ভুল পথে হাঁটতে চান না নাবিল

আপডেট : ০৮ মে ২০২৩, ১২:৫৭ এএম

বছর কুড়ি আগে এভাবেই হেঁটে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। ২০০৩ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার বিশ^কাপ সেমিফাইনাল ম্যাচটা যখন হয়, প্রান্তিক নওরোজ নাবিল তখনো পৃথিবীর আলো দেখেননি। সেই বছর নভেম্বরে জন্ম নাবিলের। কাল মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নাবিল মনে করালেন সেই গিলক্রিস্টকেই।

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের সুপার লিগ পর্বের ম্যাচে মুখোমুখি শেখ জামাল ধানম-ি ও প্রাইম ব্যাংক। উত্তাপে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নয়, তাই বলে একেবারে অর্থহীন ম্যাচও নয়। পয়েন্ট টেবিলের দ্বিতীয় আর তৃতীয় স্থানে থাকা দলের দ্বৈরথ। আগে ব্যাট করে শেখ জামাল করেছে ৬ উইকেটে ২৭৬ রান। রান তাড়ায় শুরুতেই ২ উইকেট হারানোর পর শাহাদাত হোসেন দীপুকে নিয়ে নাবিলের ১৪৬ রানের জুটি। সাইফ হাসানের করা ম্যাচের ৩০তম ওভারে আউট দীপু। ৭৫ রান নিয়ে চতুর্থ বলটা খেলছিলেন। অফস্পিনে একটু আগ বাড়িয়ে খেলতে গিয়েছিলেন, তবে ব্যাটে বলে ঠিকঠাক হয়নি। উইকেটরক্ষক নুরুল হাসান সোহান বলটা ধরে আউটের আবেদন করলেন। সেদিকে না তাকিয়েই প্যাভিলিয়নের দিকে ফেরত যাওয়া শুরু নাবিলের। লেগ আম্পায়ারকে অতিক্রম করে ফেলেছেন নাবিল, সোহানসহ আরও কয়েকজন ওদিকে অন-ফিল্ড আম্পায়ারের সামনে গিয়ে আবেদন করছেন। তখনো তর্জনী তোলেননি আম্পায়ার আলী আরমান রাজন। যখন বুঝলেন ব্যাটসম্যান নিজেই আউট মেনে নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন, তখন আউটের সংকেত জানালেন।

এক বল আগেই ভেঙেছে লম্বা জুটি, নিজে ৭৫ রানে ব্যাট করছিলেন এবং সামনে আরও ২০ ওভার খেলা বাকি ছিল। সামলে খেললে লিস্ট এ ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিও হয়ে যায়। কিন্তু নাবিল চাননি ভুল পথে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে, কারণ তাতে যে মনের ভেতর খচখচ করবে আউট জেনেও ব্যাট করে যাওয়ার অপরাধবোধ, ‘আমার জন্য সব সময়ই ব্যাপারটা এ রকমই, আমি আসলে (বল) লাগার পরে আর তাকাইনি আম্পায়ার কী করেছেন। আমি যখন হাঁটা শুরু করি, তখন টের পাই যে আম্পায়ার এখনো আউট দেননি, তবে আমি জানতাম যে আমি কখনোই পেছন দিকে হেঁটে যাব না।’ গিলক্রিস্টের সেই বিখ্যাত ওয়াকের কথা মাথায় ছিল কি নাÑ জানতে চাইলে নাবিলের উত্তর, ‘কে করছে আমি জানি না, তবে এটা যার যার নৈতিকতার ব্যাপার। আমার কাছে মনে হয় যে এভাবে সততার সঙ্গে খেলতে পারলে কঠোর পরিশ্রমটা অনেক সার্থক মনে হয়।’ সেঞ্চুরির সম্ভাবনা থাকলেও সে পথে না যাওয়ার কারণও ম্যাচের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে জানালেন নাবিল, ‘আমি যদি সেঞ্চুরিটা করতামও, আমার ভেতর একটা অপরাধবোধ কাজ করত যে আমি ইনিংসটা সঠিক প্রক্রিয়ায় করতে পারিনি।’

আধুনিক ক্রিকেটে ডিআরএসের কল্যাণে প্রযুক্তির মারপ্যাঁচে অনেক সময় অনেক সিদ্ধান্তই বদলে যায়। দলের স্বার্থ সামনে রেখে চারিত্রিক দৃঢ়তার সঙ্গে আপস করা যেত কি না জানতে চাইলে নাবিলের উত্তর, ‘আমার কাছে মনে হয়, সার্বিকভাবে দেখলে কোনো কিছু ভুল, মানে সেটা সব ক্ষেত্রেই ভুল। এটা কখনোই মূল্যায়ন করা হবে না। ভুল আর শুদ্ধের এই ব্যবধানটা রাখতে হবে।’ আউট হয়ে আসার পর কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনও নাবিলকে কিছু বলেননি বলেই জানান এই তরুণ ক্রিকেটার।

২০২০ সালে আকবর আলীদের সঙ্গী হয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ^কাপ জিতেছিলেন নাবিল, যদিও সেবার ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি। চলতি মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ৮ ম্যাচে ৩২৮ রান নাবিলের, আছে তিনটি হাফ সেঞ্চুরি। তার একসময়ের সতীর্থদের অনেকেই জাতীয় দল বা আশপাশে চলে এলেও নাবিল এখনো খানিকটা পিছিয়ে। লক্ষ্যটা এক হলেও সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে দ্রুত এগিয়ে যেতে চান না নাবিল; বরং লক্ষ্য পূরণের পর থাকতে চান দীর্ঘ সময়। তাই নিজের সঙ্গেও আপস করতে চান না, কারণ লড়াইটা যে শেষ পর্যন্ত নিজের সঙ্গেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত