দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশের শীর্ষ ৫ ব্যাংকের তালিকায় ঢুকতে চায় বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংক। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক এই ব্যাংক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে দ্রুত এগিয়ে যেতে চায় বলে জানিয়েছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ। সম্প্রতি দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ব্যাংকের ৩০ বছরের পথ চলা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ ব্যাংকিং খাতের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক এ জেড ভূঁইয়া আনাস
দেশ রূপান্তর : ৩০ পেরোল এনসিসি ব্যাংক। দীর্ঘ এই পথচলা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই?
মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ : আমরা ৩০ বছর শেষ করতে যাচ্ছি। ১৯৯৩ সালে ১৬টি শাখা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করি। এখন আমাদের শাখার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩১টি। এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের জনবল বেড়েছে, সম্পদ অ্যাসেট বেড়েছে। ব্যবসার আকার ও ব্যপ্তি বেড়েছে। ৩০ বছর আগে রেমিট্যান্স সংগ্রহে আমাদের তেমন কোনো অবদান ছিল না। এখন আমরা শীর্ষ ১০ রেমিট্যান্স সংগ্রহকারী ব্যাংকের একটি। শাখা বিবেচনায় আমরা এখনো অনেক ব্যাংক থেকে ছোট; বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলোর হাজারের বেশি শাখা রয়েছে। কোনো কোনো বেসরকারি ব্যাংকের শাখাও আমাদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। তারপরও মধ্যম আকারের ব্যাংকগুলোর মধ্যে এনসিসি অন্যতম।
দেশ রূপান্তর : ব্যাংককে ডিজিটালাইজড করতে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
মামদুদুর রশীদ : শাখা তুলনামূলক কম হলেও প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়িক পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এগিয়ে যেতে আমরা প্রযুক্তিতে মনোযোগ বাড়িয়েছি। এ জন্য আমরা প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকা বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কাজ করছি। তিন থেকে চার বছর আগে প্রযুক্তিতে আমরা অনেকটা পিছিয়ে ছিলাম। কিন্তু এ মুহূর্তে যদি বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর পাঁচটি ব্যাংকের নাম বলা হয়, তাহলে অবশ্যই এনসিসির নাম আসবে। আমাদের প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের কারণে গত বছর যুক্তরাজ্যভিত্তিক ম্যাগাজিন দি গ্লোবাল ইকোনমিকস এনসিসি ব্যাংককে দুটো অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে। এর জন্য আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিনি। এমনকি তথ্য-উপাত্তের জন্য তারাও আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক কাজের জন্য তারা নিজেরাই আমাদের এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে। পুরস্কার হচ্ছে, বেস্ট ইউজ অব টেকনোলজি, ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং মাইক্রো ফাইন্যান্স ব্যাংক।
দেশ রূপান্তর : শাখা কম থাকার পরও এমন কী উদ্যোগ নিয়েছেন, যার ফলে আপনাদের রেমিট্যান্স বাড়ল?
মামদুদুর রশীদ : এই মুহূর্তে আমাদের রেমিট্যান্স সংগ্রহের পরিমাণ দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি, কিন্তু আমাদের ব্রাঞ্চের সংখ্যা মাত্র ১৩১। তাহলে আমরা কীভাবে রেমিট্যান্স বেশি সংগ্রহ করলাম? এ জন্য আমরা পার্টনারশিপকে বেছে নিয়েছি। যাদের ফিজিক্যাল ব্রাঞ্চ অনেক আছে। যেমন রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে পার্টনার করেছি, আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের সঙ্গে পার্টনার করেছি আবার প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের সঙ্গেও পার্টনারশিপ রয়েছে। এভাবে আমরা আমাদের ব্যাপ্তি বাড়িয়েছি। অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় আড়াই হাজার শাখার সুবিধা আমরা নিতে পারছি। এ কারণেই আমরা দুই-তিন বছর ধরে রেমিট্যান্স সংগ্রহে শীর্ষ দশে থাকার গৌরব অর্জন করেছি।
এনসিসি মধ্যম সারির ব্যাংক হলেও অন্যদের সঙ্গে অংশীদারত্বের কারণে আমরা অনেক বেশি গ্রাহকের কাছে ব্যাংকিং সুবিধা নিয়ে যেতে পেরেছি। অবশ্য রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর জন্য আমাদের নির্দিষ্ট কিছু কাজ করতে হয়েছে এবং এর ফলও আমরা পেয়েছি। আমাদের যে ট্রেড ব্যবসা কিংবা আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা, তার সিংহভাগ রেমিট্যান্স দিয়েই কাভার করতে পারি। এ কারণেই আমদানিতে গুরুত্ব দিতে পারি। বিকাশ এবং নগদের সঙ্গে আমরা এপিআই জোট করেছি। আমাদের মাধ্যমে যেসব রেমিট্যান্স আসছে, তা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই চলে যাচ্ছে গ্রাহকের মোবাইল অ্যাকাউন্টে।
দেশ রূপান্তর : এনসিসি ব্যাংক গ্রাহকসেবা দিতে কী করছে?
মামদুদুর রশীদ : গত বছরের নভেম্বরে ইসলামি ব্যাংকিং শুরু করেছি। এই পাঁচ মাসে আমাদের ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো ২১৫ কোটি টাকা আমানত পেয়েছে। গ্রাহকসেবায় আমরা নতুন করে একটি পদক্ষেপ নিচ্ছি। এটিএম সংখ্যা কম থাকার কারণে গ্রাহকরা এটিএম থেকে টাকা তোলার সুবিধা পান না। এ জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমাদের গ্রাহকরা বাংলাদেশের যেকোনো এটিএম থেকে টাকা তুলতে পারবেন এবং এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচও কাটা হবে না। এতে বাংলাদেশের প্রায় ১৩ হাজার এটিএমের সবগুলোই আমাদের গ্রাহকদের জন্য ব্যবহারযোগ্য হয়ে যাবে। এর মাধ্যমে আমরা সেবাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। পাশাপাশি এটিএম বাড়ানোর খরচও সাশ্রয় হবে।
দেশ রূপান্তর : মুডিসের রেটিং সংক্রান্ত জটিলতার কারণে আপনাদের কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে?
মামদুদুর রশীদ : রেটিংয়ের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমাদের তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। কারণ আমাদের পার্টনাররা বুঝতে পেরেছে এটি এনসিসি ব্যাংকের সমস্যার কারণে হয়নি। এটি বাংলাদেশের সার্বিক সমস্যার কারণে হয়েছে। গত দুই বছরে করসপন্ডেন্ট ব্যাংকের যে লাইন ছিল, সেটি ৫০ শতাংশ বেড়েছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমরা যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি, সেটি ডলারের সরবরাহজনিত কারণে। আগে আন্তঃব্যাংক থেকে আমরা ১৫-২০ মিলিয়ন ডলার যেকোনো সময় নিতে পারতাম। কিন্তু সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো নিজেরাই তাদের আমদানি ব্যয় পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। এ কারণে আন্তঃব্যাংক থেকে আমরা কোনো ধরনের ডলারের সহায়তা নিতে পারিনি।
দেশ রূপান্তর : এসএমই ও কৃষিঋণ বিতরণে এনসিসি ব্যাংকের অবস্থা কী?
মামদুদুর রশীদ : বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কৃষিঋণ বিতরণে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয় তা আমরা সব সময় পালন করি। আবার কোনো কোনো সময় লক্ষ্যমাত্রার বেশিও ঋণ বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া এসএমইতে ব্যাংকের মোট ঋণের ২৫ শতাংশের বেশি বিতরণ করার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু আমাদের এ খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি। এসব খাতে আরও বেশি ঋণ কীভাবে বিতরণ করা যায় তা নিয়ে কাজ করছি।
দেশ রূপান্তর : অনেক ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে প্রণোদনার ঋণের অধিকাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থা কী?
মামদুদুর রশীদ : প্রণোদনার প্যাকেজ থেকে আমরা যেসব ঋণ বিতরণ করেছি তার অধিকাংশই ফেরত এসেছে। আমাদের গ্রাহকদের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতা কম। যে কারণে সার্বিকভাবেই আমাদের খেলাপি অনেক কম। আন্তর্জাতিক মানদন্ডের নিচে রয়েছে আমাদের খেলাপি ঋণ। প্রণোদনার প্যাকেজ থেকে ঋণ নেওয়া গ্রাহকদের দুই-একজন বাদে সবাই ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছেন।
