ঢাকার নবাবগঞ্জের স্বর্ণ ব্যবসায়ী কৃষ্ণ সাহার (৫০) কাছ থেকে পুলিশ সদস্য পরিচয়ে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ডাকাত দলের তথ্যদাতা (সোর্স) হিসেবে কাজ করেছে তারই পরিচিত আরেক স্বর্ণ ব্যবসায়ী। আন্তঃজেলা ডাকাত দলের ওই সোর্সের নাম শ্যামল সরকার। নবাবগঞ্জের আগলা বাজারে কৃষ্ণ সাহার দোকানের পাশেই শ্যামলের স্বর্ণের দোকান। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই টার্গেটে রেখেছিলেন কৃষ্ণ সাহাকে। প্রতিদিন দোকান বন্ধের পর কৃষ্ণ সাহা কখন স্বর্ণালংকার বাড়িতে নিয়ে যেতেন এবং কখন ফের দোকানে নিয়ে আসতেন তার বিস্তারিত ডাকাত দলকে জানান এই শ্যামল। এর বিনিময়ে পান ডাকাতির ১১ ভরি স্বর্ণালংকার। এই ডাকাত দলটির সদস্যরা শুধুমাত্র নবাবগঞ্জেই নয়, দেশের আরও বিভিন্ন জায়গায় স্বর্ণের দোকানে বেশ কয়েকটি দুর্ধর্ষ ডাকাতি করেছে। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় খুন, ডাকাতি ও অস্ত্র আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।
গত সোমবার এই আন্তঃজেলা ডাকাত দলের হোতাসহ ১২ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানতে পেরেছে ঢাকা জেলা পুলিশ। গ্রেপ্তাররা হলো ডাকাত দলের প্রধান নুরুজ্জামান হোসেন ওরফে মুক্তার হোসেন, তার সহযোগী সাইফুল, হুমায়ুন কবির, শাহাদাত, নজির হোসেন, মান্নান, হুমায়ন মিয়া, শাকিল খান, জাহাঙ্গীর, আব্দুস সামাদ, শ্যামল সরকার ও রিপন মিয়া। বিভিন্ন থানায় মুক্তার হোসেনের নামে আটটি, সাইফুলের নামে ছয়টি, হুমায়ন কবিরের নামে চারটি এবং নজির হোসেনের নামে চারটিসহ অন্যদের নামেও একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে ১৭৭ ভরি ১৫ আনা স্বর্ণালংকার যার মূল্য ১ কোটি ৫৭ হাজার টাকা, ৩৮৬ ভরি ৬ আনা রৌপ্য যার মূল্য ৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকাসহ ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এসব মালামাল ডাকাতির পর ভাগাভাগি করে নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে চলে যায় তারা। গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে আলাদা আলাদাভাবে এসব মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু শাহাদতের কাছ থেকেই ৩৭৩ ভরি রৌপ্য উদ্ধার করা হয়। স্বর্ণালংকারের একটি বড় অংশ উদ্ধার করা হয় সাইফুলের কাছ থেকে। এছাড়া ডাকাতির টাকা দিয়ে দুটি অটোরিকশাও কেনে তারা।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কৃষ্ণ সাহার স্বর্ণালংকার ডাকাতির ঘটনার পর নবাবগঞ্জ থানা পুলিশসহ সেখানকার সহকারী পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সমন্বয়ে গঠন করা একটি টিম টানা সাত দিন ধারাবাহিকভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান চালিয়ে ১২ জনের এই চক্রটিকে গ্রেপ্তার করে। তারা আন্তঃজেলা ডাকাত চক্রের সদস্য। শুধু ঢাকা নয় টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের বিচরণ। তাদের প্রত্যেকের নামে একাধিক মামলা রয়েছে।’
ডাকাতির ঘটনায় ব্যবসায়ী কৃষ্ণ সাহার করা মামলার এজাহারে বলা হয়, প্রতিদিনের মতোই গত ৩০ এপ্রিল সকালে নবাবগঞ্জের টিকরপুর কৃষ্ণহাটির বাড়ি থেকে আগলা বাজারে নিজ দোকানে যাচ্ছিলেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী কৃষ্ণ সাহা। তার সঙ্গে আড়াইশ ভরি স্বর্ণালংকার, তিনশ ভরি রৌপ্যালংকার ও নগদ আড়াই লাখ টাকা ছিল। ব্যাটারিচালিত অটো রিকশায় যাওয়ার পথে ঢাকা-নবাবগঞ্জ মহাসড়কের আগলা পোস্ট অফিসের সামনে একটি মাইক্রোবাস গতিরোধ করে রিকশাটির। সাধারণ পোশাকে থাকা চারজন লোক মাইক্রোবাসটি থেকে নেমে তাদের হাতে থাকা ওয়াকিটকি দেখিয়ে নিজেদের পুলিশ সদস্য পরিচয় দেয়। পরে কৃষ্ণ সাহার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে দাবি করে জোর করে তাকে মাইক্রোবাসে তোলে। এরপর কৃষ্ণ সাহার কাছে থাকা সব অলংকার ও টাকা কেড়ে নিয়ে হাত-পা বেঁধে তাকে মানিকগঞ্জের সিংগাইরের সাহরাইল গ্রামে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়।
ভুক্তভোগী কৃষ্ণ সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কাছ থেকে স্বর্ণ ও রৌপ্যসহ মোট এক কোটি পঁয়ত্রিশ লাখ পঞ্চান্ন হাজার টাকার মালামাল ছিনিয়ে নেয়। মাইক্রোবাসে তুলেই আমাকে হ্যান্ডকাপ পরায়। গামছা দিয়ে পা ও চোখ বেঁধে রাখে। আমি কথা বলতে গেলেই গামছা মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। এক পর্যায়ে আমার ঠোঁটে মলম লাগিয়ে দেয়। ফলে আমার ঠোঁট ভারী হয়ে যায়, তখন আর কথা বলতে পারিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডাকাতরা গাড়ির ভেতরে উচ্চ সাউন্ডে (শব্দে) গান বাজাচ্ছিল। গাড়িতে তোলার ২০ মিনিট পর দুটি ব্যাগে থাকা স্বর্ণালংকার, রৌপ্য, টাকা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে আমাকে রাস্তার পাশে ছুড়ে ফেলে। ১২ থেকে ১৩ জন ছিল মাইক্রোবাসটিতে। আমাকে বেদম মারপিট করেছে তারা।’
নবাবগঞ্জ থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডাকাতির এই ঘটনার পর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চেষ্টা করেছি আসামি গ্রেপ্তার করার। অবশেষে আমরা সফল হয়েছি। তবে ভয়ংকর এই ডাকাত চক্রের একজন গ্রেপ্তার হয়নি। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।’
