মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পরিবারে মূল্যবোধ চর্চা ও আর্থিক পরিকল্পনা

আপডেট : ২৫ মে ২০২৩, ১০:৩৬ পিএম

পরিবারকে বলা হয়, বৃহৎ সমাজের সংক্ষিপ্ত পরিসর। ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবার একটি আলোকিত দর্পণ। যেখানে ফুটে ওঠে ইসলামের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শ। ফলে বিরাজ করে শান্তি ও ভালোবাসা। যে পরিবারে ইসলামের শিক্ষা নেই, সেখানে শান্তি ও ভালোবাসা নেই। তাই পরিবার গঠনে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হচ্ছে, পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সঙ্গে ন্যায় ও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করা। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা তাদের সঙ্গে সুন্দরভাবে বসবাস করো।’ সুরা আন নিসা : ১৯

বর্ণিত আয়াতের শিক্ষা হলো স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে উত্তম কথা বলা। কথায়, কাজে, চলাফেরায় সৌন্দর্য রক্ষা করা। যেমন ব্যবহার আপনি তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন, তেমন ব্যবহার করা। হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে উত্তম হলো ওই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে উত্তম।’ জামে তিরমিজি : ৩৮৯৫

নবী কারিম (সা.)-এর চারিত্রিক সৌন্দর্যের মধ্যে এটাও ছিল যে, তিনি সদাহাস্য সুন্দর ব্যবহার করতেন। পরিবারের সঙ্গে হাস্যরস, নরম ব্যবহার ইত্যাদি করতেন। হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে কখনো কখনো দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন। সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮

ইসলামের সুমহান আদর্শ ও শিক্ষা পালন সুখি পরিবারের উপকরণ বিশেষ। এর মাধ্যমে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দবোধে ভরপুর হবে পরিবার, পরস্পরে তৈরি হবে সুদৃঢ় বন্ধন। পরিবারগুলো এই সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে অশিক্ষা, দায়িত্বহীনতার পাশাপাশি মুসলিম ঐতিহ্য ভুলে যাওয়া, মূল্যবোধহীন জীবনাচার এবং অভাব-অনটনসহ নানাবিধ সংকট পরিবারগুলোর জন্য প্রধান হুমকি। এমতাবস্থায় পরিবারগুলোকে রক্ষা করতে মুসলিম ঐতিহ্য অবলম্বনের পাশাপাশি, মূল্যবোধ চর্চা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে জোরদার করতে হবে। এগুলো হচ্ছে পরস্পরের পরিপূরক ও অপরিহার্য অংশ।

ইসলামি স্কলারদের মতে, পরিবারগুলোকে মূল্যবোধ, দয়া ও ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার কেন্দ্রস্থল বানাতে হবে। ইসলাম সর্বাবস্থায় তালাক, সন্তানহীনতা ও দাম্পত্য কলহের মতো নানা জটিল সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা এবং সন্তানদের প্রয়োজনীয় বিষয়ে দক্ষতা শেখানোর ওপর জোর দিয়েছে। এক কথায়, ইসলাম পরিবার ও পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষার বিষয়ে সচেতন।

হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, ‘আপনি যদি আপনার স্বামী বা স্ত্রীকে সম্মান করেন, তাহলে আপনি তার আস্থা অর্জন করবেন এবং এরই সূত্রে আপনি তার আনুগত্য পাবেন। ফলে উভয়ই প্রশান্তি, প্রফুল্লতা ও সাফল্য অর্জন করবেন।’

আদর্শ পরিবারের বৈশিষ্ট্য হলো এমন পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের প্রতি সহৃদয় থাকেন। বলা হয়, পরিবারের সদস্যরা যদি পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে একত্রে বসে, তাহলে তার সওয়াব মসজিদে নফল ইতিকাফের চেয়েও বেশি। এমন পরিবারের সদস্যরা যখন পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেন, তখন তাতে থাকবে সততা, স্পষ্টতা ও আন্তরিকতা। তারা পরস্পরকে ভালো কাজে উৎসাহ দেন ও মন্দ কাজে নিরুৎসাহিত করেন।

পারিবারিক প্রেক্ষাপটে কয়েকটি ভালো কাজ হলো আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ও তাদের খোঁজখবর নেওয়া, বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য সচেষ্ট থাকা এবং ধর্মীয় বিষয় অনুসরণ ও পালনে উৎসাহ দেওয়া। কোনো পরিবারের যখন এসব বৈশিষ্ট্য উপস্থিত থাকবে, তখন সেখানে সামান্য ও অর্থহীন বিষয় নিয়ে কথা বলার সুযোগ হবে না, বরং তারা পরস্পরকে সবসময় কল্যাণ ও সুন্দর বিষয়ের দিকে পথপ্রদর্শন করবেন।

আদর্শ পরিবারে কেউ কাউকে কোনো বিষয়ে উপদেশ দেওয়ার আগে তাকে কাজের মাধ্যমে ওই বিষয়ের অগ্রপথিক হতে হয়। আপনি যদি আচার-আচরণে সুশীল হন তখন অন্যরা স্বাভাবিকভাবেই আপনার অনুসারী হবেন। আপনি নিজে যদি সুশীল না হয়ে পরিবারের অন্যদের সুশীল হওয়ার উপদেশ দেন তাতে কাজ হবে না। ইমাম গাজালী (রহ.) বলেন, ‘পরিবারে অতিরিক্ত মাত্রায় উপদেশ প্রদান অন্যদের মধ্যে বিরক্তি সৃষ্টি করে এবং এতে অন্যরা আপনার অনুগতও হবেন না।’

যে পরিবারে এমন সূক্ষ্ম বিষয়ের চর্চা হয়, ওই পরিবারের সদস্যরা সবসময় জ্ঞানার্জন ও ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধিতে সক্রিয় হন; যাতে তারা পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যেতে পারেন। এমন পরিবারের সদস্যরা সব কাজ করেন সচেতনতা নিয়ে এবং পরিবারের অন্যদের জীবন ও পরিবারবিষয়ক জ্ঞানার্জনের পথে উৎসাহ দেন। এ ক্ষেত্রে জ্ঞানী ও ধার্মিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা উচিত, যাতে পরিবারের সবার ইমান জোরালো হয় এবং তারা জীবন সম্পর্কে অনেক ভালো দক্ষতা অর্জন করেন।

ইসলামি স্কলারদের মতে, দাম্পত্য জীবনে সফল হতে হলে পারিবারিক সব বিষয়ে পরিকল্পনা থাকতে হবে। আগামীকালও যাতে আপনি স্ত্রী বা স্বামীর কাছে ভালো থাকেন সে জন্য আজ যা যা করার দরকার, সেসব করতে হবে পরিকল্পনামাফিক। এভাবে আগামী ৫ বছরের জন্য স্ত্রী-স্বামীর পরস্পরে ভালো সহযোগী হতে পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। অর্থনৈতিক বিষয়ে, সাশ্রয়ের বিষয়ে, জীবিকা ও আয়-উপার্জনের বিষয়ে, জীবনযাপনের বিষয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নে স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের সহযোগিতা জরুরি। সামর্থ্য এবং সাধ্যের আলোকে পরিকল্পনা করা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোকে স্বল্পসময়ের পরিকল্পনায় ভাগ করে নেওয়া। ধরুন তিন বছরে যা যা অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে, সেই লক্ষ্যের আলোকে প্রতি বছরে ও প্রতি মাসে আপনাকে যা যা করতে হবে তা ঠিক করে নিন। এভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হয়ে যাবে।

ইসলামের শিক্ষা হলো মানুষের প্রতি দয়ার্দ্র, আন্তরিক, ক্ষমাশীল ও সহানুভূতিশীল হোন। যদি মানুষের প্রতি সহৃদয় হন দেখবেন মানুষ আপনার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে চারপাশে জড়ো হচ্ছে। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে এসব গুণ ছিল বলেই তিনি সহজেই মানুষদের আকৃষ্ট করতে পারতেন। নবীর উম্মত হিসেবে এই গুণ অর্জনের জন্য সবার চেষ্টা করা দরকার। আর এটা শুরুর প্রথম পর্যায় হলো পরিবার। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণে প্রতিটি পরিবারে এ বিষয়ের চর্চা হলে পারিবারিক অশান্তি অনেকটাই কমে যাবে। সন্তানের বখে যাওয়ার প্রবণতা কমবে। সমাজে নেমে আসবে শান্তির সুবাতাস।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত