ক্রেমলিনে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রকেও দুষল রাশিয়া

আপডেট : ০৫ মে ২০২৩, ০২:২৩ এএম

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর প্রায় ১৫ মাস পর প্রথমবারের মতো আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বাসভবন ক্রেমলিন। হতাহতের কোনো ঘটনা না ঘটলেও এ হামলা যুদ্ধকালের অন্যতম বড় ঘটনা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রাশিয়া এ হামলাকে প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে হত্যাচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রথমে ইউক্রেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে। তবে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইউক্রেন বলেছে, সমরাস্ত্র সংকটের মধ্যে এমন হামলার বিলাসিতা তাদের মানায় না। আর যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কিছু না বলেও, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।

মস্কোর দুর্গসদৃশ ক্রেমলিনের গ্র্যান্ড ক্রেমলিন প্যালেসে থাকেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। সেখানেই বুধবার ভোররাতের দিকে দুটি ড্রোন হামলা হয় বলে পুতিনের দপ্তরের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশ করে রাশিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থাগুলো। ক্রেমলিন একে ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসী তৎপরতা’ উল্লেখ করে ইউক্রেন ওই হামলা চালিয়েছে বলে ততক্ষণাৎ অভিযোগ করেছিল। বলেছিল, প্রেসিডেন্ট পুতিনকে হত্যা করাই ছিল ওই হামলার উদ্দেশ্য। ইউক্রেন ওই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, সবই রাশিয়ার নাটক।

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পরদিন এবার ক্রেমলিন প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আঙুল তুলেছে। পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, ‘কিয়েভ এবং ওয়াশিংটন উভয়েরই এ ঘটনার দায় অস্বীকার করার প্রচেষ্টা নিশ্চিতভাবেই ভীষণ হাস্যকর। আমরা ভালো করেই জানি এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কোথা থেকে আসে। এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলার সিদ্ধান্ত কিয়েভ নয় বরং ওয়াশিংটন থেকে নেওয়া হয়।’ পেসকভ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রই যে এ হামলার পেছনে, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।’

ক্রেমলিনে ড্রোন হামলার বেশ কয়েকটি ভিডিও সামনে এসেছে। সেগুলোর একটিতে দেখা যায়, গ্র্যান্ড ক্রেমলিন প্যালেসের দিকে একটি ড্রোন উড়ে যাচ্ছে এবং পরক্ষণেই সেটির বিস্ফোরণে আগুন জ¦লতে দেখা যায়। আরেকটি ভিডিওতে ক্রেমলিন দুর্গের ওপর থেকে আগুন ও ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। তবে সেটি আসলে ড্রোন ছিল কি না কিংবা ড্রোন হামলার কথা বলা হলেও আসলে ঠিক কী ঘটেছে সেটি স্পষ্ট নয়।

এ ড্রোন হামলাকে ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা’ আখ্যায়িত করে এজন্য ইউক্রেনকে চরম পরিণতির জন্য অপেক্ষা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রুশ কর্মকর্তারা। রাশিয়ার দুমার (পার্লামেন্ট) পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রধান লিওনিদ স্লতস্কি বলেছেন, বিজয় দিবসের আগে রুশ প্রেসিডেন্টকে হত্যা করতে চালানো এ পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা স্বভাবতই রাশিয়া মানুষকে শঙ্কিত করেছে। সুতরাং এর জবাব হতে হবে কঠোর, চরম কঠোর। ক্রেমলিন থেকেও বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট পুতিনকে হত্যা করাই ছিল এ ড্রোন হামলার উদ্দেশ্য। তাই মস্কো এখন যেকোনো পদক্ষেপই নিতে পারে। অবশ্য বিবিসি তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, ক্রেমলিনের দাবি যদি সত্যি হয় আর পুতিনকে হত্যাই যদি এর আসল উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তবে তা ক্রেমলিনের জন্য সত্যিই চরম বিব্রতকর।’

ওই হামলার বিষয়ে পেসকভ বলেন, ‘ওয়াশিংটন প্রায়ই ইউক্রেন কোথায় এবং কীভাবে হামলার করবে তা ঠিক করে দেয়। প্রায়ই সমুদ্রের ওপার থেকে হামলার নির্দেশনা আসে। আমরা এটা খুব ভালো করেই জানি এবং এ বিষয়ে সচেতনও থাকি... ওয়াশিংটনে তাদের অবশ্যই এটি খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা উচিত যে আমরা এটা জানি।’

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য ইউক্রেনকে অস্ত্র দিচ্ছে এবং ১৪ মাসেরও বেশি সময়ের যুদ্ধে মস্কো অবৈধভাবে ইউক্রেনের যেসব অঞ্চল দখল করেছে তা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করছে।

এর আগে ফিনল্যান্ড সফরে থাকা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, তারা মস্কোয় কোনো হামলাই চালায়নি। পুতিনের বিচারের ভার দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানান তিনি। হামলার প্রসঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, তাদের সমরাস্ত্র এমনিতেই কম। তাই এমন হামলা চালিয়ে সমরাস্ত্র খরচের মতো বিলাসিতা তাদের খাটে না।

তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধ করছি আমাদের ভূখণ্ডে, আমাদের গ্রাম ও শহরগুলো রক্ষার জন্য। এটার (মস্কোয় হামলা চালানো) জন্য এত অস্ত্র আমাদের নেই। সেই কারণে আমরা এটা যত্রতত্র ব্যবহার করি না।

৯ মে রাশিয়ায় বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান নাৎসি বাহিনীর আত্মসমর্পণের এ দিনটি ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে রাশিয়া। সেই আয়োজনের প্রস্তুতি চলার মধ্যে বুধবার সকালের আলো ফোটার আগে মস্কোর ক্রেমলিনে রুশ প্রেসিডেন্টের বাসভবন লক্ষ্য করে কথিত ড্রোন হামলার এ ঘটনা ঘটল। বিশ্লেষকরা বলছেন, দায় যাদেরই হোক, রাশিয়ার পাল্টা কঠোর পদক্ষেপের অভিঘাত সইতে হবে ইউক্রেনকেই।

রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভও দিয়েছেন তেমন হুঁশিয়ারি। তিনি বলেছেন, জেলেনস্কিকে চিরতরে মুছে ফেলা ছাড়া রাশিয়ার আর কোনো উপায় নেই। নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে এক পোস্টে মেদভেদেভ লেখেন, যে সন্ত্রাসী হামলা চলেছে, তাতে জেলেনস্কি ও তার দোসরদের চিরতরে শেষ করে ফেলা ছাড়া রাশিয়ার আর কোনো উপায় নেই। মেদভেদেভ লেখেন, জেলেনস্কির নিঃশর্তে আত্মসমর্পণের নথি সই করার প্রয়োজন নেই।

নাৎসি জার্মান নেতা হিটলারের সঙ্গে জেলেনস্কির তুলনা করে তিনি বলেন, হিটলারও এমন কোনো নথি সই করেননি। প্রেসিডেন্ট পদে বসানোর জন্য সবসময়ই কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত