‘মাত্র ১৫ বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর সহযোগিতায় পড়াশোনা করেছি। পড়াশোনা শেষ করে একটা কলেজে শিক্ষকতা করি। তিন সন্তানকে পড়াশোনা করিয়ে বড় করতে গিয়ে কখন যে যৌবন পেরিয়ে বৃদ্ধ হয়ে গেলাম বুঝতেই পারিনি, এখন শেষ বয়সে ছেলেমেয়ে ছাড়া আছি প্রবীণ নিবাসে।’
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের প্রবীণ হিতৈষী নিবাসে বাস করা এক মায়ের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলছিলেন এই আক্ষেপের কথা।
‘স্বামীর মৃত্যুর পর একে একে বড় মেয়ে ও দুই ছেলেকে বড় করলাম, বিয়ে দিলাম। মেয়েটা বিয়ের পর আমেরিকায় চলে যায়। সেখান থেকে আগে বছরে দু-একবার খবর নিলেও দুবছর ধরে একবারের জন্যও খবর নেয়নি। নিজে না খেয়ে যে দুই ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করলাম। দেশের সবচেয়ে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করালাম, সেই দুই ছেলে এসে আমাকে এই নিবাসে রেখে যায়’ কথাগুলো বলতে বলতে কাঁদছিলেন তিনি।
বুকে চাপা কষ্ট নিয়ে ওই মা বলছিলেন, ‘রাতে ঘুমোতে পারি না। বারবার ঘুম ভেঙে যায়। তখন নিজেকে খুব একা মনে হয়। ছেলেমেয়েদের মুখ দেখতে ইচ্ছে হয়। নাতি-নাতনিদের জড়িয়ে ধরে ঘুমোতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু আমার কপালে ঘুম, ছেলেমেয়ে কিংবা সংসার লেখা নেই।’
আগারগাঁওয়ের প্রবীণ হিতৈষী নিবাসে ৩৫টা কক্ষ রয়েছে। বর্তমানে এখানে ১৯ জন মহিলা ও ১২ জন পুরুষ থাকেন। একজন ডাক্তার ও নার্স প্রতিদিন এখানে বসবাস করা প্রবীণদের চিকিৎসা দেন। এখানে থাকতে হলে কক্ষ ভাড়া ৭ হাজার টাকা করে দিতে হয়। সেই সঙ্গে যদি খাবার যোগ করেন তাহলে মাসে আরও তিন হাজার মিলিয়ে মাসে খরচ হয় ১০ হাজার টাকা। তবে কেউ ইচ্ছে করলে নিজেরা রান্না করেও খেতে পারেন বলে জানান নিবাসের সহকারী ম্যানেজার আবদুস সাত্তার।
তবে বৃদ্ধাশ্রম বা প্রবীণ নিবাস বললে আমাদের মাথায় যেমন চিন্তা আসে যে এখানে বাধ্য হয়ে থাকতে হয়। শেষ বয়সে ছেলেমেয়ে কিংবা আত্মীয়স্বজন খোঁজ না নিলে নিতান্ত অনিচ্ছায় এখানে থাকেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও ঘটে।
তেমনি এক ব্যতিক্রম হাজেরা আক্তার লিলি। পেশাজীবনে বেশ ভালো একটা সরকারি চাকরি করেছেন। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি করেন। মা দিবসের ওপর নিজের বিরক্তি প্রকাশ করে এড়িয়ে যেতে চাইলেও আমার বাড়ি সুনামগঞ্জ শুনে ফিরে এসে বললেন, খোকা সুনামগঞ্জের কোথায়? তারপর পাশে বসে গল্পের ঝাঁপি খোলে বসলেন। বললেন, ‘আমার শৈশব কেটেছে সুনামগঞ্জ সদরে। সেখানে এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। বাবা মুনসেফ ছিলেন (আগে সিনিয়র সহকারী জজকে মুনসেফ বলা হতো)। তারপর ঢাকা চলে এলাম। সুনামগঞ্জের জল জোছনায় মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলাম আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ (হাওর কন্যা)।’
মা দিবস নিয়ে তিনি বলেন, ‘এসব করে কী হবে। মা দিবস করে, এই নিবাসে বসবাস করা সবাইকে তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে দিতে পারবে? তাহলে এসব দিবস করে কী লাভ।’
হাজেরা আক্তার পেশাগত জীবনে একটা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনা বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪-১৫টা বই লিখেছেন। যার অধিকাংশের নামই ভুলে গেছেন। তার পরও জানালেন, নির্জনে নীল ও দৃষ্টিতে বৃষ্টি নামে দুটো ছোট গল্পের বইয়ের কথা। পাশাপাশি তিনি লিখেছেন, ‘সীমান্তের ওপারে’ নামে একটা উপন্যাস। জানালেন, হুমায়ূন আহমেদ তার প্রিয় লেখক।
বাসা ছেড়ে প্রবীণ হিতৈষী নিবাসে উঠে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১০ বছর আগে বুঝতে পারলাম নানা বিষয়ে একমাত্র মেয়েটার সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না। নাতিকে নিয়ে নিয়মিত স্কুলে যেতে হতো। মেয়ে বড়লোক স্বামীর প্রশ্রয়ে, যে লাইফস্টাইলে অভ্যস্ত সেটা আমার পছন্দ ছিল না। তা ছাড়া মেয়ের পরিবারের সঙ্গে থাকলেও একা খেতে হতো। আমার সঙ্গে বসে খাওয়ার সময় কারও নেই। ফলে চিন্তা করলাম একাই যদি খেতে হবে তাহলে এখানে থাকব কেন। তাই মেয়ের বাসা থেকে বের হয়ে এখানে এসে উঠি। পাশাপাশি আমার লেখালেখির জন্য মেয়ের বাসার পরিবেশ উপযুক্ত ছিল না।’
এ বয়সে একা নিবাসে এসে খারাপ থাকে না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেব না। মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। নিজের একমাত্র মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছি।’ তবে তার একমাত্র নাতি তাকে দেখতে আসে না এ নিয়ে বেশ আক্ষেপের কথা জানান তিনি। বলেন, ‘আমি কল দিয়ে ডাকলে মাঝেমধ্যে আসে, তবে এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর ডাকব না।’
তবে হাজেরার মতো মসৃণ নন এই নিবাসেরই আরেক প্রবীণ নাদিরা বেগমের জীবন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। থাকতেন সৈয়দ শামসুন্নাহার হলে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করতেন। পেশা জীবনে কিছুদিন সাংবাদিকতা করেছেন। এরপর দেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষকতা করেছেন। বাংলাদেশ বেতারে গান গেয়েছেন।
জানতে চাইলে নাদিরা বললেন, ‘আমার পুরো জীবন এক আক্ষেপের গল্প। ১৯৮৫ সালে ১০ বছরের ছেলে ও ছোট মেয়েকে রেখে স্বামী তালাক দেন। তারপর এক দশক অপেক্ষা করেছিলাম সন্তানদের ফিরে পেতে। কিন্তু স্বামী সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে দিত না। নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখতে, ভাইবোনের সন্তানদের নিজের সন্তান মনে করে মানুষ করতে শুরু করলাম। যেহেতু চাকরি করতাম, তাই নিজের সন্তান মনে করে তাদের সব আবদার পূরণ করতাম।’
‘অথচ সেই সন্তানগুলো বড় হয়ে আমার খবর নেয় না। ভাইবোন যখন দেখল, সংসারে আমার আর প্রয়োজন নেই। তখন শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র। এর মধ্যে ছোট ভাই মারা যায়। এরপর বড় ভাই তালুকদার ইফতেখার উদ্দিন ও দুই বোন মিলে আমাকে পাগল সাজিয়ে বাসা থেকে বের করে দেয়।’
তিনি জানান, বাবার রেখে যাওয়া পূর্ব রামপুরা হাইস্কুলের পাশে ৮৯/১ বাড়ি থেকে তাকে বঞ্চিত করতেই এ ষড়যন্ত্র করা হয়। মরার আগে বাবার রেখে যাওয়া বাড়ির ভাগ পেতে চান। সেখানে নারীদের জন্য একটা প্রতিষ্ঠান করে যেতে চান। তার বাবা ডিএসপি তালুকদার নূর মোহাম্মদ ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা।
মা দিবস নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু নিজের সন্তানদের পাইনি। তাই শিক্ষকতা জীবনে সব ছাত্রছাত্রীকে মাতৃস্নেহ দিয়েছি। বিনামূল্যে নাচ-গান শিখিয়েছি। কই কেউ তো খবর নেয় না। ভাইবোন বাসা থেকে বের করে দিয়েছে, কিন্তু যে সন্তানদের বড় করলাম, এত টাকাপয়সা খরচ করলাম, তারা তো যোগাযোগ রাখতে পারত। না কেউ খবর নেয় না। এখন আমার জীবনে আমি ছাড়া কেউ নেই।’
