সংস্কার আরও বেশি প্রাসঙ্গিক

আপডেট : ২৩ মে ২০২৩, ১০:০০ পিএম

গত বছর সবার জন্যই বেশ কষ্টকর ছিল। দেশের অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে লাগাম টানতে হয়েছে। খরচ কমানো ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলেন অপচয় কমালেই যথেষ্ট, সবক্ষেত্রে খরচ কমানোর দরকার নেই, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে যা যা যুক্ত সেখানে কাটছাঁট করার যুক্তি কী? বেশ কিছুদিন ধরে মুদ্রাস্ফীতির চাপে পড়ে সাধারণ মানুষের যে ত্রাহি অবস্থা তা কারও কাছে অজানা নয়। এই বেসামাল অবস্থা এখনো অব্যাহত আছে তবে কবে শেষ হবে তার কোনো আশু উত্তর নেই। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার নতুন অর্থবছরের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে। করোনার শুরু থেকেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক দুরবস্থার শুরু, সেই অবস্থা থেকে আড়মোড়া ভাঙলেও সমস্যার বৃত্ত ভেদ করে বের হয়ে আসতে পারেনি। ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে সাধারণ মানুষের সক্ষমতা কমেছে অনেকটা, আর তার প্রভাব পড়ছে তাদের জীবনযাত্রার মানের অবনমনে। সরকার বলছে টাকার অঙ্কে মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু ডলারের হিসাবে কমেছে! এটাই তো বলে দেয় সাধারণ মানুষ কোথায় আছে এবং কীভাবে পরিস্থিতি সামলাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন যে মানুষের আয় যেমন বাড়ছে না একইভাবে মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রক্রিয়াও থমকে আছে।

শ্রম জরিপ ২০২২ অনুযায়ী বাংলাদেশে বেকারত্বের সংখ্যা ২৬ লাখ ৩০ হাজার। বিবিএস-এর এ বছরের প্রথম প্রান্তিকের পরিসংখ্যান বলছে গত বছরের সর্বশেষ প্রান্তিকের তুলনায় বেকারত্ব কিছুটা বেড়েছে। আবার বেকারত্বের সংজ্ঞা নিয়ে আছে মহাবিতর্ক। প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করলেই বেকারত্বের খাতা থেকে নাম কেটে দেওয়া আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কতটা যুক্তিযুক্ত? মাসে চার ঘণ্টা কাজ করে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সামান্য অংশও নির্বাহ করা এদেশে আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া আর কী? আবার ১৭ কোটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১৫ বা তদূর্ধ্ব বয়সী শ্রমশক্তির বাইরে রয়েছে এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪ কোটি ৬৯ লাখ, এরা কারা? এদের নিয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী?

বর্তমান অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রা সংস্থানের অস্থিতিশীলতা মাঝে মাঝেই আশঙ্কার কারণ হয়ে উঠছে। আমাদের দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান হয় মূলত অদক্ষ, আধাদক্ষ, শিল্পশ্রমিক ও প্রবাসী শ্রমিকদের হাড়ভাঙা খাটুনি থেকে। এই সব শ্রমিকের অনেকেই পরবর্তী সময়ে কর্মসংস্থানের সংকটসহ বিভিন্ন ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়। তাই এই খাতের শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, শোভন কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের দাবি রাখে।

নতুন পরিস্থিতিতে বাজেট তৈরি শুধু বাৎসরিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনাই না এর সঙ্গে উন্নয়নের দর্শন নির্ধারণ করাটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটের মাধ্যমে সরকার শুধু উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিচালনা, লেনদেনের ভারসাম্যই নিশ্চিত করে না এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তাসহ অন্যান্য মৌলিক বিষয়সমূহ। তাই বাজেট ঘোষণা নিয়ে সবাই আগ্রহভরে অপেক্ষা করে। প্রতিবার বাজেট এলেই স্বার্থসংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোর মধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়, কর কমানোর জন্য বা তথাকথিত ব্যবসা বাঁচানোর জন্য। কেউ কেউ আবার একধাপ এগিয়ে শুধু ব্যবসা বাঁচানোই নয় দেশের অর্থনীতি বাঁচানোর কথা বলে থাকেন। অথচ বাজেটের আগে সাধারণ জনগণ বিশেষকরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দাবি উত্থাপনের কোনো সুযোগ কই? তবে বাজেট থেকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশাও অনেক। আর তা হচ্ছে ভদ্রস্থ জীবনযাপনের অধিকারের নিশ্চয়তা, জীবনযাপনের জন্য অতি প্রয়োজনীয় উপকরণসমূহ নাগালের মধ্যে পাওয়া, কৃষিতে সুযোগ-সুবিধা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও দক্ষতার বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি, শোভন কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা এবং অবশ্যই যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশের অংশ হতে পারা ইত্যাদি। পাশাপাশি বাজেট প্রণয়নের সময় প্রতি বছর আরেকটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে, সরকার মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি যে পরিকল্পনাগুলো গ্রহণ করেছে তার প্রতিফলন কতটুকু ঘটছে? অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০২১-২৫) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এবারের অগ্রাধিকার কী? একই কথা প্রযোজ্য মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধ পরিকল্পনা (২০২২-৪১), জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (২০২৩-৫০) এবং প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-৪১) ইত্যাদি সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। বর্তমান আর্থিক ভিত্তি ও সংকটের সময় এত কিছু যে করা সম্ভব হবে না তা সহজেই অনুমেয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই কৃচ্ছ্রের মধ্যে প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারা। আর এই অগ্রাধিকার নির্ধারণ করার জন্যই বাজেটের দর্শনগত দিক সম্পর্কিত প্রশ্ন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

অন্যদিকে বাজেট এলেই আমরা প্রায়ই শুনে থাকি এবারের বাজেট উচ্চাভিলাষী। আসলে বর্তমান অবস্থায় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা যতটা উচ্চাভিলাষী হওয়া দরকার তার থেকে বেশি দরকার প্রথা ভাঙার সংস্কৃতি তৈরি করা। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে না বরঞ্চ সীমিত সম্পদের অপচয় ত্বরান্বিত করে। যদিও আর্থিক ব্যবস্থায় সংস্কারের বিষয়টি সবসময় আমাদের আলোচনায় উঠে আসে। তাই সার্বিক বিবেচনায় এবারের বাজেট হওয়া উচিত সংস্কারের বাজেট। যে সংস্কার প্রক্রিয়ায় আমরা দেখতে পাব অপচয়ের সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়েছে, বাজেটের অগ্রাধিকার ঠিক করার মাধ্যমে মানসম্পন্ন বাস্তবায়ন নিশ্চিত হচ্ছে, ক্ষমতাবানদের কর ফাঁকি দেওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকছে না, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, হতদরিদ্ররা মোটামুটি খেয়ে-পরে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছে এবং সর্বোপরি ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে আনতে সত্যিকারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

যদিও তথ্য বলছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। সর্বশেষ খানার আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী ২০১৬ এর তুলনায় শহরাঞ্চলে অসমতা বেড়েছে ৭.৮৮ শতাংশ যা আসলে দরিদ্র-পীড়িত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার প্রশ্নে শহরান্তরী হওয়াকে সামনে নিয়ে আসছে। একই সঙ্গে একটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য অধিকহারে ও প্রয়োজনীয় মাত্রায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। যদিও সামাজিক নিরাপত্তা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সম্পদের সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করা হয়। তবে সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী দেশে কর ফাঁকি রোধ করা গেলে ৫৫,৮০০ কোটি থেকে ২৯২,৫০০ কোটি পর্যন্ত অতিরিক্ত কর আদায় করা সম্ভব। অন্যদিকে সিপিডির আরেকটা বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ভাতা ইত্যাদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সংস্থান করতে অতিরিক্ত আরও ৪৩০০ কোটি দরকার। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত সারা পৃথিবীর মধ্যে কম অনুপাত দেশগুলোর মধ্যে একটি।

প্রতি বছর বাজেট প্রণয়নকালে আমরা সবসময়ই শুনে থাকি যে এই বাজেট সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে, মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনবে, অর্থনীতির মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবে, গ্রামীণ অর্থনীতির মধ্যে গতিশীলতা নিয়ে আসবে ইত্যাদি আরও অনেক কিছ্।ু কিন্তু আমরা কোনোভাবেই যেন ‘চুইয়ে পড়া’ উন্নয়ন মডেল থেকে বের হয়ে আসতে পারছি না। ‘চুইয়ে পড়া’ নীতি আমাদের মতো দেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বাস্তবতায়, যেখানে মুনাফার তোষণ ও শোষণ মোটামুটি স্বীকৃত, এটি ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে কেবল বৈষম্যই বাড়িয়ে দেয়। এখানেই সংস্কার কার্যক্রম আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমাদের অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ নেই কিন্তু যা আছে তা হচ্ছে মানবসম্পদ সেখানেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগটা গ্রহণ করা দরকার। এখন দেখার বিষয় ২০২৩-২৪ প্রচলিত বাজেটের প্রচলিত কাঠামোর বৃত্ত কতটুকু ভাঙতে পারবে এবং নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাতে পারে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত