মাঠের বিরোধী দল বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলন ও আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সে কারণে অনুকূল পরিস্থিতির আশায় নানাভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে দলটি। সরকারবিরোধী আন্দোলন যেন তীব্র না হয়, সে চেষ্টার পাশাপাশি আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে হবে এমন সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে আওয়ামী লীগ। কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করা ও দেশের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে রাখতে যত উপায় আছে, সবই করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দল।
এসব কথা জানিয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, দেশের পরিস্থিতি সবসময়ই নিয়ন্ত্রণ করেছে আওয়ামী লীগ সরকার, আগামীতেও পারবে, এমন বিশ্বাস আছে তাদের। কিন্তু বিদেশি তৎপরতা একপর্যায়ে আওয়ামী লীগকে বেসামল পর্যায়ে নিয়ে যেতে শুরু করেছে।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতারা বলেন, সামনের দিনগুলোতে বিএনপি-জামায়াত ছাড়া সব দলের সঙ্গে আলোচনা করার পরিকল্পনা নিয়েছে আওয়ামী লীগ। সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত এ পরিকল্পনা ধরেই কাজ করবে দলটি। নিজেদের উপকার হবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দলগুলোকে সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হবে। একই নীতি অনুসরণ করা হবে বিদেশিদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। তারা বলেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আবার ক্ষমতায় যাওয়া। ক্ষমতায় যাওয়ার পথ প্রশস্ত করতে প্রয়োজনে বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরও জোরদার করবে, প্রয়োজন পড়লে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্কে ইতি টানতেও রাজি সরকারি দল।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, চলতি বছর নির্বাচনের আগপর্যন্ত কূটনীতিক তৎপরতায় আরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। সর্বশেষ জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফরের মূল লক্ষ্য শেখ হাসিনার অধীনেই আগামী নির্বাচন হবে ক্ষমতাসীনদের এ নীতির প্রতি বিদেশিদের সমর্থন আদায় করা। তিন দেশ সফরে কার্যসিদ্ধি হয়েছে দাবি করে ওই নেতা বলেন, জাপান বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এ সফরে এমন ইঙ্গিতও পেয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। জাপানের এ ইঙ্গিতে অন্য দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে দৃশ্যমান কোনো ‘মিটিং-সিটিং’ চোখে না পড়লেও প্রধানমন্ত্রীর সফর আওয়ামী লীগের জন্য অর্থবহ হয়েছে।
অবশ্য, ক্ষমতাসীন দলের কাছে তিন দেশ সফর বিশেষ গুরুত্বের হলেও দেশের বিভিন্ন মহলে আলোচনা আছে যে, প্রধানমন্ত্রীর সফরে সুফল মেলেনি।
তবে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাকি যেসব মতপার্থক্য রয়েছে, জুলাইয়ের পর সেসবও নিরসন হয়ে যাবে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দুই দেশ সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এ নেতারা যখন এমন দাবি করছেন, তখন বিএনপির নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক আলোচনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে এখনো অনড়। দাবি আদায়ে তারা সরকারকে চাপ দিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, যা শুরু হবে আগামীকাল শনিবার থেকে। এ ছাড়া সমমনা দলগুলোর সঙ্গে যুগপৎ কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কার্যত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতিতে বিদেশিদের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগামী নির্বাচন ইস্যুতে দুই দলই যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
দলের ও সরকারের হয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়নে কাজ করেন আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ‘পলিসি’ সবসময়ই নির্ধারণ করা হয় পর্দার আড়ালে। সবকিছু সবাই যেমন বোঝার ক্ষমতা রাখে না, তেমনি সবার জানারও প্রয়োজন পড়ে না। ঘোরপ্যাঁচ না করে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের পর ক্ষমতাসীন দলের এ নেতার সঙ্গে দেশ রূপান্তরের কথা হলে তিনি বলেন, সবকিছু সরকারের অনুকূলেই আছে। ‘জিও-পলিটিকস’ বড় ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দেওয়ায় বিদেশিদেরও আওয়ামী লীগের বিষয়েও ইতিবাচক চিন্তা করতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, তিন দেশ সফরের সময়ই ভবিষ্যতের অনেক কিছু নির্ধারণ হয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ওই নেতা আরও জানান, সেপ্টেম্বরে ভারত সফরের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেই সফর হলে আরও কিছু বিষয় সহজ হয়ে যাবে সরকারের জন্য।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি দুদিনের সফরে ঢাকায় এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাউন্সিলর ডেরেক শোলে। একই সময় ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রাও ঢাকা সফর করেন। ওই সফরে বিনয় মোহন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি ভারতের সমর্থনের কথা জানান।
রাজনীতি-কূটনীতিতে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিন দেশ সফরে রাজনীতির বিজয় হয়েছে। এর সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের অন্যতম ‘কন্টিবিউটর’ যুক্তরাষ্ট্র। সেই বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ৮০০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন দিয়েছে। এটি একটি ইন্ডিকেশন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক মতপার্থক্য দূর হয়েছে।
ওই নেতা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘পার্টনারশিপ ডায়ালগ’ বড় ঘটনা। ওই সংলাপে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু মীমাংসা হয়েছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সালমান এফ রহমানের সঙ্গে ডেরেক শোলের গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়েও মতপার্থক্য দূরের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে দাবি করেন শীর্ষ এ নেতা। জাপানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিও এ সরকারের গ্রহণযোগ্যতার আরেকটি ইঙ্গিত বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলে জাপানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি অসম্ভব ব্যাপার ছিল। এ চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-জাপান এ দুই দেশ রাজনীতি ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করবে।
এ সফর শেষে জাপানের রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে জাপান হস্তক্ষেপ করবে না। আরেক প্রশ্নের জবাবে ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আগের রাষ্ট্রদূত কী বলেছেন না বলেছেন, তা নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংবিধানসম্মতভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই হবে। সেই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিন দেশ সফরের ব্যাপারে নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে জাতিকে অবহিত করবেন। সভাপতিম-লীর আরেক সদস্য মতিয়া চৌধুরীও দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী নির্বাচন সংবিধানসম্মতভাবে শেখ হাসিনার অধীনেই হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অন্যায়ভাবে কেউ কি আওয়ামী লীগ বা সরকারকে চাপ দিয়ে কিছু আদায় করতে পারবে?’
