আমরা নিজেদের যতই উন্নত বা উন্নয়নশীল দাবি করি না কেন, দিন শেষে অসংখ্য দেশবাসীর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ঘাটতি রয়েছে। যেহেতু সবসময় রাষ্ট্র মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটাতে বাধ্য নয়, তাই সমাজের অনেক মানবিক মানুষ তার আশপাশের মানুষকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াতে আর্থিক সঙ্গতির চেয়ে যেটা বেশি দরকার, তা হচ্ছে সংবেদনশীলতা আর পারস্পরিক সহযোগিতা। পয়সা থাকলেও সবার দ্বারা চ্যারিটি হয় না। স্বার্থপর মানুষ বা গা-বাঁচিয়ে চলা মানুষ, চ্যারিটি করতে পারে না। তবে আমাদের দেশে চ্যারিটির দীর্ঘ ইতিহাস আছে। বিভিন্ন ধর্মের আর জাতের মানুষ এ দেশে তাদের অর্থ আর শ্রম দিয়ে চ্যারিটি করে গেছেন। মানুষকে খাবার দেওয়া, চিকিৎসা দেওয়া, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, মঠ, মসজিদ, মন্দির, চার্চ, রাস্তাঘাট, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, অতিথিশালা নির্মাণ করে গেছেন অনেক পরহিতৈষী মানুষ সমাজের জন্য। এই উপমহাদেশে আধুনিক রাষ্ট্র আমরা পেয়েছি ১৯৭১ সাল থেকে আর স্বাধীন বাংলাদেশ ১৯৭১ সাল থেকে। এর আগে যেসব স্থাপনা হয়েছে, তার সবই ছিল উদার মানবতাবাদী মানুষদের হাত ধরে।
এখনো চ্যারিটি বা দাতব্য কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন মানুষ আর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এককভাবেই বিভিন্ন দাতব্য কার্যক্রম পরিচালনা করেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কতিপয় ব্যক্তি সম্মিলিতভাবে চ্যারিটি চালায় বেশি মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছানোর জন্য। তবে অনেকেরই চ্যারিটির পেছনে বিভিন্ন উদ্দেশ্য থাকে। কেউ কেউ নিঃস্বার্থভাবে কোনো কিছু প্রত্যাশা ছাড়াই সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে চ্যারিটি করে। আবার কাউকে দেখা যায়, জীবনে প্রচুর অসৎপয়সা উপার্জনের পর শুধু লোক দেখানোর জন্য বা তথাকথিত ‘পুণ্য’ অর্জনের জন্য অসৎ পয়সা সৎ কাজে ব্যয় করে। অনেকটা কালো টাকা সাদা করার মতো। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, অনেক বিলাসবহুল ধর্মীয় উপাসনালয় আজ অসৎ পয়সায় নির্মিত আমাদের সমাজে এমনটা মানুষ মেনেও নেয়। এ কারণেই তো দুর্নীতি কমে না। কারণ আমাদের ঘুণে ধরা সমাজই দুর্নীতির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক।
আবার কেউ কেউ বিশেষ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য চ্যারিটি করে। যেমন : নির্বাচনের আগে অনেককে চ্যারিটি করতে দেখা যায়। নির্বাচনও শেষ, তার চ্যারিটিও শেষ। নেতৃত্ব যেহেতু পয়সা দিয়ে এখন কেনাবেচা সম্ভব, তাই নেতা হওয়ার জন্যও অনেকে চ্যারিটির পথ বেছে নেয়। এটাকে অবশ্য তারা বিনিয়োগ ভাবে। অনেকে আবার শুধু সামাজিক স্বীকৃতির জন্য চ্যারিটি করে। তবে একদল আছে চ্যারিটি দিয়ে মানুষকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করে নিজেদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য হাসিল করে। এরা দাতব্য কাজের চেয়ে, প্রচারের দিকে বেশি মনোযোগী থাকে। এক রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে অনেক অসৎ এনজিও বা দেশীয় সাহায্য সংস্থা বিভিন্ন বৈদেশিক সাহায্য আত্মসাৎ করেছে বলেও শোনা যায়। ভুঁইফোঁড় অনেক প্রতিষ্ঠান রাতারাতি ফুলে ফেঁপে উঠেছে। তাই, বিদেশি দাতারা আমাদের এনজিও বা চ্যারিটিগুলোর ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। তবে মোটা দাগে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে চ্যারিটির সুনাম খানিকটা কমে গেছে। এর অন্যতম কারণ বিশ^স্ততার আর স্বচ্ছতার অভাব। মানুষ তার কষ্টের টাকা অসৎ দাতব্য সংস্থাকে দিয়ে বারবার ঠকেছে। তাই, এ দেশে চ্যারিটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
তবে চ্যারিটি করার ক্ষেত্রে একটা অন্যতম অন্তরায় হচ্ছে দখলদারির রাজনীতি। বর্তমান সময়ের রাজনীতি এবং রাজনীতিকরা যেহেতু তীব্র ভাবমূর্তি সংকটে ভোগেন, তাই তারা সামাজিকভাবে স্বীকৃত সংগঠনগুলোর ভালো কাজের দখল নিতে চায়। রাজনীতিকরা অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্ন সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মধ্যে সুকৌশলে বিভাজনের রাজনীতি ঢুকিয়ে দেয়। এ কারণে অনেক সম্মিলিত চ্যারিটির কমিটি গঠনে দেখা দেয় বিবাদ। অভ্যন্তরীণ বিবাদে জড়িয়ে শেষ পর্যন্ত চ্যারিটি বিলুপ্ত হয়। আবার, বর্তমান সমাজে তথাকথিত গণ্যমান্য ব্যক্তিরা যেহেতু গড়পড়তায় সবাই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকে, তাই তাদের নিয়ে চ্যারিটির কাজ করতে গেলেও বিভিন্ন জটিলতা দেখা যায়। তারা চ্যারিটি আর তাদের পলিটিকসকে আলাদা রাখতে ব্যর্থ হন। উদাহরণস্বরূপ, দাতব্য সাহায্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করার ক্ষেত্রে তারা, তাদের দলীয় অনুসারীদের নাম ঢুকিয়ে দেন, এতে প্রকৃত অভাবী মানুষেরা সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়। করোনা মহামারীর সময় এমনটা দেখা গেছে বিভিন্ন স্থানে। কেউ কেউ রাজনৈতিক বিবেচনায় একাধিকবার সাহায্য পেয়েছে, আবার অনেক হতদরিদ্র তেমন কোনো সাহায্য পায়নি। এ দেশে রাজনীতির দখলদারিত্ব ও অসততা তাই চ্যারিটিকেও মুক্তি দেয়নি।
চ্যারিটি চালাতে গিয়ে রেজিস্টার্ড হলে খানিকটা সরকারি ও বেসরকারি সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে দেখা যায়, চ্যারিটি নিবন্ধন এত সহজ নয়। বাংলাদেশ সোসাইটিস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৮৬০ অনুযায়ী পদ্ধতিগতভাবে তো অনেক ফর্মালিটি আছে, সঙ্গে আছে কিছু বাস্তব জটিলতা। যেমন, সরকারি বিভিন্ন সংস্থা চ্যারিটির রেজিস্ট্রেশনের বিষয়ে অনেক তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে, এমনটা হওয়ার যথেষ্ট দরকার আছে। সরকার তো শুধু রাবার-স্ট্যাম্প মার্কা কোনো সংগঠনকে নিবন্ধন দেবে না। তবে সংগঠনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক মতাদর্শের অহেতুক চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে, অনেক কার্যকরী চ্যারিটি নিবন্ধন পেতে ব্যর্থ হয়। এমনটা মানবিক মানুষদের অনেকখানি নিরাশ করে।
যেকোনো চ্যারিটিকেই আসলে গ্রান্টেড হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। দাতব্য কাজ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারা কাজটি করছে তাদের বিবেচনায় রাখা। যে ব্যক্তির ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সে নিজেই নিজেকে সাহায্য করতে পারে না, সে সমাজের বঞ্চিত মানুষকে কীভাবে সাহায্য করবে? সঙ্গে সঙ্গে চ্যারিটির পেছনের উদ্দেশ্যটাও বোঝা উচিত। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিশেষ স্বার্থ চরিতার্থ করতে যদি চ্যারিটিকে একটা ইনস্ট্রুমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তেমন চ্যারিটি হতে নিরাপদ দূরত্বে থাকাই মঙ্গল। এরই সঙ্গে চ্যারিটি যেন ভুঁইফোঁড় বা দুর্নীতিবাজদের আশ্রয়স্থলে পরিণত না হয়। সরকার চ্যারিটিকে অবশ্যই পর্যবেক্ষণে রাখবে, কিন্তু অহেতুক কঠোরতা দেখাতে গিয়ে যেন স্বেচ্ছাসেবী বা দাতব্য কার্যক্রমগুলো শুরুতেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে না যায়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখা দরকার।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
