ভ্যাট জটিলতায় ভোজ্য তেল সরবরাহ বন্ধ

আপডেট : ০৯ মে ২০২৩, ০২:৩৯ এএম

উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কার ঘাড়ে পড়বেÑ এ জটিলতায় গত শনিবার থেকে ভোজ্য তেল (সয়াবিন ও পাম তেল) সরবরাহ বন্ধ রেখেছে শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, সরকার নির্ধারিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট পাইকারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা তেলের মূল্যের সঙ্গে পরিশোধ করলেই তারা তেল সরবরাহ করবে। এ নিয়ে গতকাল সোমবার পাইকারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সঙ্গে ভোজ্য তেল রিফাইনারি সরবরাহ বন্ধ অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু কোনো সমাধান না হওয়ায় গতকালও তেল সরবরাহ করেনি প্রতিষ্ঠানগুলো। এ পরিস্থিতিতে আবারও বাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত সপ্তাহে ভোজ্য তেলের দাম ১২ থেকে ১৮ টাকা বাড়ানো হয়।

জানা গেছে, দেশে ভোজ্য তেল (সয়াবিন ও পাম তেল) সরবরাহে আটটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত থাকলেও টিকে গ্রুপ (পুষ্টি ব্র্যান্ড), মেঘনা গ্রুপ (ফ্রেশ ব্র্যান্ড), সিটি গ্রুপ (তীর ব্র্যান্ড) ও এস আলম গ্রুপ (এস আলম ব্র্যান্ড) দেশের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ তেল সরবরাহ করে থাকে। গত শনিবার থেকে সিটি গ্রুপ তেল সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। আর গতকাল থেকে অন্য আরও কয়েকটি কোম্পানি পাইকারি বাজারে তেল সরবরাহ করেনি। এতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় তেল বিপণন কেন্দ্রের সামনে ট্রাকের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে পাইকারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সঙ্গে ভোজ্য তেল রিফাইনারি অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের গতকাল বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত করেই তেল ডেলিভারি দিতে সম্মত তেল সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ভোজ্য তেল রিফাইনারি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ^জিৎ সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট নির্ধারণ করেছে সরকার। যথারীতি তা ভোক্তার ঘাড়ে গিয়ে পৌঁছবে। আমরা তো আর আমাদের থেকে দেব না এই টাকা।’ তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা এনবিআরের (রাজস্ব বোর্ড) কাছে যাবে বলেছে। ওখান থেকে যদি অর্ডার প্রত্যাহার বা স্থগিত করা হয় তাহলে তো আর সমস্যা নয়।’

মেঘনা গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘সরকার ভ্যাট নির্ধারণ করেছে। তাই ভ্যাট তো দিতেই হবে।’ কিন্তু গত সপ্তাহে যে দাম বাড়ানো হলো তখন নিশ্চয়ই এ ভ্যাট সমন্বয় করেই দাম বাড়ানো হয়েছে। এমন প্রশ্নের জবাবে সংস্থাটির সহকারী সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার তসলিম শাহরিয়ার বলেন, ‘এ বিষয়ে ট্যারিফ কমিশনই ভালো বলতে পারবে। তবে ভ্যাট যেহেতু ভোক্তা পর্যায় থেকে সংগ্রহ করা হয়, এ ক্ষেত্রে তাই হওয়ার কথা।’

তবে ভ্যাটের বিষয়টি সুরাহা করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন পুষ্টি ব্র্যান্ডের তেল সরবরাহকারী টি কে গ্রুপের পরিচালক হায়দার শিবলী। তিনি বলেন, ‘আমাদের তেল যদি পাইকারি ব্যবসায়ীরা ডেলিভারি না নেয় তাহলে তো আমাদের ট্যাংক খালি হবে না আর খালি না হলে তেল আমদানি করতে পারব না। ব্যবসা তো আমরা তাদের মাধ্যমেই করে থাকি। আমরা ভ্যাটের বিষয়টি তাদের বুঝিয়ে বলেছি। তাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এখন আগামী বাজেট পর্যন্ত ভ্যাটের ১০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। দেখা যাক কী সিদ্ধান্ত আসে।’

জানা যায়, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ১৫ শতাংশ নির্ধারিত ভ্যাট থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে ৫ শতাংশে নির্ধারণ করে। গত ৩০ এপ্রিল সেই মেয়াদ শেষ হলে আগের মতোই ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। আর এতেই তেলের বাজারে বিপত্তি দেখা দেয়। তেলের সরবরাহ থাকলেও শুধু ভ্যাট জটিলতায় অনেক কোম্পানি তেল সরবরাহ বন্ধ করে রেখেছে।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী মাহমুদুল হক লিটন বলেন, ‘দুই মাসের আগের অর্ডার কাটা তেলে এখন কেন বাড়তি ভ্যাটের টাকা নেওয়া হবে? আমাদের আগেই রেটেই দিতে হবে। কিন্তু কোম্পানিগুলো আগের মাল দিচ্ছে না, নতুন অর্ডারে ১৫ ভ্যাটসহ মাল দিচ্ছে।’

এদিকে গত ৪ মে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচার্স অ্যাসোসিয়েশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ভোজ্য তেল আমদানিতে সরকার প্রদত্ত ভ্যাট অব্যাহতি গত ৩০ এপ্রিল তারিখে শেষ হওয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৭৬ ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৯৯ টাকা। এ ছাড়া পাঁচ লিটারের বোতল ৯৬০ টাকায় বিক্রি হবে। খোলা পাম তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৫ টাকা। এর আগে খোলা সয়াবিন তেলের দাম ছিল প্রতি লিটার ১৬৭ ও বোতলজাত প্রতি লিটার ১৮৭ টাকা। এ ছাড়া পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ছিল ৯০৬ টাকা। খোলা পাম তেলের দাম ছিল ১১৭ টাকা। সে হিসাবে খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৯, বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটারে ১২ এবং খোলা পাম তেলের দাম প্রতি লিটারে ১৮ টাকা বেড়েছে।

তেল সরবরাহকারীদের এ কার্যক্রমকে জুলুম আখ্যায়িত করে চিটাগাং চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম বলেন, ‘এটা তো হতে পারে না। উৎপাদন পর্যায়ে মিলমালিকের ভ্যাট ব্যবসায়ীরা কেন দেবে? সরকার তো ভোক্তা পর্যায়ে ভ্যাট নির্ধারণ করেনি। ভোক্তা পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই এটা মিলমালিকদেরই বহন করতে হবে।’

দাম বাড়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের বড় অজুহাত থাকে আমদানি কম হওয়া। কিন্তু বাস্তবে ভোজ্য তেল আমদানি বেড়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে পাম তেল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার টন। গত বছরের একই মাসে আমদানি হয়েছিল ৭৩ হাজার ৬৮২ টন। পাম তেল আমদানির পুরোটাই এখন রেডি অর্থাৎ পরিশোধন হয়েই আমদানি হয়েছে। ফলে আমদানি করেই সেটি বিক্রির উপযোগী। অন্যদিকে সয়াবিন তেল আমদানি হচ্ছে অপরিশোধিত আকারে। এপ্রিলে সয়াবিন এসেছে ৬৯ হাজার ৫৮১ টন, গত বছর একই মাসে এসেছিল ৬৬ হাজার ৯৩৮ টন। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাম ও সয়াবিন উভয় তেলের আমদানি বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম কমেছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১ হাজার ৫৭৫ ডলার; ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সেটি কমে ১৫৪০ ডলারে; মার্চে সেটি আরও কমে ১৪৮১ ডলারে এবং সর্বশেষ এপ্রিলে তা নেমে ১ হাজার ১১৩ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত