জলাশয়ের ওপর স্থাপিত সোলার প্যানেল থেকে সূর্যের আলোর সাহায্যে উৎপাদিত হচ্ছে বিদ্যুৎ। এর নিচে পানিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা প্রজাতির মাছ। কৃষিজমির ক্ষতি না করে নির্মিত দেশের প্রথম ভাসমান এই সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে উৎপাদন শুরু হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের এই সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু অকৃষি জমির স্বল্পতা ও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে নবায়নযোগ্য এই জ্বালানির প্রসার হচ্ছে খুবই ধীরগতিতে। এমন পরিস্থিতিতে ভাসমান সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র সফল হলে পরিবেশ ও কৃষিজমি নষ্ট না করে তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ব্যাপকহারে বাড়বে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গতকাল নিজের ফেরিফায়েড ফেসবুকে লিখেছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বুলনপুরে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ভাসমান সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২.৩০ মেগাওয়াট। প্রকল্পটির ফলে একই জলাশয় থেকে মিলবে মাছ এবং বিদ্যুৎ।
‘আগামী কয়েক মাস আমরা উক্ত জলাশয়ে মাছের বৃদ্ধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করব। পরিবেশগত ভারসাম্য অটুট থাকলে পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন জলাধারে আমরা আরও বড় পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেব। যুগান্তকারী এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত সবাইকে অভিনন্দন’ যোগ করেন প্রতিমন্ত্রী।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে বুলনপুরে অবস্থিত নবাব অটোরাইস মিল এলাকায় নিজস্ব অর্থায়নে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করেছে জুলস পাওয়ার লিমিটেড। এর আগে বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি কক্সবাজারে ২০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে, যেটি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত রয়েছে। ওই সময় তাদের এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি দেশের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় ২ দশমিক ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রটির দশমিক ৮ মেগাওয়াট সৌর প্যানেল ভাসমান অবস্থায় স্থাপন করা হয়েছে অটোরাইস মিল মালিকের জলাশয়ের পানির ওপর। এজন্য মোট ৬ একর জলাশয়ের মধ্যে ৩ একর ব্যবহৃত হয়েছে। বাকি সৌর প্যানেল বসানো হয়েছে জলাশয়ের পাশে মিলের ছাদে। গত সোমবার দুপুরের দিকে এই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে।
জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির হেড অব বিজনেস ডেভেলপমেন্ট মোহাম্মদ নাহিদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওপেক্স মডেলের আওতায় অনগ্রিড এই সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মিত হয়েছে। এই মডেলে ক্রেতাকে কোনো ধরনের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় না। আমাদের প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে কেন্দ্রটি নির্মাণ করার পর এখান থেকে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ১০ পয়সা দরে কিনবেন অটোরাইস মিল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে মিল মালিক বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি নেসকোর কাছ থেকে ১০ টাকা ৬০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনছেন। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য তার আড়াই টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। পাশাপাশি যখন মিলটি বন্ধ কিংবা আংশিক উৎপাদনে থাকবে তখন এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ নেট মিটারিং সিস্টেমের আওতায় নেসকোর কাছে বিক্রিও করতে পারবেন।’
‘গ্রিড বিদ্যুতের মতোই এখানে এনার্জি মিটার স্থাপন করা হয়েছে। প্রতি মাসে উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিট হিসেবে তিনি বিল পরিশোধ করবেন। এভাবে ১২ বছর ধরে বিল পরিশোধের পর পুরো কেন্দ্রটি বিনামূল্যে ওই ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর তিনি প্রায় ১৫ বছর এই কেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবেন। এক্ষেত্রে সামান্য কিছু রক্ষণাবেক্ষণের খরচ লাগবে’ যোগ করেন তিনি।
নাহিদ জানান, ‘পানিতে সৌর প্যানেল ভাসানোর জন্য ফুডগ্রেডের প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে। যাতে এটি পানি কিংবা মাছের কোনো ক্ষতি না করে। আগামী ২০ বছর এর গুণগত মান অক্ষুন্ন থাকবে। পানিতে সৌর প্যানেলগুলো এমনভাবে বসানো হয়েছে যেন মাছের স্বাভাবিক জীবনচক্রে ব্যাঘাত না ঘটে। তারপরও আমরা এক বছর পর্যবেক্ষণ করব। এরপর একই ক্রেতার আরও ৪২টি পুকুর রয়েছে যেখানে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
