অন্ধকার গলিতে সন্ত্রাসীদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ গেল জামালপুরের বকশিগঞ্জ উপজেলার সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিমের। তাকে অন্ধকার গলিতে নিয়ে গিয়ে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নাদিমের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে।
শুক্রবার (১৬জুন) সকাল ১০টার দিকে বকশিগঞ্জ পৌর শহরের নুর মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে সাংবাদিক নাদিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি উপজেলার নিলক্ষিয়া ইউনিয়নের গোমেরপাড়া এলাকায় নেয়া হয়। সেখানে জিগাতলা মাঠে দ্বিতীয় জানাজা নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
নিহত সাংবাদিক নাদিমকে শেষ দেখার জন্য তার বাড়িতে মানুষের ঢল নামে। প্রচুর ভীড় মধ্যে চোখে পড়ে বাড়ির উত্তর কোনে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন এক মধ্য বয়স্ক নারী। তিনি নিহত সাংবাদিক নাদিমের মা আলেয়া বেগম। তিনি বলেন, আমার বাবা (ছেলে) সাহসী সাংবাদিক ছিল। সে সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখত এবং পত্রিকায় প্রকাশ করতো। বাবু চেয়ারম্যানের নারী কেলেঙ্কারি নিয়েও সে লিখেছিল। এ সংবাদ প্রকাশের জের ধরে সে আমার বাবাকে হুমকি দিয়েছিল। তারপরে আমার বাবা প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিরাপত্তা চেয়ে ফেসবুকে আবেদন দিয়েছিল। বাবু চেয়ারম্যান আমার বাবাকে (ছেলে) খেয়ে ফেলেছে। আমি আমার বাবার হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।
এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বৃহস্পতিবার (১৫ জুন) গভীর রাত পর্যন্ত ৬জনকে আটক করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি। সাংবাদিক নাদিম হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছে তার পরিবারের লোকজন ও সহকর্মীরা।
এ ঘটনায় আটককৃতরা হলো, গোলাম কিবরিয়া (সুমন), মো.তোফাজ্জল, মো.কফিল উদ্দিন, মোহাম্মদ আয়নাল হক, মো.শহিদ ও ফজলুল হক। তাদের সবার বাড়ি বকশিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে। আটকৃতদের মধ্যে গোলাম কিবরিয়া সুমনের বাড়ি বকশিগঞ্জ পৌর শহরের পাটহাটি এলাকায়। যেখানে হামলার ঘটনাটি ঘটে। তিনি যুবলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত।
এ হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা হিসেবে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে, তিনি আটক মোহাম্মদ আয়নাল হক। সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুর খুব ঘনিষ্ঠ হিসেবে পিরিচিত তিনি। বাকি চারজনের রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকে চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের লোকজন পলাতক রয়েছে।
এদিকে এ হত্যাকাণ্ডের সাথে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নিয়েছিল বলে পুলিশের এক কর্মকর্তা একটি গণমাধ্যমে বলেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হামলার ঠিক আগ মুহূর্তে (বুধবার রাতে) প্রায় ৩০টি মোটরসাইকেল উপজেলার পাটহাটি মোড়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। আনুমানিক রাত ১০টার দিকে সাংবাদিক নাদিমের মোটরসাইকেল অতিক্রম করার সময় আগেই অবস্থান নেওয়া হামলাকারীরা তাকে টেনে মোটর সাইকেল থেকে ফেলে দেয় এবং মারধর করতে করতে অন্ধকার গলিতে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে। তার মাথা ইট দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয়।
পরে তারা পালিয়ে গেলে স্থানীয় লোকজন সাংবাদিক নাদিমকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। উপজেলা কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক অবস্থা সঙ্কটাপন্ন দেখে রাতেই তাকে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। পরের দিন সকালে জামালপুর হাসপাতাল থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাংবাদিক নাদিম মারা যান।
পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নাদিমের মরদেহ বকশিগঞ্জ উপজেলার গরুর হাটি কাচারীপাড়া এলাকায় তার নিজ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এ সময় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিমের সহকর্মী প্রত্যক্ষদর্শী আল মুজাহিদ বাবু বলেন, ‘সাধুরপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলমের অপকর্ম নিয়ে গোলাম রব্বানী নাদিমসহ আমরা কয়েকজন প্রতিবেদন করেছিলাম। তারপর থেকেই নাদিমের ওপর ক্ষুদ্ধ ছিলেন তিনি। আমাদের নামে ডিজিটাল আইনে মামলাও করেন তিনি। মামলাটি ময়নসিংহের সাইবার ট্রাইব্যুনাল খারিজ করে দিয়েছে। এ নিয়ে সাংবাদিক নাদিম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। এ স্ট্যাটাস দেওয়ার দুই থেকে তিন ঘন্টা পর রাতে মামলার বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতে গোলাম রব্বানী নাদিম আর আমি বাড়ি ফিরছিলাম। আমরা পৌর শহরের পাটহাটি এলাকায় পৌঁছা মাত্রই সন্ত্রাসীরা নাদিমকে পিছন থেকে টান দিয়ে মোটর সাইকেল থেকে নামিয়ে ফেলে মারধর শুরু করে। এ সময় আমি সন্ত্রাসীদের হাত থেকে নাদিমকে বাঁচাতে গেলে তারা আমাকেও মেরে ফেলবে বলে হুমকি দেয় এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। হামলাকারীরা সবাই চেয়ারম্যানের নিজস্ব লোকজন ছিল। এ ঘটনার সময় চেয়াম্যান মাহমুদুল আলম বাবু পাশের একটি অন্ধকার গলিতে দাঁড়িয়েছিলেন। ওই গলিটি সিসিটিভি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা ওই অন্ধকার গলির একটি দেওয়ালে লাথি মেরে দেওয়াল ভেঙে ফেলে। সেই দেওয়ালের ইট দিয়ে তার মাথা থেঁতলে দেয়। তিনি সাংবাদিক নাদিম হত্যার সর্বচ্চো শাস্তির দাবি করেন।
এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জামালপুর অনলাইন জার্নালিষ্ট নেটওয়ার্কের সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘এ হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিতভাবে সংগঠিত করা হয়েছে। তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের মুলহোতা মাহমুদুল আলম বাবু ও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। সাংবাদিক নাদিম হত্যার সুষ্ঠ বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।
বকশিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত (ওসি) মো.সোহেল রানা বলেন, ‘সিসিটিভির ফুটেজ দেখে এরইমধ্যে ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিভিন্নজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ায় অপরাধীরা দ্রুত গাঁ ঢাকা দিয়েছে। তবে তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে বাকিদের গ্রেপ্তার করা চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
