চট্টগ্রামে জোড়া খুনের ঘটনার মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে নগরের হালিশহরের একটি বাসা থেকে ছদ্মবেশে আত্মগোপন অবস্থায় ফয়সালকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় র্যাব। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার (ফয়সাল) পরিকল্পনায় জোড়া খুনের ঘটনাটি ফয়সাল স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছেন র্যাব-৭-এর কর্মকর্তারা।
তিন দিন আগে নগরে জোড়া খুনের পর আবারও আলোচনায় আসে কিশোর গ্যাং। পুলিশ ও র্যাবের নজরদারি সত্ত্বেও ভয়ংকর এই অপরাধ চক্রের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তারা লিপ্ত হচ্ছে প্রাণঘাতী লড়াইয়ে।
এ ঘটনায় গত ৯ মে পর্যন্ত কথিত বড়ভাই ইলিয়াছসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর মধ্যে চারজন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাদের জবানবন্দিতে উঠে আসে কিশোর গ্যাং গডফাদার শ্রমিকলীগ নেতা ইলিয়াছের নাম। পাশাপাশি আটক আসামিদের জবানবন্দিতে জোড়া খুনের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উঠে আসে মো. ফয়সালের নাম। এরপর তাকে ধরতে মাঠে নামে পুলিশ ও র্যাবের একাধিক টিম।
র্যাব অনুসন্ধান করে জানতে পারে পাহাড়তলী বিটাক এলাকায় শ্রমিকলীগ নেতা ইলিয়াছের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে দুটি কিশোর গ্যাং গ্রুপ। সাগরিকা শিল্প এলাকায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ছিনতাই, জমি দখল, মাস্তানি, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এই গ্রুপে স্কুল-কলেজ পড়–য়াদের পাশাপাশি শ্রমিক, অটোচালক, বেকার ও বখাটেরাও রয়েছে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যেও প্রায়ই মারামারিতে লিপ্ত হয়। ইলিয়াছকে সবাই ‘বড়ভাই’ বলে সম্বোধন করত।
র্যাবের একটি সূত্র জানায়, পাহাড়তলী থানাধীন সাগরিকা বিটাক মোড়ে শ্রমিক লীগ নেতা মো. ইলিয়াসের একটি অফিস আছে। ওই অফিসে বসে দুটি কিশোর গ্রুপ পরিচালনা করতেন ইলিয়াছ। নারীঘটিত বিষয় নিয়ে ঝগড়া হলে ৮ মে রাত সাড়ে ৮টার দিকে উভয়পক্ষকে তার অফিসে ডেকে আনেন। এ সময় উভয় গ্রুপের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হলে ইলিয়াস বলেন, ‘শালাদের ধরে মার।’ এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কিশোর গ্যাং সদস্য ফয়সাল, বাবু, বিপ্লব, কার্তিকসহ আরও ১০-১৫ জন মাসুম এবং সজিবকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় চমেক হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহত মাসুমের ভাই মুনির হোসেন বাদী হয়ে ১৮ জনসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনের বিরুদ্ধে পাহড়তলী থানায় মামলা করেন।
পাহাড়তলী থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, পাহাড়তলীতে জোড়া খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার আটজনের মধ্যে চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে জোড়া খুনের ঘটনায় ফয়সালের পূর্বপরিকল্পনার কথা জানান। গ্রেপ্তার হওয়া ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এদিকে ফয়সালকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে চান্দগাঁও ক্যাম্পে প্রেস ব্রিফিং করেন র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মাহবুব আলম।
তিনি সাংবাদিকদের জানান, পাহাড়তলীতে জোড়া খুনের ঘটনায় অংশ নিয়েছিল ১০-১২ জন। তাদের সবার বয়স ১৬ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। ঘটনার রাতে সিরাজুল ইসলাম শিহাব ও বন্ধু রবিউল নামে দুই কিশোরের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও মারামারি হয়। এ ঘটনা মীমাংসা করার কথা বলে দুপক্ষকে নিয়ে গত ৮ মে রাত ৮টায় বৈঠকে বসে ইলিয়াছ। ওই বৈঠকে ইলিয়াছের সামনেই ছুরিকাঘাত করে মাসুম ও সজীব নামের দুই যুবককে খুন করে ফয়সাল ও রবিউল বাহিনী।
র্যাব আরও জানায়, ৮ মে সন্ধ্যা ৭টায় সাগরিকা জহুর আহমদ স্টেডিয়াম এলাকায় নিহত মাসুমের বন্ধু সিরাজুল ইসলাম শিহাব তার বান্ধবীকে নিয়ে ঘুরতে যান। ওই সময় শিহাবকে উদ্দেশ্য করে ফয়সাল ও রবিউল বলে, ‘ওই মেয়ের সঙ্গে তোকে মানায়নি।’ বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও বাগ্বিত-ার একপর্যায়ে মারামারিও হয়। ওই সময় ফয়সাল ও রবিউল বিষয়টি ‘বড়ভাই’ ইলিয়াছ মিঠুকে জানায়।
ওই দিন রাত ৮টার দিকে সিরাজুল ইসলাম শিহাবকে ফোন করে ইলিয়াস বলে, বিষয়টি মীমংসা করতে তার অফিসের আসতে হবে। কথামতো শিহাবের সঙ্গে বন্ধু মাসুম, সজীব, ফাহিম, রোকন, রজিন, তুহীন, মেহেদী হাসান, ইউসুফ ও প্রান্তসহ ইলিয়াসের অফিসে যায়। সেখানে আগে থেকেই ইলিয়াসের নির্দেশে ও ফয়সালের পূর্বপরিকল্পনায় রবিউলসহ প্রায় ২০-২৫ জন কিশোর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। একপর্যায়ে মাসুম ও সজীবকে ছুরিকাঘাত করে ফয়সাল, রনি, বাবু ও আকাশ।
