এক-এগারোর সময় এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে রাজনৈতিক দলে ৩৩ শতাংশ নারী পদ রাখার বিধান করেছিল। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এ কোটা পূরণের চেষ্টা করলেও একেবারে বিপরীত চিত্র ইসলামপন্থি দলগুলোর ক্ষেত্রে।
বতর্মানে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত ৩৯টি দলের মধ্যে ধর্মভিত্তিক দলের সংখ্যা ১০টি। এসব দলের কোনো কোনো দল কমিটিতে নারীদের রাখার একেবারেই পক্ষে নয়। দলগুলোর কমিটিতে নারী সদস্য ১০ শতাংশের নিচে। তাদের বেশিরভাগই আবার দলের নেতাদের সহধর্মিণী। ইসি ও দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
ইসির নিবন্ধন তালিকায় ৩৫ নম্বরে রয়েছে বাংলাদেশ ইসলামি ফ্রন্ট। তাদের নির্বাচনী প্রতীক মোমবাতি। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটিতে কোনো নারী সদস্য নেই। শর্ত পূরণ না করে বরং ইসির সংলাপে অংশ নিয়ে এবং আলাদাভাবে চিঠি দিয়ে তারা জানিয়েছে, এ আইন বাতিল করতে হবে।
দলটির চেয়ারম্যান এমএ মতিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরুষের সঙ্গে নারী রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা রাখার পক্ষে নন তারা। এটা অনৈতিক ও অনধিকার চর্চা। নারীদের স্বাধীনভাবে রাজনীতির করার অধিকার আছে কিন্তু সেটা পুরুষের সঙ্গে নয়। নারীরা তাদের মতো রাজনীতি করবে এবং সেটা নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।’ এই দলের ১২১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে কোনো নারী নেই। তবে নারীদের একটি শাখা রয়েছে। তাতে ৫১ জন সদস্য রয়েছেন। লেখিকা আলহাজা কুসুম ভা-ারি ও চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ইশরাত জাহান হুমায়ূরা এ ফ্রন্টের নেতৃত্বে রয়েছেন বলে জানান এমএ মতিন।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছেন মাওলানা হাফেজ আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী। এই দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ৪০ সদস্যের হলেও তাতে কোনো নারী সদস্য নেই। তবে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের চিঠির পর তিনজন নারীকে কমিটিতে আনা হয়েছে বলে দলটি দাবি করে। এরা আবার দলের বিভিন্ন পদে থাকা নেতাদের সহধর্মিণী।
ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের নেতাদের দাবি, তাদের দলে ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব, মহিলাবিষয়ক সম্পাদকসহ প্রায় ১৫ শতাংশ নারী রয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটিতে। কিন্তু দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সহসাংগঠনিক পর্যায়ের এক নেতা জানান, সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ নারী থেকে থাকতে পারে। তারা দলীয় রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশ নেন না।
ইসির ৩০ নম্বর নিবন্ধিত দলটি ২০২২ সালে কাউন্সিল করে সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদীকে চেয়ারম্যান আর আবুল বাশার মুহাম্মদ জয়নুল আবেদীন জুবাইরকে মহাসচিব নির্বাচিত করে। ওই সময় ৩০১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়।
দেশ রূপান্তরকে সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী বলেন, ‘কত সংখ্যক নারী রয়েছে, সেটি দপ্তর বলতে পারবে। তবে ১৫ শতাংশ মতো হবে হয়তো।’
ইসিতে নিবন্ধিত দলগুলোর মধ্যে ‘খেলাফত মজলিস’ নামে দুটি দল রয়েছে। প্রথম অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন শায়খুল হাদিস মাওলানা যোবায়ের আহমদ চৌধুরী। মূলত দল পরিচালনা করেন মহাসচিব আহমেদ আবদুল কাদের।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নামে আরেক অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাঈল নূরপুরী। তার মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক।
২০০৫ সালে খেলাফত মজলিস দুই ভাগ হয়ে খেলাফত মজলিস নামে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে যায়। অন্য অংশ ‘বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস’ নাম ধারণ করে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে চুক্তি করে। সেই চুক্তি কার্যকর না হওয়ায় তারা জোট থেকে বেরিয়ে যায়।
আহমেদ আবদুল কাদের দেশ রূপান্তরকে জানান, ১০০ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির ৭৯ জন পুরুষ সদস্য। নারী সদস্য ২১ জন। নারীবিষয়ক পদে অধ্যাপক আহমেদ আবদুল কাদেরের স্ত্রী নাসরিন কাদের রয়েছেন।
দলটির একাধিক নেতার দাবি, দলটিতে মোট নারী নেত্রীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ জন হবে। প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তারা অংশ নেন না। সাংগঠনিক কার্যক্রম চালান তারা।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস অংশের কেন্দ্রীয় কমিটিতে মাত্র তিনজন নারীনেত্রী রয়েছেন। মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাঈল নূরপুরীর নেতৃত্বাধীন এ অংশের সঙ্গে যুক্ত এক নেতা জানান, ২০২১ সালের ৯ জানুয়ারি রাজধানীর পল্টনে ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে দলটির শূরার অধিবেশনে ২০২১-২২ সালের জন্য আল্লামা ইসমাঈল নূরপুরীকে আমির ও মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হককে মহাসচিব করে প্রায় ১০০ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। সংগঠনে ৪ থেকে ৫ শতাংশের মতো নারী থাকলেও থাকতে পারে। তারা কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন না।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে নিবন্ধিত দলটি ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ভেঙে যায়। ভেঙে যাওয়ার আগে দলটি বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ ছিল। বর্তমানে একই নামে দুটি দল রয়েছে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন মাওলানা শায়খ জিয়াউদ্দিন ও মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী। তারা বিএনপি জোট থেকে বেরিয়ে গেছে। মাওলানা গোলাম মহিউদ্দিন একরামের নেতৃত্বে একটি অংশ যুগপৎ আন্দোলনে রয়েছে। বাংলাদেশের পুরনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর একটি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ।
মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৭ থেকে ৯ জন নারী সদস্য রয়েছে। তাদের সর্বোচ্চ পদ মহিলাবিষয়ক সম্পাদক। বর্তমানে এ পদে রয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসানের স্ত্রী। সহ-আইন সম্পাদিকা হিসেবে আছেন সৈয়দা রুমানা। তিনিও দলটির কেন্দ্রীয় নেতা শাহিনূর পাশার স্ত্রী।’ এক প্রশ্নের জবাবে আফেন্দী জানান, ৭ শতাংশের মতো নারী রয়েছে দলে।
বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের বর্তমান চেয়ারম্যান আলহাজ সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভা-ারী। তিনি সংসদ সদস্যও। দলটির মহাসচিব আলহাজ সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী। ক্ষমতাসীনদের কাছাকাছি থাকা দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। চলতি বছরের ২৮ অক্টোবর নতুন কাউন্সিলের তারিখ ঘোষণা করেছে দলটি। ৮১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ২০ জন নারী সদস্য রয়েছেন বলে দলটির মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব মো. আলী ফারুকি দাবি করেন। এ নারীরা মূলত পীরের মুরিদ।
ইসলামী ঐক্যজোটেরও দুটি অংশ। একটি হচ্ছে বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট। এবার নিবন্ধিত নয়। আলহাজ মিসবাহুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন এ অংশ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকা মহাজোটের শরিক। ৭১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি তাদের। জেলার সভাপতি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য থাকেন। এ হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটি হয় ১৩৫ জনের। কেন্দ্রে নারী আছেন আটজন। ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে গুলশান আরা চৌধুরী দায়িত্ব পালন করছেন।
দলের মহাসচিব মুফতি মনিরুজ্জামান রাব্বানী বলেন, ‘আমরা ইসিতে নিবন্ধিত হতে আবেদন করেছি। যখন আবেদন করেছিলাম তখন আরপিও অনুযায়ী নারী কোটা পূরণ হয়েছিল। কিন্তু এখন নেই।’
দলটির নিবন্ধিত অংশের নেতৃত্বে আছেন মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনী, মুফতি ফয়জুল্লাহ মহাসচিব। দলটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আলতাফ হোসাইন জানান, কেন্দ্রীয় কমিটি ৬১ সদস্যের। এর মধ্যে ১৫ থেকে ১৬ জন নারী সদস্য। মহিলা সম্পাদিকা সর্বোচ্চ পদ। তারা কেউ সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেন না।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটি ৭৩ জনের। ৪৯ জন পুরুষ ও ২৪ জন নারী। নারীদের বেশিরভাগ দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের সহধর্মিণী।
দলটির যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান জানান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ নারী কোটা পূরণ করতে সদস্য হিসেবে নারীদের রাখা হয়েছে। তারা সিনিয়র নেতাদের সহধর্মিণী। মাঠে তাদের কোনো কার্যক্রম না থাকলেও অধিকাংশ নারী মাঝেমধ্যে দাওয়াতি কাজ করেন।
নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেওয়া নিয়ম ঠিক রাখতে নিজেদের সহধর্মিণীদের কমিটিতে রাখা হয়েছে বলে এক নেতা জানান। বিষয়টিকে শুভঙ্করের ফাঁকি বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে নারী নেতৃত্ব বেশি লক্ষণীয়। আওয়ামী লীগের ৮১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীনেত্রী রয়েছেন ১৯ জন। বিএনপির ৫০২ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী কমিটিতে নারী ৬৭ জন। এ হিসাবে বিএনপিতে নারী নেতৃত্ব রয়েছে মাত্র ১৩.৩৪ শতাংশ।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর সব পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব ৩৩ শতাংশ করার বাধ্যবাধকতার মেয়াদ শেষ ২০২০ সালে। নিবন্ধিত ৩৯ দলের কেউই এ শর্ত পূরণ করতে পারেনি। ইসিও কোনো দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
ইসি সূত্র জানায়, গত বছর ২৫ অক্টোবর কমিশনের এক সভায় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও)-এর এ সংক্রান্ত কয়েকটি ধারা সংশোধনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংশোধনের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। নতুন আরপিওর খসড়ায় নারী নেতৃত্ব ৩৩ শতাংশ করার সময় বাড়িয়ে ২০৩০ সাল করার প্রস্তাব করা হয়।
ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, ‘আরপিওতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।’
