বরফ গলাতে চীনে ব্লিঙ্কেন

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৩, ১১:০৮ পিএম

দ্বিপক্ষীয়-আন্তর্জাতিক প্রায় সব বিষয়ে কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তিক্ততা চলছে চীনের। এই তিক্ততাকে এক প্রকারের অঘোষিত শীতল যুদ্ধই বলা যায়। চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ অর্থনীতির দেশ। অন্যদিকে দেশটি সামরিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে চীনকে উপেক্ষা করার উপায় নেই কারও। এটা পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ভালো করেই জানে। তাই যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সঙ্গে সংলাপ চেয়ে আসছে। দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের আশায় অবশেষে বেইজিং যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। গত ফেব্রুয়ারিতেই ব্লিঙ্কেনের এই সফরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র একটি চীনা বেলুনকে গুপ্তচর সন্দেহে ভূপাতিত করার পর ব্লিঙ্কেনের সেই সফর বাতিল করা হয়। পরিকল্পিত বেইজিং সফর স্থগিত করে তা পুনর্নির্ধারণ করা হয়।

এখন এ সফর কীজন্য, এ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গত শুক্রবার ব্লিঙ্কেন জানান, তার চীন সফরের প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ও পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট এসব বোঝাপড়ার সংকট এড়িয়ে আরও ভালো যোগাযোগ স্থাপন করা। গত শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে ব্লিঙ্কেন বলেন, ‘তীব্র প্রতিযোগিতার জন্য টেকসই কূটনীতির প্রয়োজন যাতে করে প্রতিযোগিতা দ্বন্দ্ব বা সংঘাতের দিকে না যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের কাছে বিশ্ব এটাই প্রত্যাশা করে।’

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও মূল্যবোধের পরম্পরা স্পষ্ট করা এবং তৃতীয়ত, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে লড়াই এবং জলবায়ু ও স্বাস্থ্য সমস্যাসহ বিশ্বকে প্রভাবিত করা সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করা।

চীনের হাতে আটক যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিষয়টিও তিনি উত্থাপন করবেন বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০১৬ সালে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী কাই লি এবং ২০০৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যাজক ডেভিড লিনসহ বিভিন্ন অভিযোগে বেশ কয়েকজন নাগরিক চীনে আটক রয়েছেন।

সফরে বেইজিং পৌঁছে আজ রবিবার ও আগামীকাল সোমবার চীনা প্রেসিডেন্ট এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ব্লিঙ্কেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিভাগের প্রতিনিধি ড্যানিয়েল ক্রিটেনবিঙ্ক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে কথা বলেছেন সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সঙ্গে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে যেসব ‘ভুল বোঝাবুঝি’র সৃষ্টি হয়েছে, সেসব দূর করতে যথাযথ একটি কার্যকর ‘যোগাযোগ চ্যানেল’ গঠনের প্রস্তাব বেইজিংকে দেওয়াই ব্লিঙ্কেনে এ সফরের প্রধান উদ্দেশ্য। কারণ, যদি একটি কার্যকর যোগাযোগ চ্যানেল দুই দেশের মধ্যে না থাকে, সে ক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের এ দুই ‘সুপার পাওয়ার’ শক্তির সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঘোর আশঙ্কা রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ব্লিঙ্কেনের চীন সফরে দুই দেশের সম্পর্কের জমাট বরফ গলে যাবে এমন আশা করার সুযোগ নেই। তবে এ সফর অন্তত দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য হলেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ব্লিঙ্কেনের এ সফরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার পা পড়বে চীনের ভূমিতে।

যুক্তরাষ্ট্রের থিংকট্যাংক সংস্থা ব্রুকিং ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক রায়ান হাস মনে করেন, ‘বেইজিং এবং ওয়াশিংটন উভয়ই তাদের মধ্যকার কূটনৈতিক তিক্ততা ও স্থবিরতার অবসান চায়। অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সফরকে উভয় দেশের এই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের ‘প্রাথমিক পর্যায়’ বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। আল জাজিরাকে রায়ান হাস বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট বাইডেন এবং প্রেসিডেন্ট শি’ দুজনেই ভালোভাবে জানেন যে এই দ্বন্দ্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্র বা চীন কেউই লাভবান হবে না। আবার একই সঙ্গে, বন্ধুত্বের হাতকে প্রথম বাড়িয়ে দেবেন তা নিয়েও দ্বিধা রয়েছে দুজনের মনে। তাই ব্লিঙ্কেনের এ সফর হলো দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক পর্যায়ে আনার প্রক্রিয়ায় প্রবেশের একটি সুযোগ। অবশ্য আমরা এখনো জানি না, বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বজায় রাখা দুই দেশ এই সুযোগ গ্রহণ করবে কি না। অনাগত সময়ই তা বলতে পারে।’ 

যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক ডেভিড র‍্যাঙ্ক বলেন, ‘আমার মনে হয়, এই সফরের একমাত্র তাৎপর্য দিক হলো, পাঁচ বছর পর দুই শক্তিধর দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। এই পর্যায়ে কেউই কারও প্রতি সুর নরম করে কথা বলবে না। খোলাখুলি বলতে গেলে চীন সব সময় যুক্তরাষ্ট্রকে অস্বস্তিতেই রাখতে চাইবে।’

এদিকে আলোচনাকে স্বাগত জানালেও চীন সাফ বলে দিয়েছে, এতে দুই পক্ষের সমান মর্যাদা বজায় থাকতে হবে। অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপ না করতেও সতর্ক করে দিয়েছে দেশটি। এ বিষয়ে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ওয়েবিন বলেন, ‘আলোচনার জন্য চীনের দুয়ার সব সময়ই উন্মুক্ত। তবে বেইজিংয়ের উদ্বেগের জায়গাগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান করতে হবে। এ ছাড়া প্রতিযোগিতার নামে আমাদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।’

এ সফর এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ, তাইওয়ান, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চীনা বেলুন ও দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে উত্তেজনার চরম পর্যায়ে ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্ক। এ ছাড়া এই গত মাসেই দক্ষিণ চীন সাগরের আন্তর্জাতিক আকাশ সীমা এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি নজরদারি উড়োজাহাজের সঙ্গে চীনের টহল-বিমানের প্রায় মুখোমুখি সংঘর্ষ বেধে যাচ্ছিল; পরে শেষ মুহূর্তে বিমানচালকদের ব্যাপক চেষ্টায় সেই দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে। পরে যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ড এ সম্পর্কিত এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘চীনা বিমানচালকের ‘অপ্রয়োজনীয় বেপরোয়া’ বিমান চালনাই সেই ঘটনার জন্য দায়ী।

ব্লিঙ্কেনের সফরের আগে জুনের প্রথম দিকে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা সম্মেলনে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লি শাংফুর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু সেই বৈঠকে বসতে রাজি হয়নি বেইজিং। এ ব্যাপারে চীনের এক মুখপাত্র বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানে কেন বর্তমানে সামরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছে। সে সময় অস্টিন চীনের এমন সিদ্ধান্তকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘চীন সম্প্রতি আমাদের বিমান এবং মিত্রদের বিমানকে উসকানিমূলকভাবে বাধা দেয়, যা খুবই উদ্বেগজনক ছিল। আমি এমন ঘটনা নিয়ে উদ্বিগ্ন, যেটি খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।’

জবাবে এক সংবাদ সম্মেলনে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের উচিত অবিলম্বে নিজেদের ভুলচর্চার সংশোধন ও আন্তরিকতা প্রদর্শন করে দুই পক্ষের সামরিক যোগাযোগের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা।’

এই যখন দুই দেশের সম্পর্ক, তখন ব্লিঙ্কেনের এ সফর নিয়ে খুব বেশি আশা করা যায় না। তবু পশ্চিমা বিশ্লেষকরা আশা করে বলেছেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বরফ গললে তা স্বস্তি দেবে পুরো বিশ্বকেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত