ঘূর্ণিঝড়ের চেয়ে বেশি মৃত্যু বজ্রপাতে

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৩, ০৭:০০ এএম

বজ্রপাত হলে এখন প্রায় প্রতিদিন মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। কখনো কখনো বজ্রপাতে একসঙ্গে অনেক মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগেও বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু হতো কিন্তু তা এখনকার তুলনায় অনেক কম। এখন যেসব বজ্রপাত হচ্ছে সেগুলো স্বল্প সময়ের মধ্যে হচ্ছে। কারণ হঠাৎ করেই আকাশে বজ্রমেঘ তৈরি হচ্ছে তার স্থায়িত্ব থাকছে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট। ফলে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারলেও নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে।

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঠিক কত মানুষের মৃত্যু হয় তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংগৃহীত তথ্য বলছে, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমলেও বজ্রপাতে মৃত্যু আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যু হয়েছে ১১৭ জনের। অন্যদিকে একই সময়ে বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ৭৩ জনের। এ সময় আহত হয়েছেন ৩০৫ জন। আরেকটি বেসরকারি সংগঠন জানায়, চলতি বছর মার্চ থেকে মে মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত মারা গেছে ৬৬ জন। এর মধ্যে ৬৩ পুরুষ ও ৩ জন নারী। তাদের মধ্যে শিশু রয়েছে দুটি। এ সময়ের মধ্যে আহত হয়েছে আটজন। এর মধ্যে শুধু কৃষিকাজ করতে গিয়েই মৃত্যু হয়েছে ৫১ জনের। নৌকায় থাকা অবস্থায় বা মাছ ধরতে গিয়ে মারা গেছে ১১ জন। এ ছাড়া বজ্রপাত ও কালবৈশাখীর মধ্যে আম কুড়াতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মারা গেছে একজন। বাড়ির আঙ্গিনায় খেলা করার সময় বজ্রপাতে মারা গেছে তিনজন।

২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩-এর মে মাস পর্যন্ত বজ্রপাতে ৩৪০ জন মারা গেছে। গত বছর এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাতে মারা গেছে ২৭৪ জন। এর মধ্যে ২৩৯ পুরুষ আর ৩৫ জন নারী। নারী ও পুরুষের মধ্যে শিশু রয়েছে ১২ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ুর পরিবর্তন আর অসচেতনতার কারণে এ প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে। আর দিন দিন তা বাড়ছে। তবে সেই অনুপাতে সচেতনতামূলক বা মোকাবিলার প্রস্তুতি বাড়েনি।

বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলত টেম্পারোরের যে ভ্যারিয়েশন (তাপমাত্রার তারতম্য) হয় তার কারণে বজ্রপাত বেড়ে যায়। উচ্চ তাপমাত্রা এবং নিম্ন তাপমাত্রার যখন ভ্যারিয়েশন ঘটে তখন বজ্রপাত হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। এর মধ্যে যারা মাঠে কাজ করে বা জেলে রয়েছে, তাদের সংখ্যাই বেশি।’

অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, ‘নাসার একটি গবেষণা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আমাদের কার্বনেশন যখন বাড়ছে তখনই বায়ুদূষণ বাড়ছে আর সেই সময় বজ্রপাতও বাড়ছে। কার্বনেশনের সঙ্গে বায়ুদূষণের একটা সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে। আমরা যদি বাংলাদেশের পরিসংখ্যানের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখা যাচ্ছে, গত ১০ বছরে প্রায় ৪ শতাংশের বেশি কার্বনেশন বেড়েছে। সেই হিসাবে আমাদের দেশে বেশি বজ্রপাত হওয়ারই কথা।’

আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর গড়ে ৮৪ লাখ বজ্রপাত হয়, যার ৭০ শতাংশই হয়ে থাকে এপ্রিল থেকে জুনে। এটা বর্ষা শুরুর মৌসুম। বর্ষা শেষে অর্থাৎ মৌসুমি বায়ু ফেরত যাওয়ার সময় সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেও বজ্রপাত বাড়ে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এমএ ফারুখ বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রি মনসুন সিজনে (প্রাক বর্ষা মৌসুম) বাংলাদেশের আকাশসীমায় বজ্রপাত বৃদ্ধির হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। আমরা আসলেই আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছি।’ তিনি বলেন, ‘২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, গত ছয় বছরে গড়ে ৮ লাখ ৮৬ হাজার বজ্রপাত আকাশসীমায় ঘটেছে। এর মধ্যে দুটো ধরন আছে। একটা হচ্ছে মেঘ থেকে মেঘ, অন্যটি হচ্ছে মেঘ থেকে মাটিতে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনটা মেঘ থেকে মেঘ বা কোনটা মেঘ থেকে মাটিতে আসছে, সেটা চিহ্নিত করতে পারিনি। তবে চেষ্টা চলছে।’

অধ্যাপক ফারুখ বলছেন, ‘বজ্রপাতের দুই রকমের মৌসুমগত পরিবর্তন হচ্ছে। একটা হচ্ছে বৃষ্টিপাতের মৌসুম। বৃষ্টিপাতের মৌসুমটা পরিবর্তন হচ্ছে। অরেকটা হচ্ছে তাপমাত্রার যে ক্রমাগত বৃদ্ধি, আবার কখনো বাড়ছে কখনো কমছে। শীতকালে ব্যত্যয় ঘটছে। তবে শীতের সময়টা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। কারণ তাপমাত্রা বাড়ছে। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে শীতের দৈর্ঘ্যটা কমে আসছে। অর্থাৎ সিজন পরিবর্তন হচ্ছে, আবহাওয়ার ধরন পরিবর্তন হচ্ছে। সুতরাং আবহাওয়ার এ পরিবর্তনের ফলে সারা বছর এ বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’

কেন সিলেট অঞ্চলে বজ্রপাত বেশি হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এটার অন্যতম কারণ হচ্ছে পাহাড়ের অবস্থান। এখানে একরের পর একর, হেক্টরের পর হেক্টর ধানের জমি এবং সমতল ভূমি। সুনামগঞ্জ বর্ডার শেষ হলো, ভারতের বর্ডার শুরু হলো, সেখান থেকে পাহাড় শুরু হলো এবং প্রচুর গাছপালা শুরু হলো। মাঝখানে আমাদের দেশে পাহাড়ও নেই, গাছপালাও নেই। ওই দিকের পাহাড়গুলো, মূলত আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়ের পাহাড়। বাংলাদেশে শীত শেষ হওয়ার পরপরই দক্ষিণাঞ্চল থেকে শুষ্ক ও আর্দ্রতাসম্পন্ন বাতাস প্রবেশ করে তখন ওই এলাকায় পাহাড়গুলোতে ধাক্কা খেয়ে প্রাক বর্ষা মৌসুমের বজ্রপাত তৈরি হয়। এ কারণে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে।’

কেন বজ্রপাত মৃত্যু রোধ করা যাচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন যেসব বজ্রপাত হচ্ছে, সেটা স্বল্প সময়ের মধ্যে হচ্ছে। কারণ হঠাৎ করে বজ্রমেঘটা তৈরি হচ্ছে। তার স্থায়িত্ব ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট। এরপর কিন্তু মেঘটা কেটে যাচ্ছে। এ সময়টার মধ্যে বজ্রপাত হচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে। মানুষকে দ্রুত সতর্ক সংকেত দেওয়া যেত যদি ফোরকাস্টিং সিস্টেমটা আরেকটু ভালো থাকত। মানুষের কাছে তথ্যগুলো পৌঁছানো সম্ভব হলে নিঃসন্দেহে মানুষকে বাঁচানো সম্ভব হতো।’

অধ্যাপক ফারুখ বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ কৃত্রিমভাবে আবহাওয়া প্রভাবিত করে আসছে। এ ক্ষেত্রে সে ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি কিছু জায়গায় ব্যবহার করা যায়। বজ্রপাত হওয়ার আগে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্য স্থানান্তর হয় সেটাও কিন্তু কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করা সম্ভব। এতে করে বজ্রপাতের ধরনটাকে পরিবর্তন করা সম্ভব। এমনকি লেজারের লাইটের মাধ্যমে বজ্রপাতকে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা সম্ভব। এরকম ঘটনা কিন্তু কাতারসহ অনেক উন্নত দেশে আছে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত দেশগুলোর মতো নয়। ফলে সচেতন করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে সম্মিলিত উদ্যোগই একমাত্র ভরসা। এ ছাড়া সরকার চাইলে যেসব এলাকায় বজ্রপাত হয় সেখানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে পারে। কৃষকদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে। বজ্রপাত হওয়ার আগে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অ্যালার্ম বেজে উঠবে, কৃষকরা তখন সেখানে আশ্রয় নেবেন।’

আগে থেকে বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়া যায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আবহওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবদুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বজ্রপাত নিয়ে খুব কম দেশেই পূর্বাভাস দেওয়া হয়। বড়জোর ছয় থেকে আট মিনিট আগে পর্যন্ত সতর্কতা দেওয়া যায়। লাইটেনিং ডিটেক্টরের (বজ্রপাত শনাক্তকরণ যন্ত্র) মাধ্যমে মোবাইলে ফোনে একটা অ্যালার্ম দেওয়া হয়, যেটা উন্নতবিশ্বে আছে। পরীক্ষামূলকভাবে আমাদের দেশেও এর কার্যক্রম চলছে। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরাও পারব। সে ক্ষেত্রে দুর্যোগ অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর তাদেরও সহযোগিতা দরকার।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সে ক্ষেত্রে ১৫টি জেলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে বেশি বজ্রপাত হয়। এসব এলাকায় ১৩৫টি উপজেলায় ৩০৯টি লাইটেনিং অ্যারেস্টার বসানো হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এটা প্রচুর দরকার। কিন্তু এর অনেক দাম। এর বেশিরভাগই আমদানি করতে হয়। এটা নিয়ে একটা প্রকল্প নিলে হয়তো কেনা যাবে। কিন্তু নদীর মধ্যে বা মাঝনদীতে কভার করতে পারবে কি না সেটাও চিন্তার বিষয়। কারণ এটার সর্বোচ্চ রেডিয়াস ৫০০ ফুট।’

তিনি বলেন, ‘এর বাইরে এমন কোনো পূর্বাভাস যন্ত্র বের হয়নি। আধঘণ্টা আগে হয়তো আঁচ করা যাবে। কোথায় পড়বে সেটা কিন্তু নিশ্চিত হওয়া যাবে না। সুতরাং বজ্রপাত আমাদের জন্য বড় একটি থ্রেট (হুমকি)। এই মুহূর্তে মানুষকে সচেতন করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কীভাবে সচেতন হবে এ বার্তাগুলো প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছতে হবে। এ কাজগুলো জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে করা হচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে চিঠিও দিয়েছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ট্রেনিংয়েরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত