অর্থ ব্যয়ে ব্যর্থ শিল্পের প্রকল্প

আপডেট : ০৯ মে ২০২৩, ১২:০২ এএম

সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয় একটি। চলতি অর্থবছর এ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরের ২৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি প্রকল্পের কাজের তেমন অগ্রগতি নেই। চলতি অর্থবছরের আট মাসে এই ১৫ প্রকল্পে অর্থ ব্যয় হয়েছে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ। মন্ত্রণালয়টির হাতে অন্য যেসব প্রকল্প রয়েছে সেগুলোও নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ২৭ প্রকল্পে চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট (এডিপি) থেকে বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। মন্ত্রণালয়ের নিজেদেরই একটি প্রকল্প আছে, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খরচ হয়নি এক টাকাও। বিএসটিআইয়ের ৬০ কোটির একটি প্রকল্পে অর্থবছরের আট মাস পর্যন্ত খরচ হয়েছে মাত্র প্রায় ২ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, বিসিকের এডিপি বরাদ্দের ৩২৫ কোটির ১০ প্রকল্পে খরচ হয়েছে মাত্র ১৬ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, কাজের শুরুতে সম্ভাব্যতা যাচাই না করা এবং কিছু ক্ষেত্রে অদক্ষ জনবলের কারণে অধিকাংশ রুগ্ণ প্রকল্পই শিল্প মন্ত্রণালয়ে।

এ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম)। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ‘ঢাকাস্থ বিআইএমকে শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পটি চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা। ১৪৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্পটির চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খরচ হয়েছে মাত্র ৩৮ লাখ টাকার কিছু বেশি। চলতি বছর প্রকল্পটির বাজেট বরাদ্দ ২৫ কোটি টাকা। অথচ আট মাসে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোর নিয়ে বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা সভা হয়েছে। এতে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেন খোদ শিল্প প্রতিমন্ত্রী। ওই সভায় তিনি মন্তব্য করেন, বিসিকের চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি খুবই মন্থর। ‘বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, মুন্সীগঞ্জ’ শীর্ষক প্রকল্পটি একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প। অথচ এ গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো শেষ হয়নি।

ছাতক সিমেন্টের প্রকল্পটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার বলেন, ঠিকাদার চুক্তি অনুযায়ী মালামাল ও মেশিনারিজ সরবরাহ করেনি। আবার যে মালামাল সরবরাহ করেছে তা খুবই নিম্নমানের। ঠিকাদারের বিল পরিশোধের আগে এ বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিসিকের আরেক প্রকল্প ‘বিসিক শিল্প পার্ক, সিরাজগঞ্জ’। প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। এক যুগ পার হয়ে গেলেও এ বছর প্রকল্পটি সমাপ্তযোগ্য প্রকল্পের তালিকায় ছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, পূর্ত কাজের ড্রেন নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৩৩ শতাংশ ও রাস্তা নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৪০ শতাংশ। প্রকল্পটি বাস্তব অগ্রগতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয়তার নিরিখে অনেক কম হওয়ায় এটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হবে না। তাই এটিকে সমাপ্তযোগ্য তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। বিসিকের আওতায় ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়েছিল ‘পোভারটি রিডাকশন থ্রো ইনটিগ্রেটেড অ্যান্ড সাসটেইনেবল মার্কেটস (প্রিজম)। প্রকল্পের মেয়াদ আট বছর শেষ হলেও প্রকল্প পরিচালক ও বিসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. শফিকুল আলম জানিয়েছেন, প্রকল্পের কাজ বর্তমানে ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি শুরু থেকে এ প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলাম না। এটি প্রায় শেষ হওয়া একটি প্রকল্প।

বিসিকেরই আরেক প্রকল্প ‘বরিশাল বিসিক শিল্প নগরীর অনুন্নত এলাকা উন্নয়ন এবং উন্নত এলাকার অবকাঠামো মেরামত ও পুনর্নির্মাণ’। এ প্রকল্পটি মাত্র ৫২ কোটি টাকায় শুরু হলেও চারবার মেয়াদ বাড়িয়ে ৭১ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় সংশোধন করে অনুমোদন পেয়েছে গত ১৮ এপ্রিলের একনেক সভায়। ৩৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে বেসরকারি খাতের ১০০টি এসএমই শিল্প ইউনিট স্থাপন করা এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। আদতে এখনো পর্যন্ত ১৩টি পূর্ত কাজের মধ্যে কাজ হয়েছে মাত্র ৩টির। পুরো প্রকল্পের কাজ হয়েছে মাত্র ৪৫ শতাংশ। নানান অজুহাতে কাজ না করেও মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত। বাকি ৫৫ শতাংশ কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করা নিয়েও রয়েছে সংশয়।

মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৭টি প্রকল্পের মধ্যে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতির হার ৪০ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর মধ্যে বিসিকের ১০ প্রকল্পের অগ্রগতি ৫ দশমিক ১০ শতাংশ। বিএসটিআইর ১ প্রকল্পের অগ্রগতি ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ, বিএসএফআইসির ২ প্রকল্পের অগ্রগতি ১৫ শতাংশ, বিটাকের ২ প্রকল্পের অগ্রগতি ৪০ শতাংশের বেশি। বিএসইসির ২ প্রকল্পের অগ্রগতি ২৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ, এনপিওর ২ প্রকল্পের অগ্রগতি ৩৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ, বিআইএমের ১ প্রকল্পের অগ্রগতি ১ দশমিক ১৪ শতাংশ, শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিজেদের ১ প্রকল্পের অগ্রগতি শূন্য শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে আইএমইডির শিল্প উইংয়ের মহাপরিচালক মো. শুকুর আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্লাস্টিক শিল্পনগরী, মুদ্রণ শিল্প নগরীর জায়গা নিয়ে ঝামেলা ছিল। মুন্সীগঞ্জের এ প্রকল্পগুলোতে জমি অধিগ্রহণে দেখা গেল এর জায়গাটি আদর্শ গ্রামের জায়গা। পরে প্রকল্পের সাইট বদল করে এখন নতুন জায়গা নেওয়া হয়েছে। এ কারণে এ প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ ছিল।

তিনি বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি ভালো প্রকল্প আছে, তবে অধিকাংশই রুগ্ণ। অনেক ক্ষেত্রে যেসব প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয় তারা অদক্ষ, প্রকল্প গ্রহণের আগে সঠিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয় না, তাছাড়া জমি অধিগ্রহণের জটিলতাও এ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোর পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত