দেয়ালেরও কান আছে, এই বিখ্যাত উক্তি ফ্যাব্রিজিও রোমানোর অবশ্যই জানা ছিল। তাই ইতালির মিলান শহরের দেয়াল হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সেই দেয়াল পাশ কাটিয়ে কোন দলবদল হতো না, হতে পারতো না। গল্পটা এক ফুটবল সাংবাদিকের। যার কোন আক্ষরিক সংবাদপত্রে কাজ করার বাধ্যকতা নেই। নেই কোন একটি গুজব ছড়িয়ে তা নিয়ে বসে থাকার সময়ও। ইতালিয়ান এই সাংবাদিক শুধু সঠিক তথ্যটি দেন এবং সেটা পূর্ণাঙ্গ রূপে নিশ্চিত হলেই। বলা বাহুল্য এই খবরগুলো থাকে শুধুই দলবদল সংক্রান্ত। আর তাই ফুটবল বিশ্বে তিনি এখন ফুটবলার দলবদলের সংবাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। এক কথায় ‘ট্রান্সফারগুরু’। তার শুরুর সঙ্গে মিশে আছেন মাউরো ইকার্দি ও তার উঠে আসার সাক্ষি হয়ে আছে মিলানের রেস্তোরাগুলো।
রোমানো এমনিতে নেপলসবাসী। নেপলসের বিভিন্ন ক্রীড়া ম্যাগাজিন বা দৈনিকে যুবক বয়সে লেখা পাঠাতেন। সেসব কখনও ছাপা হতো আবার কখনও হারিয়ে যেত। একদিন হঠাৎ অপরিচিত এক নম্বর থেকে ফোন পান রোমানো। ওই নাম্বার থেকে তাকে বলা হয় একটি সংবাদ করার জন্য। স্প্যানিশ উইঙ্গার জেরার্ড ডেলোফেও এবং স্ট্রাইকার মাউরো ইকার্দিকে নিয়ে সংবাদটি করতে বলেন ওই লোক। রোমানো ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজটি করে দেন। ওই খবর দেখিয়ে ইকার্দি ও ডেলোফেওকে খুশি করেন ওই লোক। পরে ওই লোক-ই হয়ে ওঠেন এ দুই ফুটবলারের এজেন্ট। এই এজেন্টই পরে রোমানোর উপকার ফিরিয়ে দেন। ২০১১ সালে বার্সার অ্যাকাডেমি থেকে সাম্পদোরিয়াতে যোগ দেন ইকার্দি। আর এই সংবাদ ওই এজেন্টের কাছ থেকে পেয়ে প্রথম প্রকাশ করেন রোমানো। তবে এই সংবাদ কোন আলোড়নই তোলেনি। কারণ ইকার্দিকে নিয়ে তখন কোন আলোচনাই ছিল না। তার ওপর সাম্পদোরিয়া এমন কোন বড় ক্লাবও না।
এ ঘটনার ঠিক দুই বছর পর, ২০১৩ সালে আসল গল্প শুরু। ইকার্দির এজেন্ট হয়ে ওঠা ওই লোক একদিন ফোন করে রোমানোকে বলেন, ‘তুমি আমার উপকার করেছিলেন এবার তা ফেরত দেবার পালা।’ এরপর জানান সামনের গ্রীষ্মে ইন্তার মিলানে যোগ দিতে যাচ্ছেন আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার। এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষনা আসার ছয় মাস আগে রোমানো এই সংবাদ প্রচার করেন। এবং চুক্তি হওয়ার পর সবাই প্রথম রোমানোর নাম জানতে পারে ও মনে রাখে।
এই ঘটনার পর রোমানোকে স্কাই স্পোর্টস ইতালিয়া ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে নিয়োগ দেয়। রোমানো চলে আসেন ইতালির ফুটবল রাজধানী মিলানে। দলবদল নিয়ে ভালো সংবাদ প্রচার করা ইতালিয়ান সাংবাদিক ছিলেন জিয়ানলুকা ডি মারজিওর সঙ্গে ভাব জমিয়ে তোলেন রোমানো। তাকে একটি ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট তৈরি করে দেন। বিনিময়ে দলবদলের খবর কিভাবে সংগ্রহ করতে হয় তার সব খুঁটিনাটি জেনে নেন। সেই থেকে রোমানোকে দলবদলের সময় মিলানের সব বড় রেস্তোরায় দেখা যেত। এক প্রতিবেদনে তিনি বলেন, ‘দলবদলের ক্ষুদ্রতম ইঙ্গিত ধরতে আমি প্রতিদিন শহরের চারপাশে ঘুরে বেড়াতাম। ফুটবলের লোকজন যাতায়াত করে বা মিলিত হয় এমন রেস্তোরায়, হোটেলে খোঁজ নিতাম নিয়মিত। এভাবে অনেক দলবদলের খবর আমি সংগ্রহ করতে পেরেছি।’ আর এখানে রোমানোর উঠে আসার পেছনে মিলানের রেস্তোরাগুলো বিখ্যাত হয়ে আছে।
তবে রোমানো শুধু ইতালিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। ইতালির দলবদলের সংবাদ দিতে দিতে তার যোগাযোগ আরও বাড়তে থাকে। অনেক ফুটবলারের এজেন্টদের সঙ্গে বেড়ে উঠে সুসম্পর্ক। সে থেকে ইংল্যান্ড, স্পেন ও ফ্রান্সের দলবদলের খবরও তার কানে চলে আসত। এ থেকে সঠিক সংবাদ দিয়ে ইউরোপের শীর্ষ চার লিগের বাজারে নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠেন। তার এই নির্ভরযোগ্যতা সবচেয়ে আলোচিত হয় ২০২০ সালে। পর্তুগীজ মিডফিল্ডার ব্রুনো ফার্নান্দেজের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড আসার চূড়ান্ত খবরটি রোমানোই প্রথম দেন। আর এই খবর দিতে গিয়ে তিনি শুরু করেন তার বিখ্যাত ‘হেয়ার উই গো…’ উক্তি। এরপর থেকে ইতালিতে নয় ফুটবলের সবচেয়ে বড় বাজার ইংল্যান্ডের দলবদলে নির্ভরযোগ্য খবরের মাধ্যম হয়ে ওঠেন রোমানো।
এই খ্যাতি তাকে বিশাল অবস্থানে নিয়ে গেছে। এখন ইন্সটাগ্রামে তার ফলোয়ার ১ কোটি ৭০ লাখ, টুইটারে ১ কোটি ৫০ লাখ, ফেসবুকে ১ কোটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তিন সেরা মাধ্যমে রোমানোর ফলোয়ার সংখ্যা এই, তাহলে রোমানোর নিজের কি আর প্রতিষ্ঠানিক চাকরির দরকার আছে!
