ভিজ্যুয়াল মিডিয়া আসে প্রথম। তারপর এর সঙ্গে মিশ্রণ হয় অডিওর। তৈরি হয়, অডিও-ভিজ্যুয়াল। চলমান ভিজ্যুয়াল যদি ধরি, তাহলে এর শুরু চলচ্চিত্র দিয়ে। এরপর থেকে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি, মিডিয়া, সিনেমা অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি এ রকম নানাভাবে এর শাখা-প্রশাখা ছড়িয়েছে। একই সঙ্গে টেকনোলজির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এর নানারকম প্রকাশ ভঙ্গিরও পরিবর্তন হয়েছে। প্রভূত উন্নতি হয়েছে নন্দনতত্ত্বের। নানা ধরনের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে, এ সময় পর্যন্ত প্রযুক্তির ভিন্নরকম সংস্কৃতি ও বিনোদনের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ হচ্ছে ওটিটি বা ওভার দ্য টপ। প্রযুক্তিকে অবজ্ঞা করতে যাওয়াটা অনেক ক্ষেত্রে সময় এবং বাস্তবতাকে অবজ্ঞা করার মতোই। এর মাধ্যমে সময় এবং বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হয় যা মোটেও উচিত না। সুতরাং প্রযুক্তিকে আমাদের মেনে নিতেই হবে। সেটা নির্মাণের ক্ষেত্রে হোক, প্রদর্শনের ক্ষেত্রে হোক বা বিপণনের ক্ষেত্রে হোক। প্রযুক্তিকে গ্রহণ করেই, নতুন প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে যেতে হয়।
কোনো ধরনের যুক্তির ধার না ধেরে, যারা গায়ের জোরে মানবেন না সেটা তাদের সমস্যা। বলা ভালো, এটা সেই মানুষের সীমাবদ্ধতা। আমরা যদি একটু বাস্তবতা বিশ্লেষণ করি, তাহলে কী দেখব? সমগ্র পৃথিবীতে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির পর এলো টেলিভিশন। বিনোদনের একটা বড় মাধ্যম হলো, এই টেলিভিশন। এরপর আমাদের এখানে এলো ভিসিআর। সিনেমা হলের বাইরে আরও নানাভাবে কিন্তু সিনেমা প্রদর্শনের ব্যবস্থা হতে থাকল। এর নেপথ্যে কিন্তু সিনেমা শিল্প বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্নভাবে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামও করতে হয়েছে। অথচ তা কিন্তু হারায়নি। বরং আরও প্রবলভাবে বিশ্বকে জড়িয়ে ধরেছে। শেষ পর্যন্ত বিশে^র অধিকাংশ দেশ, এই মাধ্যমকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। উপরন্তু এখন বলতে হচ্ছে, সিনেমা অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি। এর মানে হচ্ছে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির আরও অনেক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। ওটিটি হচ্ছে, এখন পর্যন্ত সর্বশেষ বড় সংযোজন। যেটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে। আমাদের বর্তমান নিঃসঙ্গতার যুগে, পৃথিবীব্যাপী সামাজিক দূরত্বের এ সময়ে এসে ওটিটির ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। এমন কথা বলতেই পারি, নেটফ্লিক্স বা এমাজনের মতো প্ল্যাটফর্ম অনেক আগে থেকেই ব্যবসা করে আসছে। আজ থেকে ৫ বছর আগে, ওটিটির যে ব্যবসা ছিল, দর্শক চাহিদা ছিল- বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী তা বহুগুণে বেড়েছে। এখন বিশে^ ওটিটি রয়েছে কয়েক হাজার। এর মধ্যে অনেকগুলো আবার আঞ্চলিক ভাষানির্ভর। সেখানে ওটিটিতে বিনোদনের সৃজনশীল কর্মগুলোই দেখানো হচ্ছে। অবশ্য এখানে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে কি সিনেমা এবং এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির নন্দনতাত্ত্বিক বিবর্তনও হচ্ছে? আমার কথা হচ্ছে, অবশ্যই। শত বছরের পুরনো মাধ্যম হলেও এর নন্দনতাত্ত্বিক বিবর্তন প্রতিদিনই হচ্ছে। কিন্তু আমরা টের পাচ্ছি না। সেগুলো আমাদের চোখে পড়ে না। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর, ঠিকই তা টের পাব।
সিনেমা সবসময়ই, লার্জার দ্যান লাইফ। সিনেমা নির্মাণের কৌশল ও লেন্সিংয়ের একটা আলাদা নন্দনতাত্ত্বিক ভিত্তি আছে। সিনেমা যখন টেলিভিশনে চলে এলো অথবা এন্টারটেইনমেন্ট কন্টেন্ট যখন টেলিভিশনে চলে এলো সেটা সোপ অপেরা হোক, নাটক হোক তখন কিন্তু এটমোস্ফেয়ারটা পরিবর্তন হয়ে যায়। পারিপাশির্^কতার পরিবর্তন হলো। তখন সে আমার কাছে, লার্জার দ্যান লাইফ রইল না। হয়ে গেল স্মলার দ্যান লাইফ। হয়তো কনটেন্ট একই। আর ওটিটির ক্ষেত্রে এটা আরও জটিল হয়ে গেল। এখন এটা আমি টেলিভিশন, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, মোবাইলেও দেখতে পারি। তাহলে দাঁড়াল কী? কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে বা শৈল্পিক প্রকাশের যে নন্দনতত্ত্ব সেখানে কিন্তু অনেক পার্থক্য তৈরি হলো। বড় পর্দা থেকে ছোট পর্দা এবং তারপর মোবাইল ফোন। অনেক জটিল হয়ে গেল বিষয়টা। আমরা একটা জটিল সময় পার করছি। জানি না, ভবিষ্যতে কী আছে? টেকনোলজিও কোনদিকে যাবে তাও বলতে পারি না। তবে ওটিটির রিহার্সাল টেকনোলজি অন্য ফর্মে মার্কেটে অনেক আগেই ছিল। মজার বিষয় হচ্ছে, আমরা কিন্তু বলতে পারছি না, এটাই শেষ। জানি না, এরপর কী আসবে! তবে আসবে, এটা নিশ্চিত।
কনটেন্টের ক্ষেত্রে ওটিটি নির্মাতাকে একটা স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। আসলে একটা না, স্বাধীনতা এনে দিয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। প্রথম কথা হচ্ছে, সিনেমা তৈরি করতে হলে বড় ধরনের একটা বাজেট লাগে। তুলনামূলকভাবে এখানে কম টাকায় কাজ করা যাচ্ছে। সাধারণভাবে এই কথা বলা যায়। একজন নির্মাতা কিন্তু এই সামর্র্থ্যরে মধ্যেই নিজেকে প্রকাশ করতে পারছে। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে সময়। সাধারণত ২-২.৩০ ঘণ্টার মধ্যে চলচ্চিত্রে আমাদের একটি গল্প বলতে হয়। কিন্তু ওটিটিতে এই গল্পটা যখন বলছি, তখন ৬-৯ ঘণ্টা পাচ্ছি। কারণ ওটা সিরিজে পাচ্ছি। তখন গল্পটাকে অনেক গভীরে গেয়ে বিস্তারিত বলতে পারি। সিনেমাতে কিন্তু তত বিস্তারিতভাবে গল্প বলার সুযোগ নেই।
মনে রাখতে হবে, ওটিটি একটা বিজনেস প্ল্যাটফর্ম। কেউ যদি এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে নিজেরা প্রডাকশন করে, আপলোড করতে চায় তখন কিন্তু এটা অনেক বড় বিনিয়োগের বিষয়। সিনেমার ইনভেস্টমেন্ট অনেক স্তরে বিভক্ত। প্রডিউসার-পরিচালকের টিম, স্টুডিও, ডিস্ট্রিবিউটর, সিনেমা হলসহ অনেক জায়গায় বিনিয়োগের বিষয় আছে। কিন্তু ওটিটিতে কিন্তু সেটা নেই। এখানে গুরুত্বটা শুধু প্রডাকশন পর্যায়ে। স্বীকার করতে হবে, সারা বিশে^ই এর চাহিদা আছে।
কোনোরকম দ্বিধা ছাড়াই, অকপটে এটা বলতে পারি যে, বিশ্বব্যাপী ওটিটির এখন বিশাল মার্কেট। জনপ্রিয়তার বিচারে অনেক এগিয়ে। বিশেষ করে, করোনাকালে এর ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। ঘরবন্দি মানুষের কাছে, এটিই হয়ে ওঠে বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। তবে এটা বলতে পারব না, এই জোয়ার কতদিন চলবে। জানি না, মানুষের মধ্যে আবার একঘেয়েমি তৈরি হবে কি না?
ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, শিল্প এবং সংবাদে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নেই। যে সংবাদ ভিত্তিহীন, সেই সংবাদ এমনিতেই মানুষ প্রত্যাখ্যান করবে। প্রথমে একটু বিভ্রান্ত হবে। এরপর সত্য জানার পর, সেটি প্রত্যাখ্যান করবে। শিল্পের ক্ষেত্রেও তাই। যে শিল্প আরোপিত, যেখানে সততা নেই সেটি দীর্ঘসময়ের জন্য টিকে থাকবে না। তাৎক্ষণিকভাবে হয়তো এটা হুজুগ তৈরি হতে পারে। এটা হচ্ছে, কমার্শিয়াল প্ল্যাটফর্ম। তারা ইনস্ট্যান্ট টাকা ব্যাক চাইবে। যখন পুঁজির ভার বা ওজন তৈরি হবে, তখন লং টার্ম ইনভেস্টমেন্টও হবে। এমন প্রডাকশনে তারা যাবে, যে প্রডাকশন মিলিয়ন মানুষ দেখবে না, কিন্তু সেটা ৫০ বছর ধরে চলবে। এখন যদি কেউ সেক্সুয়ালিটির কথা বলে, তাহলে আমি বলব এটা তো ওভার দ্য টপ। আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আমাকে হয়তো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, কিন্তু আকাশকে তো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
মনে রাখতে হবে, এটা কিন্তু ওভার দ্য টপ। পৃথিবীতে রয়েছে কয়েক হাজার। ওটিটিকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা ঠিক হবে না। এখানে ভিন্নমত থাকবে। তাই বলে, সেই জায়গায় এক্সারসাইজ করতে হবে বলে আমি মনে করি না।
সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, কন্ট্রোল দ্য পিপল। সব সরকারই এটা করেছে। আমি শুধু বর্তমান সরকারের কথা বলছি না। সেই আশির দশক থেকে দেখে আসছি, সরকার শুধু আইনই করছে। নিয়ন্ত্রণ তো হচ্ছে না। তখন আরেকটা পথ বের হবে। শোনা যাচ্ছে, ওটিটি নিয়ন্ত্রণে আইন হচ্ছে। এটা মোটেও বাস্তবসম্মত না। উন্নত বিশে^ তো এসব নিয়ন্ত্রণের কথা কেউ চিন্তাই করতে পারে না। যে মানুষ প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে পারছে না, সেই মানুষ সময়কে ধারণ করতে পারছে না। যদি তা করা হয়, তাহলে দেশের নির্মাতাদের প্রতি অবিচার করা হবে। কোনো ধরনের অজুহাতই এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটি আটকানোর চেষ্টা করাটাই অন্যায়। মনে রাখতে হবে, ওটিটিই কিন্তু শেষ কথা নয়, নন্দনতত্ত্বের ভাঙচুর চলবেই এটা চলমান প্রক্রিয়া।
লেখক: স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালক
