আড়াইশ কোটি টাকার প্রকল্প ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা

আপডেট : ০৬ মে ২০২৩, ০৬:১৬ এএম

বঙ্গবন্ধু সেতুর সোয়া কিলোমিটার দক্ষিণে যমুনা নদীতে বড় বড় পাঁচটি ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন ও বিক্রির উদ্যোগ নেওয়ায় বাঁধ ভেঙে সরকারের আড়াইশ কোটি টাকার প্রকল্প ভেস্তে যাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় দুই সহস্রাধিক পরিবারের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যমুনার ভাঙনে ২০২১ সালে ওই স্থানের ছয়-সাতটি বাড়িঘর নদীর পেটে চলে যায়। ২০২২ সালের বর্ষায় গাইড বাঁধের মাঝখানে দুই-তিন জায়গায় দেবে যায়। এ অবস্থায় আবার ভাঙন আতঙ্কে এলাকাবাসী বালু উত্তোলন ও বাল্কহেড থেকে খালাস বন্ধে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

জানা যায়, বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার (নিউ ধলেশ্বরী-পুংলী-বংশাই-তুরাগ-বুড়িগঙ্গা রিভার সিস্টেম) প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) বঙ্গবন্ধু সেতুর ভাটিতে নিউ ধলেশ্বরী নদীর মুখে (অফটেক) খনন ও গাইড বাঁধ নির্মাণ করেছে। ২৩৪ কোটি ২৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকায় ১৫৩০ মিটার গাইড বাঁধ (অফটেক বাঁধাই) নির্মাণ করা হয়। টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার গোহালিয়াবাড়ী ইউনিয়নের বেলটিয়া ও হাটবাড়ী আলিপুর অংশে চারটি লটে ভাগ করে পৃথক চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওই গাইড বাঁধ নির্মাণ করে।

স্থানীয়রা জানায়, গাইড বাঁধ নির্মাণ হওয়ায় বেলটিয়া এলাকার নদীভাঙা মানুষ ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছে। দুই বছর আগে বাংলাদেশ সেতু কর্র্তৃপক্ষ (বাসেক) ও পাউবোর নদীতীর সীমানায় বেলটিয়ার অংশে ভাঙনের ফলে বিশালাকার পুকুর তৈরি হয়। ওই স্থানে প্রথমে জিও ব্যাগ ও সিমেন্টের তৈরি ব্লক ফেলে ভাঙন রোধ করা হয়। পরে ভাঙনের ফলে কর্র্তৃপক্ষ প্রণীত নকশা পরিবর্তন করে চন্দ্রাকারে গাইড বাঁধ নির্মাণ করতে বাধ্য হয়। বর্তমানে ওই চন্দ্রাকার বাঁধের স্থানে বড় বড় পাঁচটি ড্রেজার মেশিন স্থাপন করার নদী ভাঙনের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু সেতু-ঢাকা মহাসড়কে এলেঙ্গা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্বপাড় গোলচত্বর পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটার এলাকা চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেড। ওই প্রকল্পের সড়ক প্রশস্তকরণে বালু-মাটি সরবরাহ করতে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল সাব-ঠিকাদারি নিয়েছে। তাদের মধ্যে গোহালিয়াবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হাই আকন্দ নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্য অংশীদারদের মধ্যে রয়েছেনÑ গোহালিয়াবাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জহুরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম (মেম্বার), বালু ব্যবসায়ী মাসুদ রানা, ৮ নম্বর (বেলটিয়া) ইউপি সদস্য মো. শাজাহান আলী, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হযরত আলী তালুকদার, সাবেক ইউপি সদস্য সুলতান ফকির প্রমুখ। তারা যমুনার বামতীরের বেলটিয়া অংশে বড় বড় পাঁচটি ড্রেজার ও তিনটি বাল্কহেড (বলগেট) এনে পাইপের চারটি সারি প্রস্তুত করেছেন। আরও একটি প্রস্তুতের পর্যায়ে রয়েছে। তিনটি বাল্কহেডের একটিতে যমুনায় ড্রেজার বসানোর জন্য স্টিলের পাইপ আনা হয়েছে। অন্যটি থেকে বালু খালাস করা হচ্ছে এবং আরেকটি তীরে ভেড়ানো রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অংশীদার জানান, গোহালিয়াবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সিরাজগঞ্জের জনৈক তাপস ঠিকাদারের নেওয়া বালুঘাটে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে কিয়দংশের অংশীদার হয়েছে। সেখান থেকে বাল্কহেডের মাধ্যমে বালু এনে বেলটিয়ায় খালাস করা হচ্ছে। ওই বালু আবদুল মোনেম লিমিটেডের কাছে বিক্রি করার কথা রয়েছে। তারা আরও জানান, সিরাজগঞ্জ থেকে বালু কিনে এনে তেমন লাভ হচ্ছে না। যমুনায় জেগে ওঠা চর থেকে বালু আনতে পারলে কিছুটা লাভের মুখ দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশ সেতু কর্র্তৃপক্ষের (বাসেক) বঙ্গবন্ধু সেতুর সাইট অফিস ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে কথা বলা হচ্ছে মৌখিক অনুমতি পেলেও যমুনায় জেগে ওঠা চর কেটে বালু আনা হবে।

কালিহাতী উপজেলার আলিপুর গ্রামের প্রবাসী হাতেম আলী জানান, যমুনায় তাদের বাড়ি দুই দফায় ভেঙে গেছে। নিউ ধলেশ্বরী নদীর মুখ বাঁধাই করায় তিনি ও তার দুই ভাই মফিজ উদ্দিন ও হাফেজ উদ্দিন যমুনার বেলটিয়া অংশে পৈতৃক জমিতে নতুন বাড়ি করেছেন। তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলে এবং ভাইদের নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন। তিনি জানান, নদীর মুখে বাঁধ নির্মাণ করায় এ অঞ্চলের মানুষ বসবাসের নির্ভরতা খুঁজে পেয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে সরকার বাঁধ নির্মাণ করে ‘বাপের’ উপকার করেছে।

বাসেকের বঙ্গবন্ধু সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুল কবীর পাভেল বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সেতুর উজানে ৬ ও ভাটিতে ৬ এ ১২ কিলোমিটার এলাকা কেপিআই হিসেবে চিহ্নিত। এই এলাকার মধ্যে ড্রেজার বসানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেউ ড্রেজার বসানো বা বালু উত্তোলনের চেষ্টা করলে কঠোর হস্তে দমন করা হবে। লোড-আনলোড করার বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে কেউ আমার সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। মহাসড়কে বালু দেওয়ার জন্য লোড-আনলোড করে থাকলে বিষয়টি পাউবো বা স্থানীয় প্রশাসন দেখার কথা। তাছাড়া গাইড বাঁধের ক্ষতি হবে এমন কাজ কাউকেই করতে দেওয়া হবে না।’

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জসীম উদ্দীন হায়দার বলেন, ‘কোনো কারণেই গাইড বাঁধের ক্ষতি এবং মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি করা যাবে না। যমুনায় ড্রেজার বসানো ও লোড-আনলোডের বিষয়টি আমরা খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’ তবে বাঁধের বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত