স্কুলের পেন্সিল থেকে বিশ্বক্যানভাসে

আপডেট : ২৮ মে ২০২৩, ০৬:১৫ এএম

১৯৩৩ সালের কিছু আগের কথা। তখনো মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেননি জয়নুল আবেদিন। স্কুলে ক্লাস চলছে, হেডমাস্টার পড়াচ্ছেন। ছাত্রদের মনোযোগ স্যারের দিকে, শুধু একজন ছাত্র তাকিয়ে আছে শ্রেণিকক্ষের জানালা দিয়ে বাইরে। স্যার বেশ কিছুক্ষণ খেয়াল করে দেখলেন ছেলেটি বাইরে তাকাচ্ছে এবং তা দেখে কলম দিয়ে বইতে কিছু আঁকছে। তিনি বইটি চেয়ে নিলেন।

স্যার বইতে যা দেখলেন তাতে তিনি বিস্ময়ে হতবাক। স্যার বই ফেরত দিলেন না, ছাত্রটি ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। ভয়ে সে স্কুলে আসাই বন্ধ করে দিল। বেশ কিছুদিন তাকে ক্লাসে অনুপস্থিত দেখে স্যার নিজেই ছাত্রের বাড়িতে খুঁজতে চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে স্যার জানতে পারেন, ছাত্রটি প্রতিদিনই বাড়ি থেকে স্কুলের সময় বের হয় আবার স্কুল ছুটির সময় ফিরে আসে। স্যারের তখন বুঝতে আর কিছু বাকি রইল না। সেদিনের ক্লাসের ঘটনা ছাত্রের বাবা-মায়ের কাছে খুলে বলে বইটি ফেরত দিলেন। ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, ‘আপনাদের ছেলে এক দিন অনেক বড় শিল্পী হবে।’ এমন ছোটবেলা আর কারই বা হতে পারে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ছাড়া?

জন্মেছিলেন জয়নুল ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ মহুকুমার কেন্দুয়াতে ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর। বাবা তমিজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন পুলিশের দারোগা, মা জয়নাবুন্নেছা গৃহিণী। ৯ ভাইবোনের মধ্যে জয়নুল আবেদিন ছিলেন সবার বড়। পড়াশোনায় হাতেখড়ি পরিবারের অভ্যন্তরীণ পরিমণ্ডলেই। ছবি আঁকার প্রতি অদম্য আগ্রহে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ দেখতে চলে যান। ছবি আঁকার প্রতি এই ভালোবাসা দেখে মা নিজের গয়না বিক্রি করে ছেলেকে ভর্তি করেন সেখানে। প্রতিভাধর জয়নুলকে বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। ১৯৩৮ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের ড্রয়িং আ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগ থেকে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর তিনি নিখিল ভারত চিত্র প্রদর্শনীতে ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়ে আঁকা তার একগুচ্ছ জলরং ছবির জন্য গভর্নরের স্বর্ণপদক লাভ করেন।

১৯৪৩ সালের দিকে তিনি ময়মনসিংহে তার নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। পৃথিবী জুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর বাংলায় তখন ‘তেতাল্লিশের মন্বন্তর’। কলকাতায় দুর্ভিক্ষের প্রকোপ প্রত্যক্ষ করে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন জয়নুল। ময়মনসিংহ এসে দেখেন আরও ভয়াবহ অবস্থা। আবার চলে গেলেন কলকাতায়। কিন্তু সেখানে যে তার জন্য আরও ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে তা তিনি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেননি। অনাহারে, অসুস্থতায় হতভাগা মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মারা যেতে থাকে, কলকাতার ফুটপাত ভরে ওঠে খাদ্যাভাবে মৃত মানুষের স্তূপাকার লাশে। ডাস্টবিন থেকে মানুষ আর কুকুরের একসঙ্গে খাবার তুলে খাওয়ার দৃশ্য।

আর্ট কলেজের তরুণ শিক্ষক, যার বুকে দেশপ্রেমের আগুন। তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। মানবতার এত বড় অপমান, ইতিহাসের এই কলঙ্কজনক অধ্যায়কে তিনি লোকচক্ষুর সামনে, বিশ্বের নজরে আনার লক্ষ্যে আঁকতে শুরু করলেন সেসব হৃদয়বিদারক দৃশ্যের ছবি।

সেসব ছবি দেখে যামিনী রায় বলেছিলেন, ‘এই দুঃখের ওপরে আবার দুঃখ দিলে, জয়নুল।’

ভারতের নাইটিঙ্গেল শ্রীমতী সরোজিনী নাইডু মন্তব্য করেছিলেন, ‘দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও আবেগময় বর্ণনার চেয়ে তার এসব ছবির আবেদন অধিকতর।’

জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে পুরান ঢাকার জনসন রোডের ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুলের একটি জীর্ণকক্ষে গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়। তিনি এর প্রথম শিক্ষক ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর একই প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সবচেয়ে বড় খেতাব হেলাল-ই-ইমতিয়াজ প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৬৮ সালে চিত্রশিল্পবিষয়ক শিক্ষার প্রসারের জন্য ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্রদের তরফ থেকে ‘শিল্পাচার্য’ উপাধি লাভ করেন।

সে সময় পাকিস্তান সামরিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে চিত্রশিল্পীদের একত্র করে আর্ট কলেজের মাঠে আয়োজন করেন ‘নবান্ন উৎসব’। সেই উৎসবে ৬৫ ফুট দৈর্ঘ্য আর ৪ ফুট প্রস্থের কাগজে আঁকলেন সোনার বাংলার স্বপ্নভঙ্গের নিদারুণ ছবি।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর দেশে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হয়। মহাগুরু বসে থাকলেন না। আঁকলেন ৩০ ফুট দীর্ঘ ‘মনপুরা-৭০’, দর্শকদের মনে এই ছবিটি এখনো সেই বীভৎস পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ এক জীবন্তচিত্র হয়ে ধরা দেয়।

১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার বাংলাদেশের সংবিধানের অঙ্গসজ্জার দায়িত্ব দিলেন জয়নুল আবেদিনকে এবং ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে জাতীয় অধ্যাপকের সম্মান দেওয়া হয় তাকে। শিল্পী ও সংগঠক হিসেবে তার সফলতাই তাকে করেছে বাংলাদেশের চিত্রকলাচর্চার অগ্রপথিক। তৎকালীন মুসলিম গ্রামবাংলার জনগোষ্ঠীর সমকালের চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার চিত্রকর্মে। তার চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে বাঙালি জাতির জীবন-সংগ্রাম, সুখ-দুঃখ-বেদনা-বঞ্চনা ও আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিচ্ছবি। তার বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে, দুর্ভিক্ষ, মনপুরা-৭০, ১৯৫৭-এর নৌকা, ১৯৫৯-এ সংগ্রাম, ১৯৭১-এ বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ম্যাডোনা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া সাঁওতাল রমণী’, মই দেওয়া’, ঝড়’, কাক’, ‘বিদ্রোহী’ও প্রশংসা কুড়িয়েছে। ধারণা করা হয় তার তিন হাজারের বেশি চিত্রকর্ম রয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে ৮০৭টি, ময়মনসিংহ সংগ্রহশালায় ৬২টি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও ব্যক্তিগত সংগ্রহ হিসেবে নানা ব্যক্তির কাছে বেশ কিছু চিত্রকর্ম প্রদর্শন/রক্ষিত রয়েছে। জয়নুলের পরিবারের কাছে ৪০০টির বেশি চিত্রকর্ম রয়েছে। এ ছাড়া পাকিস্তানের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় তার বিপুল পরিমাণ চিত্রকর্ম সংগৃহীত রয়েছে, যা এখনো উদ্যোগ নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি।

দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা বাদ দিলে দেশভাগের পূর্ববর্তী (১৯৩০-৪৬) জয়নুল আবেদিনের অনেক চিত্রই এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে অপরিচিত বা একেবারেই কম তার মধ্যে শম্ভুগঞ্জ’ (কালি কলমের স্কেচ, ১৯৩৩), হাঁস’ (জলরং, ১৯৩৩), ফসল মাড়াই’ (জলরং, ১৯৩৪), বনানী দুমকা’ (জলরং, ১৯৩৪), পল্লিদৃশ্য’ (জলরং, ১৯৩৪), ঘোড়ার মুখ’ (পেনসিল-তেলরং, ১৯৩৪), বাইসন জু স্টাডি’ (জলরং, ১৯৩৫), মজুর’ (পেনসিল-স্কেচ, ১৯৩৫) প্রভৃতি।

নিজের চিত্রকর্ম সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি নিজে শিল্পকর্ম করে যত আনন্দ পাই, তার চেয়ে বেশি আনন্দ পাই শিল্পকলাকে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে দেখে, জীবনে প্রবিষ্ট হতে দেখলে।’ ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ মার্চ সোনারগাঁয়ে তিনি ‘বাংলাদেশ লোক ও চারুকলা ফাউন্ডেশন’ স্থাপন করেন। একই সময় ময়মনসিংহে নিজের চিত্রকর্মের একটি সংগ্রহশালাও প্রতিষ্ঠা করেন।

২০০৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন বুধ গ্রহের একটি জ্বালামুখ জয়নুল আবেদিনের নামে নামকরণ করে ‘আবেদিন’। উদ্দেশ্য হিসেবে তারা বলেন, মানবসভ্যতার মূল্যবোধ ও উপলব্ধি গভীরভাবে দেখানো জয়নুল আবেদিন সমাজের প্রতিকূলে দাঁড়িয়ে শিল্পী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংগঠনে অব্যর্থ ভূমিকা রেখেছেন।

জয়নুলের চিত্রকর্ম মানেই গণমানুষের প্রতিচ্ছবি। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৮ মে ৬১ বছর বয়সে ফুসফুসের ক্যানসারে মারা যান। বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাস আর শিল্পী জয়নুল আবেদিন যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। মৃত্যুর আগে আগে তার বলা ‘এখন তো চারদিকে রুচির দুর্ভিক্ষ। একটা স্বাধীন দেশে সুচিন্তা আর সুরুচির দুর্ভিক্ষ। এই দুর্ভিক্ষের কোনো ছবি হয় না।’ জয়নুল আবেদিনের এ উক্তি কিন্তু আজও প্রাসঙ্গিক।

লেখক : শিল্পী ও আইসিসিআর স্কলার, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত