শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরে ১৯৫৬ সালের মেধাতালিকার প্রথম সিএসপি কাজী ফজলুর রহমানের সত্তরের প্রথমার্ধের ডায়েরি ২০০৩ সালে গ্রন্থাকারে ‘আশা ও ভগ্ন আশার দিনগুলো’ নামে মুদ্রিত হয়। তাকে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব করা হতে পারে এমন কথাও উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত হয়নি। ১৯৫৬ ব্যাচের ১০ জন বাঙালি হচ্ছেন : কাজী ফজলুর রহমান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, আবুল মাল আবদুল মুহিত, এ কে এম গোলাম রব্বানী, এ বি এম গোলাম মোস্তফা, এ এস এইচ কে সাদিক, এমকে আনোয়ার, মোহাম্মদ সাইদুজ্জামান, কে জি এম লতিফুল বারী, আনিসুজ্জামান। লেখাটির এই অংশে গ্রন্থ থেকে পরিকল্পনা কমিশন প্রাসঙ্গিক তার কিছু নোট তুলে ধরছি । একজন জ্যেষ্ঠ আমলা প্রথম পরিকল্পনা কমিশনকে কীভাবে দেখেছেন তা এতে প্রতিভাত:
১৫ জানুয়ারি ১৯৭২ : শুনেছিলাম আবুল এহসান সাহেবকে প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান করা হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু হলো না তারও। অর্থনীতিবিদ ড. নুরুল ইসলাম গেছেন সেই পদে।
১৭ জানুয়ারি ১৯৭২ : (প্ল্যানিং মিনিস্ট্রির সচিব করা হতে পারে এ কথা শোনার পর) প্ল্যানিং সচিব হিসেবে নিয়োগে আমার অনীহাই আছে। কমিশনে ভাইস চেয়ারম্যান আর সদস্যরা সবাই একেবারে হঠাৎ মন্ত্রী। এতজন বসকে নিয়ে কাজ করা কঠিন হবে। তার চেয়ে এই পদটাই ভালো ছিল। (এই পদটা মানে প্রেসিডেন্টের সচিব। প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরী তাকে চেয়েছেন, কিন্তু তাও হয়নি)
২১ জানুয়ারি ১৯৭২ : সকালে সেক্রেটারিয়েটে গিয়েছিলাম। প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যানের রুমটা সামনেই পড়ল। ঢুকে পড়লাম। একটু পরেই মোশাররফ (প্রফেসর মোশাররফ হোসেন, সদস্য) এলো। একেবারে জড়িয়ে ধরল। সত্যিই আমার সঙ্গে দেখা হওয়াতে সে আন্তরিকভাবেই খুশি। অন্য কোনো কথা হলো না! আজ ভিপি ধরের নেতৃত্বে একটা ভারতীয় মিশন এসেছে, তাদের সঙ্গে মিটিং। সবাই ব্যস্ত।
২২ জানুয়ারি ১৯৭২ : (ভারতীয় বাণিজ্য মিশনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ডিনারের আয়োজন করেছিলেন, তিনিও আমন্ত্রিত ছিলেন।)
না গেলেই বোধ হয় ভালো ছিল। (পরিকল্পনা) কমিশন সদস্য ড. মোশাররফ জানতে চাইলেন, সরকারি চাকরি করার ইচ্ছে আছে? জবাব দিলাম, ‘আপনারা নিলে তো?’ বললেন ‘কমিশনের সবারই ইচ্ছে ছিল তোমাকে প্ল্যানিং সেক্রেটারি হিসেবে (পাওয়া)। কথাটা শেখ সাহেবের কাছে পাড়াও হয়েছিল। তিনি নাকি বলেছেন হ্যাঁ ছেলেটা ভালোই ছিল। তবে জব্বার খানের ছেলে সাদেকের (খান) প্রভাবে আর ঠিক নাই। দেখা যাক।
অর্থাৎ সোজা অর্থে নাকচ করে দিয়েছেন। শেখ সাহেব ব্যক্তিগতভাবে আমাকে চেনেন না। নিঃসন্দেহে আমারই কোনো ‘বন্ধু’ তার কান ভারী করেছে।
মোশাররফ কথায় কথায় বলল, তাদের চেয়ারের মর্যাদা হয়েছে ছোট মন্ত্রী অর্থাৎ স্টেট মিনিস্টারের। কমিশনের থাকবে দশটা ডিভিশন, প্রতিটির প্রধান হবেন সচিব মর্যাদার। পাগলামো ছাড়া আর কী বলা যায়!
৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ : (কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবারগুলো পুনর্বাসনের বদলে কথার ফুলঝুরি) গণ্ডায় গণ্ডায় মন্ত্রী-সচিব শোভিত পরিকল্পনা কমিশন বসেছে, তারা দূরপাল্লার (Long Range) প্ল্যান তৈরি করছে, হিসাব করছে Input-output ratro, Opportunity! তাদের কাছে আপাত সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা কী করে আদায় করা যায়। দেশে ন্যূনতম আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে না পারলে ‘পরিকল্পনা’ যে কল্পনাবিলাসই হবে, এই কথাটা তারা বোঝেন না, বুঝতেও চান না।
১ মার্চ ১৯৭২ : মুহিতের সঙ্গে দেখা হলো আজ। তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল প্ল্যানিং সচিব পদে, যাতে এখন আছে রব্বানী। (মুহিত) যোগ দেবে না। চলে যাচ্ছে আমেরিকা। আবুল মাল আবদুল মুহিত তারই ব্যাচমেট। গোলাম রব্বানীও।
২৪ জুন ১৯৭২ : কাল রাতে মোশাররফের (প্ল্যানিং কমিশন সদস্য) বাসায় ডিনার ছিল। নিজেই এসে দাওয়াত করে গিয়েছিল। প্লানিং কমিশনের সবাই এম এন হুদা সাহেব, রাজ্জাক স্যার, সালাহউদ্দীন এরা সবাই ছিলেন।
১৬ আগস্ট ১৯৭২ : গত সন্ধ্যায় মুসা সাহেবের বাসায় দেখা হলো পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান প্রফেসর নূরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি কথায় কথায় বললেন, ব্যুরোক্রেটদের (অর্থাৎ ভূতপূর্ব সিএসপি) অসহযোগিতার জন্য কিছুই করা যাচ্ছে না। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আরও বললেন, এরা তাদের মধ্যে নিজেদের এক বছর সিনিয়র হলেই ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করে। অথচ কমিশনের সদস্য যাদের মর্যাদা মন্ত্রী তাদের স্যার বলতে রাজি নয়। তাদের জন্য উঠে দাঁড়ায় না, ডাকলে মিটিংয়ে আসে না, জুনিয়র কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে দেয়।
আমি না বলে পারলাম না যে মাননীয় সদস্যদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা সম্মানের যোগ্য। প্রফেসর সাহেবের ভাষ্যতেই যারা ‘পলিটিক্যাল অ্যাপয়েন্টি’– অতএব তাদের সমালোচনা সহ্য করার পলিটিক্যাল জ্ঞানও অর্জন করতে হবে। প্রফেসর সাহেব আরও দুঃখ করে বললেন, ‘আমলাদের চক্রান্তে পেশাজীবী এক্সপার্টদের ছয় মাসের মধ্যেই বেরিয়ে আসতে হবে’।
এক বছর তিন মাস পর ২১ মার্চ ১৯৭৪ লিখেছেন : ... এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম বাড়ছে হু হু করে। অর্থনীতি চরম বিপর্যস্ত। পরিকল্পনা কমিশনের পণ্ডিতরা তাদের আঁকড়ে বসে আছে আর ‘প্ল্যানিং প্ল্যানিং’ খেলছে। এর মধ্যে যদি দুর্ভাগ্যক্রমে শেখ সাহেবের কিছু হয়, তবে ষোলকলা পূর্ণ হবে। রক্ষীবাহিনীর মেশিনগানেও শান্তিরক্ষা করা যাবে না।
১৫ এপ্রিল ১৯৭৪ : গত সন্ধ্যায় আনিসুজ্জামানের বাসায় গিয়েছিলাম। বলল যে, দেশের আর্থিক কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা একেবারে ভেঙে পড়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি কেটে ছোট করে দেওয়া হচ্ছে সম্পদের ঘাটতিতে। আরও শুনলাম রেহমান সোবহান নাকি প্ল্যানিং থেকে পদত্যাগ করেছেন।
১৯ জুন ১৯৭৪ : দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চরম সংকটে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য-সাহায্য বন্ধ করে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা, বিভিন্ন সচিব ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দেশ-দেশান্তরে ঘুরছে, কিন্তু ফলাফল মনে হচ্ছে শূন্য। তাছাড়া তেল নিয়ে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংকটে আমাদেরও সমস্যা বাড়ছে। বাজেটে কী কী ট্যাক্স বাড়বে, উন্নয়ন কর্মসূচিতে কী কাটছাঁট হবে তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা।
৫ জুলাই ১৯৭৪ : অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে ‘সমাজতন্ত্র’ ক্রমঅপসৃয়মান। বেসরকারি বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা শুনছি অনেক বাড়ানো হচ্ছে এমনকি একেবারেই তুলে দেওয়া হতে পারে। বিদেশিরা যাতে দেশীয় বেসরকারি খাতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে পারে সেই ব্যবস্থা নাকি হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের শখের সমাজতন্ত্রীরা এখন কী করে মুখ দেখাবে? এই নীতিগত পরিবর্তনটা যে করতে হবে জানতাম। তবে করা হচ্ছে অনেক ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর অনেক জল ঘোলা করে।
ঢাকা সফরে আসছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ গুস্তাফ পাপানেক। তার স্থানীয় কর্মসূচি ঠিক করার দায়িত্ব পরিকল্পনা কমিশন সদস্য মোশাররফ হোসেনের। কাজী ফজলুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তিনি পাপানেককে ডিনারে আমন্ত্রণ জানাতে চান, তাই তারিখ ঠিক করতে পরিকল্পনা কমিশনে গেলেন।
১৯ জুলাই ১৯৭৪ : ডায়েরিতে লিখছেন, অনেক কথা হলো তার (মোশাররফ) সঙ্গে। বলল, রেহমান সোবহান কমিশন সদস্যপদ ত্যাগ করছেন। অতি সৎ ও বিদ্বান লোকটা, কিন্তু ব্যবহারিক ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তাত্ত্বিক বিদ্যা প্রয়োগ করতে গিয়ে দেশের শিল্পক্ষেত্রে বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করেছে।
২ আগস্ট ১৯৭৪ : পাপানেককে পরশু বাসায় ডিনারে ডেকেছিলাম। উপস্থিত ছিলেন রাজ্জাক স্যার, মোশাররফ, ড. নূরুল ইসলাম (পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান), ড. ওয়াহিদুল হক, ড. রওনক জামান এবং পাপানেকের বিশেষ পরিচিত আরও দু-একজন।
ড. নূরুল ইসলাম বেশ আন্তরিকতার সঙ্গেই কথাবার্তা বললেন। অভিযোগ করলেন, সবাই দেশের বর্তমান অবস্থার জন্য অকারণে সব দোষ প্ল্যানিং কমিশনের ওপর চাপাচ্ছে। দেশের শাসনযন্ত্র বিকল্প ক্ষমতাধারীদের কাউকে কিছু বোঝানো যায় না কমিশন কী করবে। নেহাৎ মেহমান বলে কথাটা বলা হয়নি দেশের শাসনযন্ত্রকে বিকল্প করার ক্ষেত্রে কমিশনের কি কিছু অবদান ছিল? মনে হলো কেটে পড়ার চিন্তাটা তার মনে আছে, তবে ক্ষমতা আর পদের মোহ ছাড়তে পারছেন না।
৮ আগস্ট ১৯৭৪ : বিকেলে গেলাম গণভবনে। অনেক কথা হলো ড. সাত্তারের সঙ্গে। জানান, রেহমান সোবহানের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে। সম্ভাব্য মেম্বারের জন্য বিভিন্ন লোক সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চাইল। জানতে চাইল আমি সচিবের মর্যাদায় মেম্বার হতে রাজি কিনা। বললাম, আপত্তি নেই।
১১ আগস্ট ১৯৭৪ : আজ সকালে দেখা হয়েছিল এ কে এম আহসান সাহেবের সঙ্গে। পাকিস্তান সরকারের আমলে যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাঙালি কেন্দ্রীয় সচিব হয়েছিলেন, তাদের অন্যতম। সুযোগ্য অফিসার ও চমৎকার মানুষ... তিনি দেখলাম হতাশা ও তিক্ততায় জর্জরিত। এত সিনিয়রিটি নিয়ে তাকে ড. নূরুল ইসলামের অধীনে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য করে রাখা হয়েছে। তার মুখে শুনলাম এই ডেপুটি চেয়ারম্যানের ক্ষমতালিপ্সা, নির্লজ্জ চাটুকারিতার কথা। বললেন, অকারণে তাকে অপমান করা হচ্ছে প্রতিদিন। অক্টোবরে ছুটিতে যাচ্ছেন। বোধ হয় তারপর স্বেচ্ছা অবসরে।
৪ জানুয়ারি ১৯৭৫ : শুনলাম পরিকল্পনা কমিশনে প্রধান নূরুল ইসলাম নাকি পদত্যাগ করেছেন।
এই ডায়েরি গ্রন্থাকারে কুড়ি বছর আগে প্রকাশিত। বিভিন্ন বিষয় এতে উঠে এলেও এই লেখাটিতে পরিকল্পনা কমিশন বিষয়ক কিছু নোট হুবহু তুলে আনা হয়েছে। এসব কথার উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিবাদ চোখে পড়েনি। পরিকল্পনা কমিশন থেকে একে একে পদত্যাগ করেছেন তিন সদস্য : অধ্যাপক আনিসুর রহমান, অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন, অধ্যাপক রেহমান সোবহান। আর ডেপুটি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নূরুল ইসলাম চিকিৎসার অজুহাত দেখিয়ে ছুটি চেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু তাকে ১৯৭৫-এর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরের ছুটি মঞ্জুর করেছেন। তিনি আর রাষ্ট্রীয় কাজে ফিরে আসেননি।
লেখক: সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট
