এক দিনে সর্বোচ্চ ১৪১ ডেঙ্গু রোগী ভর্তির রেকর্ড

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৩, ০৬:০৮ এএম

এখন জ্বর হলে প্রথম দিনেই ডেঙ্গু শনাক্তকরণ এনএস১ অ্যান্টিজেন টেস্ট (নন স্ট্রাকচারাল প্রোটিন ১) করার পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলেছেন, এই পরীক্ষার মাধ্যমে অল্প সময়েই ডেঙ্গু শনাক্ত করা যায়। এই পরীক্ষার ফি সরকারি হাসপাতালে ১০০ টাকা এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৫০০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার।

গতকাল শনিবার ডেঙ্গুর পরিবর্তনশীল ধরন ও উপসর্গ নিয়ে বিএসএমএমইউর ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগ আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে এ তথ্য জানানো হয়। পরে ডেঙ্গু শনাক্ত ও চিকিৎসায় হাসপাতালের কেবিন ব্লকের সাধারণ জরুরি বিভাগে ডেঙ্গু কর্নারের উদ্বোধন করা হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশের ডেঙ্গু চিকিৎসার জাতীয় নীতিমালার প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক ডা. কাজী তারিকুল ইসলাম।

এক দিনে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগীর রেকর্ড : এদিকে ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) এ বছর এক দিনে হাসপাতালে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী ভর্তির রেকর্ড হয়েছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১৪১ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এটি এ বছরের মধ্যে এক দিনে সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তির ঘটনা। এর আগে এক দিনে সর্বোচ্চ ১১২ জন রোগী ভর্তির রেকর্ড ছিল গত বৃহস্পতিবার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক দিনে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২৮ জন আর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৩ জন। তবে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়নি। এ বছর এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকায় ১ হাজার ৬০৭ এবং ঢাকার বাইরে ভর্তি হয়েছে ৬৭২ জন। এখন পর্যন্ত মারা গেছে ১৩ জন।

সেমিনারে কয়েকটি পরামর্শ : সেমিনারে বিএসএমএমইউর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, জ¦র হলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। জ¦র হলে প্রথম দিনেই ডেঙ্গু পরীক্ষা এনএস১ পরীক্ষা করাতে হবে। ডেঙ্গু জ¦র ধরা পড়লে পর্যাপ্ত পানি জাতীয় খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে। অযাচিত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা যাবে না। এ সময় অ্যাসপিরিন জাতীয় ও ব্যথার ওষুধ বন্ধ রাখতে হবে। বমি, পাতলা পায়খানা, পেটব্যথা, শাসকষ্ট, শরীরে কোথাও রক্তপাত হলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।

সেমিনারে রোগ প্রতিরোধে এডিস মশার নিধন, ডেঙ্গুজ্বরের চিকিৎসার ক্ষেত্রে গাইডলাইন অনুসরণের পাশাপাশি রোগ ও রোগীর অবস্থাভেদে চিকিৎসার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সেমিনারে ডেঙ্গুর নতুন উপসর্গের তথ্য জানানো হয়। বলা হয়, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রথম প্রাদুর্ভাব শুরু হয় ২০০০ সালে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুর সাধারণ উপসর্গ ছিল জ্বর, কাশি, র‌্যাশ হওয়া, মাথাব্যথা। কিন্তু ২০২১ সালের পর ডেঙ্গুর উপসর্গে পরিবর্তন হয়। তখন আগের উপসর্গের সঙ্গে নতুন করে পেটব্যথা ও পাতলা পায়খানা যুক্ত হয়। এটি এখনো চলমান রয়েছে।

সেমিনারে ডেঙ্গুর মৌসুম প্রসঙ্গে বলা হয়, সাধারণত দেশে জুন মাস থেকেই ডেঙ্গুজ¦রের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। কিন্তু এবার মে মাসেই সর্বাধিক ডেঙ্গু রোগী সারা দেশে শনাক্ত হয়েছে। এ জন্য এ বছর বাড়তি সতর্কতা জরুরি। 

সেমিনারে বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ডেঙ্গুতে ২০২২ সালে প্রায় ৬২ হাজার আক্রান্ত হয়েছিল, মারা গেছে ২৮১ জন। এ বছর জুন-জুলাই আসার আগেই আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ২ হাজার এবং মারা গেছে ১৩ জন, যা উদ্বেগের বিষয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে। সাদা সাদা ফোঁটা দেখে এডিস মশা চেনা যায়। এই মশা চিনতে হবে। এই মশাই ডেঙ্গুর জন্য দায়ী। নতুন বিল্ডিং তৈরি ও উন্নয়নমূলক কাজ করার সময় এবং বৃষ্টির পরে ছাদে পানি জমে থাকে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাড়ির পেছেন পরিষ্কার রাখতে হবে। খালি পাত্র থাকলে তা উল্টো করে রাখতে হবে, যাতে পাত্রের ভেতরে পানি জমে না যায়। শরীরে ফুল হাতার শার্ট ও পায়ে মোজার ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে।

উপাচার্য আরও বলেন, ডেঙ্গু হয়েছে কি না, তা জানতে জ্বর হলে শুরুতেই এনএস১ টেস্টটি করে নিতে হবে এবং জ¦র হলেই অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ খাওয়া যাবে না। ফলমূলসহ পানি জাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে। ডেঙ্গু প্রথমবার হলে মৃত্যুর হার কম, কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার হলে মৃত্যুর হার বেশি। যারা ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছে, তাদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, জ্বর হলে প্রয়োজন ছাড়া অযথা বাড়তি টেস্ট এবং বারবার টেস্ট না দেওয়া হয়। ডেঙ্গুজ¦রের কারণে প্লাটিলেট কমে গেলেই রক্ত দিতে হবে এই ধারণা ভুল। আবার রক্ত দেওয়া যাবেই না, এটাও ঠিক না। অবস্থা বুঝে রোগীকে কী চিকিৎসা দিতে হবে সিদ্ধান্ত দেবেন চিকিৎসক।

সভাপতির বক্তব্যে বিএসএমএমইউর ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ডেঙ্গু ও কভিডে একই ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়। উভয় রোগেই জ্বর, সর্দি, কাশির লক্ষণ দেখা যায়। এ জন্য জ¦র হলেই ডেঙ্গু ও কভিড পরীক্ষা করাতে হবে। বর্তমানে পানিবাহিত রোগ টাইফয়েড আক্রান্ত রোগীও অনেক পাওয়া যাচ্ছে। এ জন্য জ¦র হলেই প্রথম দিনেই এনএস১ টেস্ট করাতে হবে। শুরুতে রোগ চিহ্নিত না হলে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত