ইউনেসকোর প্রথম নারী মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা বলেছিলেন, সব হত্যাই বেদনাদায়ক, কিন্তু যখন কোনো সাংবাদিকের মৃত্যু হয়, তখন জনগণ তার পক্ষে কথা বলার একটি কণ্ঠস্বর হারায়। ব্যাপকভাবে গণতন্ত্রের চর্চা আছে এমন দেশের ক্ষেত্রে এ কথার অর্থ যতটা পরিষ্কার হয়, আমাদের দেশে সেভাবে উপলব্ধি হতে দেখা যায় না। কারণ এখানে সরকারি পর্যায় থেকে সাংবাদিকদের হাত-পা বেঁধে রাখার নানা প্রস্তুতি দেখা যায়। শুধু আইন করেই যে সাংবাদিকদের বেঁধে রাখা হয় তা না। বরং অদৃশ্য অনেক চাপ থাকে। সেসব চাপের মুখে সাংবাদিকরা যে আইনি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা পাওয়ার কথা তাও পান না। ফলে তাকে একা হয়ে যেতে হয়। অনেক সময় সহকর্মীরাও তাকে উপযুক্ত সমর্থন দিতে পিছপা হন।
জামালপুরের বকশীগঞ্জে দুর্বৃত্তদের বর্বর হামলার শিকার বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জেলা প্রতিনিধি গোলাম রাব্বানী নাদিমের মৃত্যুর ঘটনা খেয়াল করলেই বিষয়গুলো পরিষ্কার হয়ে যাবে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করার কারণে তিনি হুমকির মধ্যে ছিলেন। ফেসবুকে এক ভিডিওতে দেখলাম তিনি আগে থেকেই নিরাপত্তা দাবি করে আসছেন। কিন্তু কে তাকে নিরাপত্তা দেবে? এত সময় কোথায় পুলিশ বা প্রশাসনের। সাংবাদিকদের কী এমন গুরুত্ব আছে সমাজে বা রাষ্ট্রে? উপরন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামক খাঁড়ার ঘাও তাকে পোহাতে হয়েছিল জীবিতকালে।
শুধু নাদিমের মৃত্যু নয়, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন যে, সাংবাদিকদের ‘দুই পয়সার দাম নেই’। অথচ একজন সাংবাদিক নিজের খবর প্রচার করেন না। তিনি মানুষের কষ্ট, দুর্দশা, হাসি-আনন্দ-বেদনার খবর ছাপেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও রাষ্ট্র ও সমাজে ঘটে যাওয়া অনিয়ম-দুর্নীতিকে জনসম্মুখে নিয়ে আসেন। অথচ তার না আছে জীবনের মর্যাদা না আছে নিরাপত্তা। আর্থিক অবস্থাও সঙ্গীন। তারপরও দেখা যায় কোনো তরুণ সত্যিকার অর্থে মানুষের কল্যাণে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। তা ছাড়া সাংবাদিকতার চাকরি মানে সাত দিন-চব্বিশ ঘণ্টা। প্রাপ্তিহীন অক্লান্ত পরিশ্রম। আমাদের মতো দেশে মানুষের সংখ্যা এবং তাদের সংকটের পরিমাণ ভাবতে বসলে পশ্চিমা দেশের কোনো সাংবাদিকের চোখ কপালে উঠে যাবে। সড়ক দুর্ঘটনা, নারী নির্যাতন, নদী দখল খবরের শেষ নেই। এসব খবরের পেছন ছুটতে ছুটতে যে জানটাও চলে যেতে পারে জেনেই এখানে তরুণরা এ পেশায় আসেন। তারা সমাজের অভ্যন্তরে শ্রেণিভেদ, বৈষম্য, অনাচার একদিন দূর করতে একটা স্বপন নিয়ে যুক্ত হন সাংবাদিকতায়।
সাংবাদিকতায় চাকরির সুবাদে প্রতিদিন অসংখ্য মৃত্যুর সংবাদ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে হয়। কে মারা গেল, কেন মারা গেল, কে মারল, নাম-পরিচয়, স্বজন-পুলিশ কী বলছে? অজস্র তথ্যের সন্নিবেশ ঘটাতে হয়। অনেক মৃত্যু থাকে দেশ কাঁপানো। দিন-রাত সেই মৃত্যুর সঙ্গে লেগে থাকতে হয়। সঠিক, নির্ভুল তথ্য যেন পায় পাঠক তার দিকে ক্লান্তিহীন নজর রাখতে হয়। পোড়া, ক্ষতবিক্ষত, বিকৃত মৃতদেহের ছবি দেখে যেতে হয় নির্বিকার। মাঝে মাঝে কিছু মৃত্যুতে ক্ষোভ, রাগ, শোককে চাপা দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে যেতে হয়। কখনো কোথাও আগুন লাগলে, ভবন বা ভূমিধস হলে কোমর সোজা করে বসে থাকতে হয় সার্বক্ষণিক সর্বশেষ কী পরিস্থিতি তা জানানোর জন্য। আর যারা রিপোর্টিং করেন, তাদের তো মানসিক আর শারীরিক পরিশ্রম আরও কঠিন। আগুন, ধোঁয়া, রক্তাক্ত অথবা পোড়া মৃতদেহ, স্বজনদের আহাজারি, উদ্ধার কার্যক্রমের হুজ্জত থেকে নিজের অফিসে সঠিক সংবাদটা তাদের পাঠাতে হয়। লাশের পেছন পেছন ছুটতে হয় মর্গে। স্বজনদের কান্না, বিবমিষার সামনে দাঁড়িয়ে পরম নিষ্ঠায় নিজের কাজটুকু করে যেতে হয়।
কিন্তু একজন সাংবাদিককে যদি মেরে ফেলা হয়, তখন? এর ভারও একান্ত সাংবাদিকদের বহন করতে হয়। অন্য সব সংবাদের মতো হয়ে পড়ে সেই হত্যা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে না। চাঞ্চল্য জাগায় না। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে অবশ্য বেশ আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এ দুই নির্ভীক সাংবাদিককে হত্যার মামলার বর্তমান পরিস্থিতি সবাই জানে। কারা হত্যা করেছে, কেন করেছে কেউ এত বছরেও জানতে পারেনি। এমনকি অভিযোগপত্রও দিতে পারেনি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। আরও অনেক সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন। তাদের নামও কেউ আমরা মনে করতে পারব না। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বিভিন্ন সময়ে দেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের তথ্য প্রকাশ করে। কিছু কিছু নির্যাতনের ঘটনা অবশ্য বেশ হইচই তৈরি হয়। দেশের নানা শ্রেণিপেশার মানুষকে তখন কথা বলতে দেখা যায়। এর বেশির ভাগই ঘটে আলোচিত পত্রিকা বা সাংবাদিকের ক্ষেত্রে। পুকুর যেমন আলোড়ন ওঠার পর শান্ত হয়ে যায় আবার, সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটে। আবার সব চুপচাপ থাকে নতুন কোনো নিপীড়ন না ঘটা পর্যন্ত।
গত বছর নভেম্বরে দেশে এক সাংবাদিকের ওপর নিপীড়নের ঘটনায় করা প্রতিবেদনে বিবিসি বাংলা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বরাত দিয়ে জানায়, নির্যাতনকারীদের জন্য সরাসরি কোনো দায়মুক্তির আইন না থাকলেও প্রভাবশালী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে সহজে ব্যবস্থা নিতে চায় না আইনি সংস্থাগুলো। ফলে সাংবাদিকদের ওপর সংঘটিত অপরাধ অনেকটা বিচারহীন থেকে যায়। তথ্য ও মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন আর্টিকেল নাইনটিন বলেছে, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের প্রতিকার চাওয়ার মতো সরকারি কোনো ব্যবস্থা নেই। নিপীড়নের শিকার হলে তাদের প্রচলিত আইনের মাধ্যমে যেতে হবে। সংগঠনটির দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সল বলেছেন, ‘পাকিস্তানের মতো দেশে দুটি প্রভিন্সে জার্নালিস্ট প্রোটেকশন ল আছে, যেটা আমাদের দেশে নেই। এটা অত্যন্ত লজ্জার। এ ধরনের আইন থাকা খুবই দরকার। বরং (বাংলাদেশে) সাংবাদিক নির্যাতন করার আইন প্রচুর আছে, কিন্তু সাংবাদিককে রক্ষা করার কোনো আইন নেই।’
বাংলাদেশের সাংবাদিকদের অবস্থা অবশ্য এর চেয়েও করুণ। গোলাম রাব্বানী নাদিমের মৃত্যুর খবর প্রকাশের ক্ষেত্রেও দেখা যায় রাখ-ঢাক করতে হয়েছে। সাংবাদিক নাদিমকে হত্যা মামলার প্রধান আসামি বাবু চেয়ারম্যানের নাম খবরে প্রকাশ পায় বিলম্বে। পরিস্থিতি এমন মনে হয়েছে যে, পুলিশ, প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে আপত্তি না থাকায় সাংবাদিকরা নাম প্রকাশ করতে পেরেছেন। এই বাবু চেয়ারম্যান দুবারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। নির্বাচন নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন আছে দেশের সর্বত্র। তারপরও একজন জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বে সাংবাদিককে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে মেরে ফেলা হবে এ কোন দেশে আমরা বাস করছি? নাদিম একজন নারীর সঙ্গে বাবু চেয়ারম্যানের প্রতারণা, অমর্যাদা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন। এতেও প্রমাণ হয় যে, সাংবাদিকরা কতটা নিঃস্বার্থ, পরোপকারী একটি পেশায় যুক্ত আছেন। একজন নারীর মর্যাদা রক্ষায় নিজের জীবন বিপন্ন করতেও কুণ্ঠা নেই সাংবাদিকের। সেই সংবাদ প্রকাশের জেরে তাকে প্রথমে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। তখনো বাবু চেয়ারম্যান বহালতবিয়তে ছিলেন। নাদিম মারা না গেলে তো মনে হয় না বাবু চেয়ারম্যানের টিকি স্পর্শ করা যেত। জামালপুরের পুলিশ সুপারের বক্তব্যেও তার আঁচ পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন, নাদিমকে হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, সতর্ক করতে আঘাত করা হয় (দেশ রূপান্তর অনলাইন)।
সাংবাদিকদের বর্তমান অবস্থাও নাজুক। নিজের সহকর্মীকে হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতে তাদের অপারগতা হতে হয়। ‘দুর্বৃত্ত’ শব্দের আড়ালে গোপন করতে হচ্ছে অভিযুক্তদের। কে যেন একবার বলেছিলেন, সাংবাদিকদের বর্তমান অবস্থা হলো হাত-পা বেঁধে কুমিরভর্তি পুকুরে ফেলে দেওয়ার মতো। এক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনই যথেষ্ট সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করে রাখতে। এ আইনে নিপীড়নের ঘটনাও কম নয়। আইনটি স্থগিতে সরকারের প্রতি জাতিসংঘ অনুরোধ জানিয়েছে। তবে দেশের অভ্যন্তরে সাংবাদিকদের দাবি এটি বাতিলের। সরকার অবশ্য কারও কথাই শুনতে চায় না। তারা বলছে আইনটি সংস্কার করবে। সংস্কার করলে মামলার পরপরই গ্রেপ্তারের যন্ত্রণায় পড়তে হবে না সাংবাদিককে। কিন্তু তাতে কি তার সংবাদ প্রকাশ বাধাহীন হবে?
এ পরিস্থিতিতে বারবার শুধু মনে হচ্ছে, একজন সাংবাদিককে হত্যা করলে কার কী যায়-আসে! কিছু বিবৃতি, মানববন্ধন, ক্ষুব্ধ মতপ্রকাশের পর আবার সব স্বাভাবিক হতে থাকবে। একজন সাংবাদিকের মৃত্যু মানে যে জনগণেরই কণ্ঠস্বর রোধ করে দেওয়া, সেই গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি আমাদের দেশে তৈরি হয়নি। সেটা কোনো দিন তৈরি হবে এ আশায় তবু তাকিয়ে থাকি।
লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
