পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ঢালাওভাবে প্রথম থেকে এক সুরে ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় সব মিডিয়া এ যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমিকে চেপে যাচ্ছে, পূর্বদিকে ন্যাটোর সম্প্রসারণ চেষ্টার কারণেই যে এ যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সেটি তারা মুখে আনছে না। বাস্তবতা হলো, যে ‘গণতান্ত্রিক’ শক্তিগুলো ‘অগণতান্ত্রিক’ রাশিয়ার বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে, সেই গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নিজেদের জনগণের অনেক বড় অংশ তাদের ওপর ততটা ভরসা পাচ্ছে না, যতটা পুতিনের সরকারের ওপর রাশিয়ার জনগণ ভরসা পাচ্ছে।
পশ্চিমের অগ্রসর গণতন্ত্রের বেশির ভাগ নাগরিকই তাদের জীবনমান আরও নিচের দিকে পড়ে যাবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বেশির ভাগ গণতন্ত্রে প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল দলগুলো পালা করে ক্ষমতায় আসে। এসব দেশের সরকারগুলো ঋণের বোঝায় নুয়ে পড়েছে। অনেক দেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১০০ শতাংশের বেশি। জাপানের সরকারি ঋণের পরিমাণ তার জিডিপির ৩০০ শতাংশের বেশি। এ ঋণের বোঝা পরবর্তী প্রজন্মের ঘাড়ে চাপিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অথচ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এ ঋণের অর্থ শিক্ষা, অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় করা হচ্ছে না। এ অবস্থা এসব দেশের ভোটারদের মনে প্রশ্ন জাগাচ্ছে, কেন তারা বছরের পর বছর ধরে এমন রাজনৈতিক নেতাদের ভোট দিয়ে গদিতে বসাচ্ছে, যাদের বানানো নীতির কারণে অসাম্য, দারিদ্র্য ও ঋণ উত্তরোত্তর বেড়েই যাচ্ছে। জনগণের এ ক্রমবর্ধমান হতাশা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধারাবাহিক দুর্বলতা হিসেবে উন্মোচিত হচ্ছে।
করোনাকবলিত হয়ে এবং রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নেই। তদুপরি, গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো নেই মর্মে প্রায়ই খবর রটায় পশ্চিমের নানা গবেষণা সংস্থা। বর্তমান বিশ্বের ১৬৫টি দেশে সমীক্ষা করে এমনই ফল প্রকাশ করা হয়। অর্থনীতিবিষয়ক একটি প্রসিদ্ধ ব্রিটিশ পত্রিকা নিয়মিত গণতন্ত্রের সূচক প্রকাশ করে থাকে। নির্বাচনী পদ্ধতি ও বহুত্ববাদ, সরকারের কর্মরীতি, রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক স্বাধীনতা-পাঁচটি বিষয়ের নিরিখে প্রস্তুত হয় ওই সূচক। সর্বশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে মাত্র ২২টি দেশে পূর্ণ গণতন্ত্র বহাল রয়েছে। সেগুলোতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা সারা বিশ্বের নিরিখে মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি। এমনকি, বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বঘোষিত মোড়ল খোদ যুক্তরাষ্ট্র ২০১৬ সালেই পূর্ণতার মর্যাদা হারিয়ে ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র শ্রেণিতে নেমে এসেছিল। পরের বছরগুলোতেও দেশটি আগের মর্যাদা ফিরে পায়নি। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ ভারত বরাবরই ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র নিয়েই চলছে। প্রায়ই দেশটির নম্বর কমে। কখনো কখনো তার স্থান হয়েছে ৫০টি দেশের পরে। বিশ্বের দেশে দেশে গণতন্ত্রের সূচকে যে ক্ষয় দেখা যাচ্ছে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। বরং বলা ভালো, কর্র্তৃত্ববাদের উল্লম্ফনের পটভূমিতে গণতন্ত্রের এহেন মন্দ দশা সারা বিশ্বেই ঘনীভূত হচ্ছে। গবেষণায় দৃশ্যমান হয়েছে যে চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোও গণতন্ত্রের নিরিখে বরাবরই পশ্চাতে রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকার অধিকাংশ দেশেও গণতন্ত্রের দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়েছে। নিঃসন্দেহে এর অন্যতম কারণ, সবার মধ্যে সম্পদের সমবণ্টনে পুঁজিবাদের ব্যর্থতা, বিশেষজ্ঞদের অভিমত এমনই।
তত্ত্বগতভাবে গণতন্ত্র, নির্বাচন, সুশাসন ও উন্নয়ন এসব প্রত্যয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও দৃঢ়তার জন্য এসবের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গতিশীল গণতান্ত্রিক ধারার আলোকে বিকশিত হয়। আবার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আবশ্যিকভাবে একটি অপরিহার্য বিষয়। আবার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাই নিশ্চিত করতে পারে প্রকৃত সুশাসন, যা স্বচ্ছ, জবাবদিহি, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে জনস্বার্থ সংরক্ষণ করে এবং দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত জনমুখী ও টেকসই উন্নয়নের গ্যারান্টি দেয়।
অন্যদিকে, অগণতান্ত্রিক দেশগুলোর চেয়ে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর আস্থাশীলতার স্কোর অনেক নিচুতে। নিজ দেশের নাগরিকদের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সরকার যত স্কোর অর্জন করেছে, চীনের স্কোর তাদের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি। অতএব গণতন্ত্র, নির্বাচন, সুশাসন ও উন্নয়ন নিয়ে বিশ্বব্যাপীই রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজ, উভয়েই সচেতন। বিশেষত এসব বিষয়ে নাগরিক ভাবনার স্বরূপ সম্পর্কে অবহিত হওয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বার্থেই জরুরি। কেননা, নাগরিক সমাজ তথা জনগণই একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক ধারা, সফল নির্বাচন, লাগসই উন্নয়ন ও কার্যকর অর্থে প্রকৃত সুশাসন নিশ্চিত করার পেছনে মূল চালিকাশক্তি। এবং এই শক্তির বলেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারক ও প্রশাসকসহ সবাই সাংবিধানিকভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ।
এমনই পটভূমিতে বলার অপেক্ষা রাখে না যে নানা কারণে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন কেমন হবে, তার ওপর বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ধারা, সুশাসনের বিকাশ ও উন্নয়নের বিস্তারসহ আরও অনেক কিছুরই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করতে আগামী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যে নির্বাচনকালে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে অপরিহার্য। এ জন্য, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের রক্ষার্থে আগামী নির্বাচনের নানা অসংগতি দূরীকরণের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টিও প্রাধান্য পাচ্ছে। পাশাপাশি আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলক তথা গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা নিয়ে জনমনে যেকোনো ধরনের সন্দেহ, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার অবসান ঘটানোর তাগিদও দেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের তরফে। দেশের জনগণের ভোটের অধিকার গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার এবং দেশের অর্থনীতি ও সুশাসনের অস্তিত্ব যেন কোনো ধরনের সংকট আপতিত না হয়, জনগণকে এ ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন থাকার বিষয়টিও ক্রমে সামনে আসছে।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট
