিসাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সামষ্টিক বিনিয়োগ। কারণ ২০২২ সালে নিট ৩৪৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলার বিনিয়োগ এসেছে। ২০২১ সালে এর পরিমাণ ছিল ২৮৯ কোটি ৫৫ লাখ ডলার।

দেশের গ্যাস ও জ¦ালানি তেলে বিদেশি বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি। এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৮৭ কোটি ডলার। যার মধ্যে ২৯১ কোটি ডলারই বিনিয়োগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। খাতটিতে ৭২ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। যদিও এই খাততে কোনো ধরনের বিনিয়োগ করেনি চীন।

দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা টেক্সটাইল খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ৩৮৪ কোটি ডলার। এই খাতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ দক্ষিণ কোরিয়ার। দেশটির বিনিয়োগের পরিমাণ ৯৯ কোটি ডলার। টেক্সটাইল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের পরিমাণ ১২ কোটি ডলার। আর চীন এই খাতে বিনিয়োগ করেছে ৩১ কোটি ডলার।

বিনিয়োগে তৃতীয় অবস্থানে থাকা খাত ব্যাংকিং। এই খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ২৮১ কোটি ডলার। খাতটিতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগকারী দেশ যুক্তরাজ্য। দেশটির বিনিয়োগের পরিমাণ ১৪১ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্র এই খাতে ২০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করলেও কোনো ধরনের বিনিয়োগ করেনি চীন।

দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ২৪৬ কোটি ডলার। খাতটিতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগকারী দেশ চীন। দেশটির বিনিয়োগের পরিমাণ ৬৬ কোটি ডলার। এর পরের অবস্থানে থাকা সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৯ কোটি ডলার। আর বিদ্যুতে যুক্তরাষ্ট্র বিনিয়োগ করেছে ১৭ কোটি ডলার।

টেলিযোগাযোগ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১৪৩ কোটি ডলার। এই খাতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগকারী মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ ৬৭ কোটি ডলার। এই খাতে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ ২৮ কোটি ডলার। আর যুক্তরাষ্ট্র ৫১ লাখ ডলার বিনিয়োগ করলেও চীন টেলিযোগাযোগ খাতে কোনো ধরনের বিনিয়োগ করেনি।

এছাড়া খাদ্যে বিদেশি বিনিয়োগ ৮৯ কোটি, ট্রেডিংয়ে ৬১ কোটি, কেমিক্যাল এবং ফার্মাসিউটিক্যালসে ৪৪ কোটি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৪১ কোটি, চামড়া ও চামড়া জাতীয় পণ্যে ৩৭ কোটি, নির্মাণ খাতে ৩৩ কোটি, কৃষি ও মৎস্যে ৩১ কোটি, বীমা খাতে ২৮ কোটি, সিমেন্টে ২৭ কোটি, পরিবহন ও পরিবহন যন্ত্রপাতিতে ২৪ কোটি এবং অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করেছে ২৫৭ কোটি ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্র বীমা খাতে ২৭ কোটি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২৪ কোটি, ট্রেডিংয়ে ৮ কোটি, কেমিক্যাল এবং ফার্মাসিউটিক্যালসে ৯৬ লাখ, কৃষি ও মৎস্যে ৩০ লাখ, খাদ্যে ২২ লাখ, নির্মাণ খাতে ১৯ লাখ এবং অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করেছে ৮ কোটি ডলার।

এছাড়া চীন ট্রেডিংয়ে ১২ কোটি, নির্মাণ খাতে ৭ কোটি, চামড়া ও চামড়া জাতীয় পণ্যে ১ কোটি, কেমিক্যাল এবং ফার্মাসিউটিক্যালসে ৮৫ লাখ, পরিবহন ও পরিবহন যন্ত্রপাতিতে ১৭ লাখ, খাদ্যে ১২ লাখ, কৃষি ও মৎস্যে ১১ লাখ এবং অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করেছে ১৫ কোটি ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী দেশগুলোর মধ্য শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ৪১০ কোটি ডলার। এই তালিকায় ৫ অবস্থানে থাকা চীনের বিনিয়োগ ১৩৪ কোটি ডলার। আর দশম অবস্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিনিয়োগ মাত্র ৬৯ কোটি ডলার। এছাড়া যুক্তরাজ্য ২৭১ কোটি, সিঙ্গাপুর ১৮৪ কোটি, দক্ষিণ কোরিয়া ১৪৬ কোটি, হংকং ১২৭ কোটি, নেদারল্যান্ডস ১২৫ কোটি, মালয়েশিয়া ৯১ কোটি এবং অস্ট্রেলিয়া ৭৩ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের প্রথম প্রান্তিক বা তিন মাসে ৮৮ দশমিক ৮৪ কোটি ডলার, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৭৮ দশমিক ৭৪ কোটি ডলার, তৃতীয় প্রান্তিকে ১১০ কোটি ডলার ও চতুর্থ প্রান্তিকে ৭০ দশমিক ৩৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়েছে দেশে। সুতরাং ২০২২ সালে মোট ৩৪৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। তবে ২০২১ সালের শেষ প্রান্তিক বা অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ১০৯ দশমিক ২১ কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত