বঙ্গবন্ধুর কাছে তিনি ছিলেন ফিদেল ক্যাস্ত্রো। রাজনৈতিক সহকর্মী ও প্রিয়ভাজনদের কাছে ‘দাদাভাই’। আবার অনেকের কাছে পরিচিত রাজনীতির ‘রহস্য পুরুষ’ হিসেবে। বলছিলাম, উদার জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতেখড়ি নেওয়া সিরাজুল আলম খানের কথা। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কিছু সময় পরে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন করেন। খ্যাতি পান জাসদের তাত্ত্বিক গুরু হিসেবে। মূলত নব্বইয়ের দশকে একেবারেই অন্তরালে চলে যান স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের লক্ষ্যে গঠিত নিউক্লিয়াসের অন্যতম সদস্য সিরাজুল আলম খান। মৃত্যুর আগে চলতি বছর এপ্রিল মাসের শেষের দিকে দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে কথা বলেন আলোচিত-সমালোচিত এই নেতা। অপ্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো :
সিরাজুল আলম খান শুরুটা এভাবেই করেছিলেন, একাত্তরের সংগ্রাম কী জন্য হলো, এতগুলো লোক কেন মারা গেল? আমি তো এটাই বুঝি না, এটা একটু বোঝাও।
একটু সময় নিয়ে আবার বললেন, নয় মাস যুদ্ধ করে বেঁচে আছে যারা, তারা এখন ২০ হাজার টাকা সম্মানী পায়। তাদের ২০ হাজার টাকা করে সরকার ভাতা দেয়। মুক্তি সংগ্রাম কি এ জন্য হলো? একজন আমেরিকান, ব্রিটিশ, জার্মান ও জাপানিজ নাগরিক যে মর্যাদাসম্পন্ন, বাঙালি জাতি হিসেবে সে ধরনের মর্যাদা লাভের জন্য ১৯৭১ সালের সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। সেই দেশগুলোর নাগরিকরা মর্যাদাসম্পন্ন, আর বাঙালি জাতি?
তিনি বলেন, ১৮ কোটি মানুষের এ দেশে ১১ কোটি সব পেয়ে চলেছেন। ৭ কোটি মানুষ বঞ্চিত। এই ৭ কোটি মানুষ কেন মূলধারার বাইরে? সশস্ত্র যুদ্ধ কি ৭ কোটি মানুষকে মূলধারার বাইরে রাখার জন্য হয়েছে? নিশ্চয়ই না। বঞ্চিত এই মানুষগুলোকে আলোকিত করতে, উন্নয়নের মূলস্রোতে আনতে ভিন্ন কিছু করা দরকার। এটা করতে পারলেই সামগ্রিক উন্নয়ন বলা যাবে। এ জন্য দরকার বাঙালির তৃতীয় জাগরণ।
সিরাজুল আলম খান দাবি করেছিলেন, বাঙালিত্বের বদলে বাংলাদেশি সেজে বাংলাদেশের জাতিগত বা সমাজগত কোনো সমস্যারই সমাধান হয়নি।
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা না নেওয়া মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এ সংগঠক বলেন, যারা ২০ হাজার টাকা ভাতা পায় এমন পাঁচ-সাতজন, যারা আমার পরিচিত তাদের ফোন করে বলছিলাম, ভাই, আমার তো খুব খারাপ অবস্থা, সম্মানী থেকে আমাকে মাসে দুই-এক হাজার টাকা দিতে পারবেন? দুই-তিনজন বলল, ভাই, আমরা তো দরিদ্র হয়ে গেছি, ওষুধ খাই এ টাকা দিয়ে। এ টাকা থেকে যদি আপনি টান দেন, তাহলে তো আমরা বাঁচব না। এই হলো অবস্থা!
মুজিব বাহিনীর সদস্য সিরাজুল আলম খান বলেন, যদি ধরি ৭ কোটি মানুষ এক বেলা খেতে পায় না। দিনে খেলে রাতে পায় না, রাতে খেলে দিনে পায় না। এই হিসাবটা কারও কাছে আছে? মানুষ কী চাইবে, চাওয়াটাও একটা বিশেষ অর্থ, চাওয়াটা তো পাইতে হয়। আমি কয়েকটা পরিবারকে জানি, যারা দিনের বেলা খেলেও, এখন খাচ্ছে না (সন্ধ্যা ৬টা)। ৯০ টাকা দরে চাল। এটা কোনো রকমে জোগাড় করতে পারে। সরকারি বদান্যতায় ১০ টাকায় যেটা পাওয়ার কথা, সেটা পেতে এখন ৯০ টাকা লাগে। সে কি ৯০ টাকা দৈনিক আয় করে? অনেকে আবার বলে খুব ভালো আছে। তাদের জিজ্ঞেস করো তো যারা বলছে ভালো আছে, তারা কি আসলে ভালো আছে? এমন লোকেদের সাথে তোমাদের কথা হয়, দেখা হয়? হয় না। আমি সবাইকে জিজ্ঞেস করছি এবং বলছি, আমার দেখা হয়। ভালো থাকা হচ্ছে সতেরো কোটি, আঠারো কোটি লোক সবাই ভালো থাকা।
বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের (বিএলএফ) এই সদস্য বলেছিলেন, আমরা সবাই নিম্নবিত্ত থেকেই আসলাম। এখন নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত হয়েছি। মধ্যবিত্তেরাও এখন ইঞ্জিনিয়ার। ওর চৌদ্দগোষ্ঠীতে কেউ ইঞ্জিনিয়ার ছিল? দেশ স্বাধীন হলো, ও ইঞ্জিনিয়ার হলো, শুধু ও হওয়ার জন্য তো দেশ স্বাধীন হয়নি। ওই সাত কোটি? ওরা তো ইঞ্জিনিয়ার হতে পারত। তাদের টাকাপয়সা নেই, তাই ইঞ্জিনিয়ার হতে পারল না। টাকাপয়সা যদি ওই ১১ কোটির মধ্যেই কুক্ষিগত থাকে, তাহলে ওদের কাছে থাকবে কোত্থেকে? তার মানে কী দাঁড়ায় স্বাধীনতার সুফল ওই ১১ কোটির জন্যই! আমরা ওদের অংশ হতে পারব না?
সিরাজুল আলম খান বলেন, ১৯৫৯ সালে কিউবা স্বাধীন করেছিল ক্যাস্ত্রো, আমরা ১৯৭১-এ। তার দেশে যদি ১২৬ জনে একজন ডাক্তার থাকতে পারে, ১৪০-১৫০ জনে একজন ইঞ্জিনিয়ার থাকতে পারে, দুই-তিন কোটি শিক্ষক থাকতে পারে, আমাদের নাই কেন? ক্যাস্ত্রোর দেশ কিউবা কি এত উন্নত ছিল। তার তিন কোটি আর্মি আছে। এটা কি কোনো খনি থেকে এসেছে?
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে তিনি দাবি করেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাকে ক্যাস্ত্রো বলছিল। কিন্তু আমি তো ক্যাস্ত্রো ছিলাম না।
তার প্রশ্ন স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় পার করছি, আমাদের কেন এক কোটি ডাক্তার হলো না? এখনো কেন হতে পারছে না। কেন? এক কোটি, দেড় কোটি ইঞ্জিনিয়ার কেন হতে পারল না? তিন কোটি শিক্ষক হতে পারল না, পাঁচ কোটি আর্মি কেন হলো না, আর্মির সঙ্গে ‘এলাইড ফোর্স’ হতে পারল না। কেন? মূলত এটাই আমরা চাইনি। পরিকল্পনায় নিইনি।
আমরা জানি ১৯৫২ সাল থেকেই প্রথম শ্রেণিতে অন্তত ৬০ লাখ বাচ্চা স্কুলে ভর্তি হয়। স্কুলের পাঁচ বছর পর কি একটা পরীক্ষা আছে না? পিএসসি। সেই পরীক্ষায় ২২ লাখ ‘ড্রপ আউট’ হয়ে যায়। আবার পাঁচ বছর পর আরেকটা স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা হয়, আবার ড্রপ আউট হয়ে যায়। বাকি যে ১০-১২ লাখ থাকে, তাদের নিয়ে তারা এইটা-সেইটা দেখায়। তো বাকি ওই ৪০ লাখের ড্রপ আউটের কী হবে? তাদের কথা এই রাষ্ট্র ভাবে? কেন, তারা গরিব বলে? ধনী-গরিব, এ দেশে তো বানানো হয়েছে। এই ড্রপ আউটগুলার কী হবে? তারা রিকশা ঠেলে, এই-সেই কাজ করে, পারলে পিকেটিং করে বাঁচবে?
তিনি বলেন, এই যে একটা হিসাব বললাম, যদি দেড় কোটি ডাক্তার থাকে, দেড় কোটি ইঞ্জিনিয়ার থাকে, তিন কোটি শিক্ষক থাকে ও পাঁচ কোটি আর্মি থাকে তাহলে কি আমাদের ইন্ডিয়ায় গিয়ে বা আরও অন্যান্য দেশে গিয়ে আর হাতজোড় করতে হবে? ক্যাস্ত্রো কী হাতজোড় করেছিল আমেরিকায় গিয়ে?
সিরাজুল আলম খান বলছিলেন, সবাই হয়তো ভাবে করব, কাল বা পরশু। হয়তো এটাও ভাবে তাহলে তো এর আগে সমাজতন্ত্র করতে হবে। তাহলে কি ক্যাস্ত্রো আগেই সমাজতন্ত্র করছে, ভিয়েতনাম পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই কি সমাজতন্ত্র করছে? সমাজ পরিবর্তনের প্রয়োজনে কিছু করাকে সোজা কথায় আমরা সমাজতন্ত্র মনে করি। কিন্তু ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, বিশ্বাস করানো হয় যে তারা আল্লাহ-খোদা বিশ্বাস করে না। মূলত যারা এ ধরনের পরিকল্পনা অনুযায়ী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন চায় না তারা ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে, বাধা দিয়ে রাখতে হবে বলেই তাই করে। আর তো কোনো কারণ আমি দেখি না। দুই-তিন কোটি শিক্ষক থাকলে কি অসুবিধা হবে আমাদের? এগুলো হওয়া পর্যন্ত বাস্তবতা বিবর্জিতই মনে হবে। কারণ, তোমার কাছে তো বাস্তবতা ১১ কোটি। কেন পারেননি, সেই প্রশ্নে তার জবাব, একটা পর্যায়ে এসে এগুলো আমাদের রিয়ালাইজেশনে ছিল না। আমরা প্রাইমিনিস্টার হতে চেয়েছিলাম। তাহলে কি আরেকটা একাত্তরের প্রয়োজন? তার জবাব, একাত্তর কেউ ঘটায়নি, এখনো একাত্তর আছে। তবে কে ঘটাবে? ওই সময়ে যদি বিপ্লবী জাতীয় সরকার হতো তাহলে সবাই টের পেত। ওটাই তো আমরা করতে পারলাম না। পরিবর্তন! পরিবর্তনের একটা নিয়ম আছে। আমি হয়ে গেছি প্রধানমন্ত্রী, আমি হতে চাই না, তবু আমি হয়ে গেছি। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় না এসেও অনেক কিছুই করতে পারতেন। ক্ষমতা না নিয়া যদি কোনো কিছু করার ক্ষমতা না থাকে, তাহলে তো ক্ষমতা হলো না। তাহলে নেতা আর অপারেটরে পার্থক্য কী?
তাহলে কী হবে? ভিন্ন চিন্তাভাবনা তো অবশ্যই করতে হবে। ডিফারেন্ট টাইপ অব ট্রিটমেন্ট লাগবে। বলছিলেন পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করা মানুষটি।
দীর্ঘ সংগ্রাম, তাহলে কি ভুল কিছু হয়েছে? এর উত্তরে রহস্যপুরুষ খ্যাত বর্ষীয়ান এই নেতা দাবি করেছিলেন, করতে না পারাটা ভুল না, করতে পারাটা সঠিক। আমি ভুল ত্রুটিটা, এভাবে বলি। যেটা চেয়েছিলাম, সেটা পাইনি, এটা মনে করাটাও ঠিক না। স্থানকালপাত্রভেদে সবকিছুর পরিবর্তন হয়। এই মনোভাবটা থাকা উচিত।
দীর্ঘ আড্ডায় শেষ প্রশ্ন ছিল, আপনার পুরো বায়োগ্রাফি জাতির জন্য রেখে যাবেন না? তিনি বলেছিলেন, আমার মৃত্যুর পর পাবা। ‘আমার সীমাবদ্ধতা’ শিরোনামে একটি বই আমি রেখে যাব। তোমাদের জন্য। ইংরেজি ভার্সনেও এ বই প্রকাশ হবে মাই বাইন্ডিংস নামে।
বিদায়ে জানানোর সময় তার লেখা বাঙালির তৃতীয় জাগরণ বইটা পড়ে আবার দেখা করতে বলেছিলেন মুজিব বাহিনীর তুখোড় এই নেতা। কিন্তু তার আগেই রহস্যে ঘেরা এ পুরুষ রহস্য রেখেই ওপারে চলে গেলেন।
