৬ বছরেও পরোয়ানা পৌঁছেনি থানায়

আপডেট : ২৫ মে ২০২৩, ০৬:৩৫ এএম

স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে আবু আহমদের বিরুদ্ধে নগরের কোতোয়ালি থানায় দায়ের হওয়া চোরাচালান মামলায় ২০১৮ সালের ২৮ মে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। কিন্তু এই পরোয়ানা সংশ্লিষ্ট থানায় প্রায় ছয় বছরেও পৌঁছায়নি। মামলার আসামি হয়েও ছয় বছর অধরাই থাকলেন আবু আহমদ। এখানেই শেষ নয়, একই থানায় ২০২০ সালে সিআইডির করা অর্থ পাচারের মামলায় আবুকে জামিন না দিয়ে গত ৮ জানুয়ারি পুলিশের কাছে সোপর্দ করে হাইকোর্ট। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে তিন মাস বন্দি থাকার পর হাইকোর্টের আদেশে ১০ এপ্রিল জামিনে মুক্তি পান তিনি। অথচ এর একদিন পরেই হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশ বাতিল করেন আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত। কিন্তু তারপর আর গ্রেপ্তার হননি আবু।

১০ এপ্রিল আবু আহমদকে মুক্তি দেওয়া প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেলা সুপার মঞ্জুর হোসেন বলেন, ‘আমাদের কাছে অন্য কোনো মামলায় আবু আহমদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকার তথ্য ছিল না। উচ্চ আদালতের আদেশ পেয়ে যাচাই-বাছাই করে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।’

সিআইডির করা অর্থ পাচারের মামলায় গত ৬ এপ্রিল আবু আহমদকে জামিন দেন হাইকোর্টের বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিনের বেঞ্চ। ১১ এপ্রিল ওই মামলায় তাকে হাইকোটের্র দেওয়া জামিন স্থগিত করে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত। কিন্তু রহস্যজনক কারণে আদেশটি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছায়নি যথাসময়ে। জামিন বাতিলের আদেশটি পৌঁছানোর আগেই কারাগার থেকে বেরিয়ে যান আবু।

জানা গেছে, আবু আহমদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় হওয়া চোরাচালান মামলার বিচারকাজ চলছে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ চতুর্থ আদালতে। এ আদালতের বেঞ্চ সহকারী ওমর ফুয়াদ জানান, আবুর বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ২৮ মে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। সেটি সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানো হয়েছে। অর্থপাচার মামলায় তিন মাস কারাবন্দি থাকা অবস্থায় আবুকে স্ব^র্ণ চোরাচালান মামলায় গ্রেপ্তার না দেখানোর বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের কৌঁসুলি আবদুর রশীদ বলেন, ‘বিষয়টি এমন হয়ে থাকলে বেআইনি হয়েছে। আমি এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেব।’

এদিকে আবু আহমদসহ তিনজনের বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালান মামলায় প্রায় ছয় বছর আগে আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় পৌঁছেনি বলে জানিয়েছেন পাঁচলাইশ থানার ওসি নাজিম উদ্দিন মজুমদার। তবে এই থানার এসআই দীপক জানিয়েছেন, আবু আহমদের বিরুদ্ধে ঢাকার পল্টন থানায় দায়ের হওয়া স্বর্ণ চোরাচালান মামলায় একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে তাদের থানায়। তবে ওই পরোয়ানা এখনো তামিল হয়নি।

আবু আহমদের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানাধীন জাফরনগর এলাকার মহৎ আলী সারাং বাড়িতে। তার বাবার নাম হাজি ফয়েজ আহমদ। তার বর্তমান ঠিকানা পাঁচলাইশ থানাধীন পশ্চিম ষোলশহর হিলভিউ আবাসিক এলাকা (রোড নম্বর ৬, বাসা নম্বর ৮৩)। আবু আহমদকে গ্রেপ্তার করা প্রসঙ্গে পাঁচলাইশ থানার ওসি নাজিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তার হিলভিউ আবাসিকের বাসায় পুলিশ একাধিবার অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু তিনি বাসায় থাকেন না। অর্থপাচার মামলায় তিনি তিন মাস কারাবন্দি থাকার বিষয়টি আমাদের জানা নেই।’ একইভাবে আবুর বিরুদ্ধে থানায় কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নেই বলে জানিয়েছেন ফটিকছড়ি থানার ওসি কাজী মাসুদ ইবনে আজাদ।

২০১৬ সালের ২৫ জানুয়ারি রাতে নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারের ভেতরের বাহার মার্কেটের ষষ্ঠ তলার দুটি কক্ষে অভিযান চালিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তিনটি সিন্দুক জব্দ করে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে সেগুলো থানায় নিয়ে খোলা হয়। তিনটি সিন্দুকের মধ্যে একটিতে ২৫০টি স্বর্ণের বার পাওয়া যায়। আরেকটি সিন্দুকে পাওয়া যায় ৬০ লাখ টাকা। অপর সিন্দুকটি খালি ছিল। এই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার।

২৫০ পিস স্বর্ণের বার উদ্ধার ঘটনায় নগরের কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন মহানগর ডিবি (উত্তর) পুলিশের তৎকালীন এসআই বর্তমানে পরিদর্শক আফতাব আহমেদ। এতে আবু আহমদের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় তিন-চারজনকে আসামি করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আবু আহমদের চাচাতো ভাই এনামুল হককে ২০১৬ সালের ১১ মে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০১৬ সালের ২৩ জুন হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্তি পান এনামুল হক। এ মামলায় ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট উচ্চ আদালত থেকে চার সপ্তাহের আগাম জামিন নেন আবু আহমদ। হাইকোর্টের নির্দেশ মোতাবেক আবু আহমদ নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ না করায় ২০১৮ সালের ৫ মে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

এদিকে তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ৬ জুন চোরাচালান মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মহানগর ডিবির (উত্তর) তৎকালীন পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান। এ মামলার ঘটনায় নিজাম উদ্দীন নামে আরও একজনের সম্পৃক্ততা পায় তদন্ত সংস্থা। অভিযোগপত্রে আবু আহমদসহ তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়। তিন আসামির বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ১০ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত। মামলায় বাদীসহ মোট সাক্ষী করা হয় ৩৬ জনকে।

২০২২ সালের ৮ আগস্ট বিচারের জন্য মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে কোতোয়ালি থানায় মামলা আসে অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ (চতুর্থ) শরীফুল আলম ভূঞার আদালতে। মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের প্রথম ধার্য তারিখ ছিল ২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি। আদালত সূত্র জানায়, কোতোয়ালি থানায় মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখ ৪ জুলাই। তিন আসামির মধ্যে আবু আহমদ ও নিজাম উদ্দিন পলাতক আছেন। আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন আসামি এনামুল হক এনাম ওরফে নাঈম। মামলার মোট সাক্ষী ৩৬ জনের সাক্ষীর মধ্যে গত প্রায় দেড় বছরে সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র একজন। এই সাক্ষ্যদাতা হলেন মামলার বাদী পুলিশ পরিদর্শক আফতাব আহমেদ। 

জানা গেছে, ২০২০ সালের ১৮ মার্চ সিআইডির উপপুলিশ পরিদর্শক মো. হারুন উর রশীদ আবু আহমদ ওরফে আবুসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগে নগরের কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে আসামিরা সংঘবদ্ধ হুন্ডি (অর্থপাচার), স্বর্ণ চোরাচালান, চোরাই ও অন্যান্য দ্রব্যের অবৈধ ব্যবসার সর্বমোট ২০৪ কোটি ৩৭ লাখ ৪৫ হাজার ৮৮৭ টাকা জমা এবং ২৪০ কোটি পাঁচ লাখ ১২ হাজার ১৬০ টাকা উত্তোলন করে মানি লন্ডারিং অর্থাৎ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর ২০৪ কোটি টাকা অর্থ পাচারের ওই মামলায় আবু আহমদ হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন। ৬ ডিসেম্বর তাকে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয় হাইকোর্ট। প্রতারণার দায়ে গত ৮ জানুয়ারি ২০৪ কোটি টাকা অর্থ পাচারের মামলায় আবু আহমদকে জামিন না দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চ। পরে তাকে শাহবাগ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।

জানা গেছে, ফটিকছড়ি উপজেলার ধর্মপুর ও জাহানপুর এলাকায় ২৪টি দলিলমূলে কেনা বহু জমি, নগরের কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার ৩৩ নম্বর প্লটে ১৬ কাঠার প্লট ছাড়াও পাঁচলাইশ হিলভিউ আবাসিক এলাকার পাঁচতলা নিরিবিলি ভবন এবং চান্দগাঁওয়ে ছয়তলা বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক বাড়ি রয়েছে তার। অন্যদিকে রাউজানের ফতেহনগর এলাকায় পল্লীকানন ও পল্লীশোভা কনভেনশন হল, ফটিকছড়ির ফতেহপুরে দৃষ্টিনন্দন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তিনতলা বাড়ি, জাহানারা ম্যানশন, নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারে দুটি, স্যানমার ওশান সিটিতে একটি দোকান ছাড়াও দুবাইয়ে অন্তত তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পেয়েছে সিআইডি।

প্রসঙ্গত, এই আবুর বিরুদ্ধে ঢাকার বিমানবন্দর থানায় ৯০৪টি স্বর্ণের বার উদ্ধার মামলা এবং পল্টন থানায় রয়েছে ৫২৮টি স্বর্ণের বার উদ্ধার মামলা।

অপরাধ বিশ্লেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘স্বর্ণ চোরাচালানি আবু আহমদ একজন বড় মাপের অপরাধী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে যে কোনো অপরাধীর আপডেট প্রোফাইল থাকা বাঞ্ছনীয়। ক্লিক করলেই যাতে সংশ্লিষ্ট অপরাধীর আমলনামা বেরিয়ে আসে। কারাবন্দি থাকা অবস্থায় আবু আহমদকে কোতোয়ালি থানার চোরাচালান মামলায় গ্রেপ্তার না দেখিয়ে তাকে কারাগার থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার দায় আছে পুলিশের ও রাষ্ট্রের।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত