আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এক বক্তব্য ঘিরে রাজনীতিতে নতুন আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচনে বিএনপি আসার ঘোষণা দিলে নির্বাচনকালীন সরকারে তাদের রাখার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে আওয়ামী লীগ।’ গত রবিবার সেতু কর্র্তৃপক্ষের এক সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাব নির্বাচনকালীন সরকারের ইঙ্গিত দেন তিনি।
ওবায়দুল কাদেরের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকারের বিএনপিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। যেহেতু বিএনপি এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে চাচ্ছে না অর্থাৎ আস্থা পাচ্ছে না তাহলে এবার কী নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপিকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয় দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানানো হবে?
ওবায়দুল কাদের এই প্রশ্নের জবাবেই বলেছিলেন, ‘যাই করা হয় সংবিধানের মধ্যেই থাকতে হবে। সংবিধানে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকলে, কোনো অসুবিধা নেই।’
এ প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ‘বিএনপি যদি বলে আমরা নির্বাচনে আসব। তখন এ বিষয়ে কথা হবে। এখন তারা বলছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা নির্বাচন করবে না, তারা এ সংসদকে চায় না। প্রধানমন্ত্রীর ও মন্ত্রিসভার পদত্যাগ চায়। তাদের এসব শর্তারোপের মধ্যে আমরা কীভাবে বলব যে আপনারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিতে আসুন বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয় আপনাদের দিচ্ছি, তাদের তো সম্পূর্ণ উত্তর আর দক্ষিণ মেরুর অবস্থান।’
ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যকে ঘিরে দুদিন ধরে রাজনৈতিক ও সব মহলে নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপিকে রাখা না রাখার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। যদিও আওয়ামী লীগের অন্যান্য নীতিনির্ধারণী নেতারা বলছেন, এটা হয়তো সাধারণ সম্পাদকের নিজস্ব বক্তব্য। আর জাতীয় পার্টিসহ অন্য দলের নেতারা এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ কেউ সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
তবে হঠাৎ করে নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপিকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দেওয়া হবে ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যকে নেহাতই কথার কথা বলতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, বিএনপিও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায় এবং বাইরের পক্ষ থেকেও চাপ আছে তাদের নির্বাচনের মাঠে নেওয়ার। এর মধ্যে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে আছে। আবার সরকারের ওপরও চাপ আছে বিএনপিসহ সব দলকে আশ্বস্ত করে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার। একই সঙ্গে তারা কোনোভাবেই চায় না তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আসুক। তাই বিএনপিকে আশ্বস্ত করতে এটা সরকার পক্ষের একটা কৌশল হতে পারে। বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আবার এই নির্বাচনকালীন সরকারের বিএনপি বা অন্যান্য দলকে মন্ত্রিত্ব দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে কি না সেটাও নিশ্চিত নয়।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যের সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এটা জনগণকে বিভ্রান্ত করার তাদের আরেকটি চক্রান্ত। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কোনো নির্বাচনকালীন সরকার গঠন আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আগে সরকারের পদত্যাগ, তারপর নির্বাচনকালীন সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা। এর বাইরে কিছু নয়।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বিএনপির জন্য এই প্রস্তাবটি খারাপ হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাদের এ প্রস্তাবটি গ্রহণ করা উচিত। আর বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ না নেয় তাহলে তারা রাজনীতি থেকেও ছিটকে পড়বে।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের সাধারণ সম্পাদক কেন এবং কোন প্রেক্ষিতে এই বক্তব্য দিয়েছেন এটা আসলে আমরা বলতে পারব না। এর ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারবেন।
ক্ষমতাসীন ১৪ দলের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। আর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের দেওয়া প্রস্তাবে রাজনৈতিক টানাপড়েন কতটা মিটবে সেটা এখনো বলার সময় আসেনি। বিএনপি যদি এ প্রস্তাব গ্রহণ করে তবে নির্বাচনকালীন সরকারে তারা অংশগ্রহণ করতেই পারে। এ ক্ষেত্রে সাংবিধানিক কোনো বাধা নেই। বিষয়টি আসলে বিএনপির কাছে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের প্রস্তাবটি বিএনপি গ্রহণ করেনি। বিএনপির সেই নির্বাচন বর্জন করে। সেই সরকার ৫ বছর পূর্ণ করে ২০১৮ সালে আবার নির্বাচন দেয়। সেই নির্বাচনের মেয়াদও পূর্ণ করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।
