ভারতের জাতীয় চ্যালেঞ্জ ও মণিপুর সংকট

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৩, ১০:৫৩ পিএম

গত মে মাস থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট রাজ্য মণিপুরে অস্থিরতা চলছে। আদালতের একটি রায়কে কেন্দ্র করে মণিপুরে জাতিগত সহিংসতা রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বর্তমানে রাজ্যটিতে সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু তবুও শান্তির পথের সমাধান দৃশ্যমান নয়।

মণিপুরে গত ৩ মে থেকে চলা সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ১০৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। যদিও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে মৃতের সংখ্যা ১১৫। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন মৃতের সংখ্যা প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। এ ছাড়া ৩০০টি গির্জা পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গত ২৯ মে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মণিপুর সফর করার সিদ্ধান্ত নেন। তার সফরের আগের রাতেই ফের বড় আকারের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়। ২৮ মে রাতের সহিংসতায় ১ পুলিশসহ ৫ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছে। রাজ্যটিতে ২৮ মে যখন ফের সহিংসতা চলে তখন রাজ্যে অবস্থান করছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই ও সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ পাণ্ডে। প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই রবিবার দাবি করেন, রাজ্যটিতে সাম্প্রতিক সময়ে ৪০ জন ‘সন্ত্রাসী’কে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার এই ঘোষণার পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর রাজ্য সফরের আগ মুহূর্তে রাজ্যে ফের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। 

ভারতে অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতাবাদ ও জাতীয় চ্যালেঞ্জ

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বা জাতিগত সহিংসতা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে একেবারে নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু স্বাধীনতার ৭৫ বছরে ভারত নানা সময়ে নানা সংকট থেকে কাটিয়ে উঠেছে। সত্তরের দশকের যে নকশালবাড়ি মুভমেন্ট সিকিম-অন্ধ্রপ্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল, সময়ের ব্যবধানে সে মুভমেন্টের স্থান এখন ইতিহাস ও সাহিত্যে। সেই সঙ্গে মিজোরাম, নাগাল্যান্ডে বামপন্থিদের বিদ্রোহও স্বাধীন ভারতকে বিচলিত রেখেছে দীর্ঘদিন। এমনকি এই আশঙ্কা থেকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বামপন্থি তরুণদের সামরিক ট্রেনিং দিতে ভারত নিমরাজি ছিল।

আশির দশকের শিখ মুভমেন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ভারতবর্ষকে সময়ে বড় ত্যাগ করতে হয়েছে। এই মুভমেন্ট ঠেকাতে গিয়ে আততায়ীর হামলায় নিহত হয়েছেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। নব্বইয়ের দশকে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া নিউ-লিবারেল ইনস্টিটিউশনালিজমের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। সার্কের মতো আঞ্চলিক সংগঠন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব তৈরি করে। যদিও এ সময়ে ভারত-পাকিস্তান কারগিলে সম্মুখযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। মূলত সার্কের একটা প্রভাব ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে যুদ্ধকে বাড়তে দেয়নি।

নব্বই দশক থেকে ভারত মূলত জোর দেয় ‘গরিবি হটাও’। দারিদ্র্য কমিয়ে আনা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত, বিদেশি বিনিয়োগে আকর্ষণ ও বড় বড় অর্থনীতির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দেয় ভারত।

কিন্তু ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলা ও পার্লামেন্টে হামলা ভারতকে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে নতুন করে আতঙ্কিত করে তোলে। সে সময় বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার অন টেরর’ চলছিল। পাকিস্তানে তালেবানকে নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে উঠছিল। সেই সঙ্গে তালেবান থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়া যোদ্ধারা এই অঞ্চলের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও আতঙ্কিত করে তুলে ভারতকে।

গরিবি হটাও থেকে ভারতকে নিরাপত্তার দিকে বেশি নজর দিতে হয়। কারণ এসব হামলা বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে একেবারে নষ্ট করে দিচ্ছিল। ২০০৮ সাল পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য আবার বিশেষ একটা সময়ও। এ সময়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানে রাজতন্ত্র, সামরিক শাসন ও অনির্বাচিত সরকার ব্যবস্থা থেকে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার উত্তরণ ঘটে।

পরের দশকে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। চীনের উত্থান ও চীন ঠেকাতে ভারত যুক্তরাষ্ট্রমুখী নীতি, রাশিয়ার সঙ্গে ভারসাম্য ও আসিয়ানের বাজার ধরতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ভারতের নীতিনির্ধারকরা এখন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। তারা এখন বিশ্বাস করে, পাকিস্তান চাইলে সীমান্তে ভারতকে কাবু করতে পারবে না।

অথবা আরেকটি যুদ্ধে জড়ানোর আর্থিক শক্তি

পাকিস্তানের নেই। চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ ভূ-রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। একদিকে যেমন সাংহাই কো-অপারেশনের সদস্য, অন্যদিকে ‘চীন ঠেকানো’ পশ্চিমা জোট কোয়াডের নির্ভরযোগ্য খুঁটি ভারত।

এমন একটি ‘রাইজিং ইন্ডিয়া’তে ফের পাঞ্জাব ও মণিপুরে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা নতুন করে মাথা ছাড়া দিয়ে উঠবে তা ভারতের নীতিনির্ধারকের চিন্তার মধ্যেই ছিল না। এমনকি পাঞ্জাবের সাম্প্রতিক শিখ মুভমেন্ট আবার দানা বাঁধবে তা নিয়ে সরকারের পর্যান্ত গোয়েন্দা তথ্য ছিল না বলে ব্যাপক সমালোচনা শুনতে হয় কেন্দ্রীয় সরকারকে। মণিপুরের আন্দোলনও অনেকটা এ রকম।

উত্তর প্রদেশ বা কর্ণাটকের হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের সঙ্গে মণিপুরের হিন্দু-খ্রিস্টান দ্বন্দ্বকে একভাবে দেখার সুযোগ নেই। ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপি কোণঠাসা এই জায়গায়। তারা মনে করেছে, কর্ণাটকে যেভাবে মুসলিমদের সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের প্রক্রিয়ায় কয়েকটি প্রতিবাদ সমাবেশেই সীমাবদ্ধ ছিল, মণিপুরেও তেমন কিছু ঘটবে।

কিন্তু মণিপুরে ঐতিহাসিক নিজস্বতা পালন করা জনগোষ্ঠী আছে। তারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্যবোধ, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আবেগপ্রবণ। হঠাৎ করে সেখানে আইন পরিবর্তন করে পাহাড়ে অ-আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার তৈরি করা ও আর পাহাড়ের গির্জা ভেঙে দিলে তার প্রতিক্রিয়া উত্তর প্রদেশ বা কর্ণাটকের মুসলমানের প্রতিক্রিয়ার মতো হবে, সেটা ভাবা ভুল।

মণিপুর সংকট ও দেশ-বিদেশে বিজেপির ভাবমূর্তি

বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমনে ভারতের কংগ্রেস সিদ্ধহস্ত হলেও বিজেপির জন্য এই অভিজ্ঞতা একেবারেই নতুন। পাঞ্জাব ও মণিপুরের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ভারতের মধ্যেই বিজেপিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। বিজেপি একটি ‘নতুন ভারত’ গড়ার কথা বললেই দেশের দুই প্রান্তে দুটি জাতিগোষ্ঠী যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে চ্যালেঞ্জ করছে তারা বিজেপির জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জে ফেলে দেয়।

অন্যদিকে বিরোধী দল জাতীয় কংগ্রেস ‘ভারত জোড়ো’ বলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভাইপ নিজেদের করে নিচ্ছে। মণিপুরের সংকট ভারতের বিজেপি সরকারকে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও নানা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতিমধ্যে ভারতের মুসলমানদের প্রতি চলমান বৈষম্যের নিন্দা জানিয়ে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সমালোচনা করছে। এ মুহূর্তে সারা বিশে^র খ্রিস্টান সংগঠন ও খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ট দেশের দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো মণিপুর নিয়ে সরব হলে বিজেপিকে তা মোকাবিলায় বেগ পেতে হবে।

মণিপুর সংকটের সমাধান

২৮ মে রাতের সহিংসতার মধ্যে ২৯ মে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মণিপুর সফর করেছেন। তিনি সফরকালে আদিবাসী গোষ্ঠী আইটিএলএফের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে আদিবাসী নেতা ছাড়াও কুকি জনগোষ্ঠীর বিধায়করাও অংশ নেন। এ ছাড়া বিভিন্ন গির্জার প্রতিনিধি ও কুকি জনগোষ্ঠীর সুশীল সমাজের সঙ্গে মন্ত্রী বৈঠক করেন। ভারতের উত্তর-পূর্ব দিকের রাজ্য নারীবাদী সংগঠন ও এনজিও একটা বিশেষ প্রভাব রাখে সমাজে। মন্ত্রী তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।

বৈঠকে আদিবাসীদের পক্ষ থেকে মন্ত্রীর কাছে ১১ দফার বিশেষ দাবি জানানো হয়। তার মধ্যে অন্যতম ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং রাজ্যে কেন্দ্রীয় শাসন (রাষ্ট্রপতি শাসিত) জারি করা। এই শাসন জারি হলে মূলত রাজ্যের নিরাপত্তার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে চলে যায়।

কুকিদের সংগঠন কেএনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরকে স্বাগত জানিয়েছে। উল্লেখ্য, কেএনও দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় রয়েছে। আলোচনার ধরন ও বৈঠকে উপস্থিতি দেখে আন্দাজ করা হয় এ মুহূর্তে রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় উভয় পক্ষের আগ্রহ রয়েছে।

সব পক্ষের বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগামী ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্যে একটি ‘গ্রহণযোগ্য’ সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন মণিপুরে বৈঠকে ব্যস্ত তখন দিল্লিতে কুকি জনগোষ্ঠীর ৫ শতাধিক নারী বিক্ষোভ করেছেন। তারা বিক্ষোভে দাবি করছেন, মণিপুরে কুকি জনগোষ্ঠী ‘জাতিগত নিধনের’ মুখে রয়েছেন।

ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনা এড়াতে বিজেপি সরকার আন্তরিকভাবে একটি সাময়িক শান্তির পথ খুঁজবে বলেই ধারণা করা যায়। সে পথ কিছুটা হলেও দীর্ঘ এক মাসের জাতিগত সহিংসতা ও সশস্ত্র বিদ্রোহের লাগাম টানতে পারে। কিন্তু মণিপুর সংকটের সমাধান এখনই হচ্ছে না।

এর কারণ তরুণ প্রজন্ম। কুকিসহ মণিপুরের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তরুণরা এখন উচ্চশিক্ষিত। চলমান সহিংসতা যে আন্দোলন থেকে শুরু হয় তার নেতৃত্ব দিয়েছিল আদিবাসী ছাত্রসংগঠন ‘অল ট্রাইভস স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’। একদিকে সারা ভারতে একটি ‘নতুন ভারত’ গড়ার জোয়ার, অন্যদিকে এই তরুণরা দেখেছে তাদের রাজ্যে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ, গির্জায় হামলা, সন্ত্রাসী তকমা। ফলে মণিপুরে সাময়িক একটি শান্তি প্রতিষ্ঠা হলেও ঘটে যাওয়া সহিংসতার দাগ সহজে কাটবে না।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত