ওয়ালটনের মাধ্যমে রেফ্রিজারেটর রপ্তানিকারী দেশ বাংলাদেশ

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৩, ১২:৩৪ এএম

একসময় ফ্রিজ, টিভি, এসিসহ সব ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্যই আমদানি হতো। ২০০৭ সালে ওয়ালটন দেশেই ফ্রিজ উৎপাদন প্ল্যান্ট গড়ে তোলে। পরের বছর থেকেই পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যায় ওয়ালটন। এর মাধ্যমে দেশের ইলেকট্রনিকস শিল্প উৎপাদন খাতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। ওয়ালটনের মাধ্যমে দেশে তৈরি আন্তর্জাতিক মানের পণ্য দিয়ে আমদানিকারক দেশ থেকে প্রথমে উৎপাদনকারী এবং এরপর বাংলাদেশ রপ্তানিকারী দেশে পরিণত হয়। দেশ রূপান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন তথ্য জানান দেশে ফ্রিজের বাজারের সিংহভাগ মার্কেট শেয়ারের অধিকারী ওয়ালটন রেফ্রিজারেটরের চিফ বিজনেস অফিসার তোফায়েল আহমেদ।

বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজারে বছরে ফ্রিজের চাহিদা ও বাজারের আকার প্রসঙ্গে তোফায়েল আহমেদ জানান, দেশে ফ্রিজের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে দেশে ফ্রিজের প্রায় ১০-১২ হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে। প্রতি বছর ৭ শতাংশ হারে বাজারটি বড় হচ্ছে। দেশের বছরে প্রায় ৩০ লাখ ফ্রিজের চাহিদা রয়েছে। এ বাজারের বড় অংশই দেশীয় কোম্পানিগুলোর দখলে। ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ ওয়ালটনের দখলে। আর ফ্রিজের বাজারের ক্ষেত্রে প্রায় ৭০ শতাংশই বর্তমানে ওয়ালটনের দখলে।

ফ্রিজশিল্পে বাংলাদেশের বৈশ্বিক সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ফ্রিজশিল্পে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশের চাহিদার পুরোটাই ওয়ালটনের জোগান দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। ওয়ালটন বরাবরই চেয়েছে ইলেকট্রনিকস সেক্টরে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ করে এ খাতকে রপ্তানিমুখী সেক্টরে পরিণত করতে। আমাদের উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সে লক্ষ্য অর্জনে আমরা সফল হয়েছি। ফ্রিজশিল্পে বিপুল বৈশ্বিক সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা সেই সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান গড়তে কাজ করছি। ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোতে রপ্তানি কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছি।

বাংলাদেশ থেকে ফ্রিজ রপ্তানি নিয়ে ওয়ালটনের পরিকল্পনা কী এমন প্রশ্নে ওয়ালটনের এই কর্মকর্তা জানান, দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে তৈরি ফ্রিজসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্য রপ্তানি করা। এজন্য আমরা বিভিন্ন দেশের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী প্রোডাক্ট ডেভেলপ করেছি। ইতিমধ্যেই বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে ফ্রিজসহ ওয়ালটনের বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। ২০২২ সালে আমাদের বিক্রীত ফ্রিজগুলোর মধ্যে ৯ শতাংশের বেশি রপ্তানি থেকে এসেছে। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে, অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বের প্রধান দেশগুলোতে ফ্রিজসহ অন্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা। দেশের মতো বিশ্ববাজারেও শীর্ষ ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়া।

ফ্রিজ তথা ইলেকট্রনিক শিল্প এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের বিদ্যমান সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে মনে করেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন করে করারোপ করা হয়নি। আগের সুবিধাগুলো বহাল রাখা হয়েছে। উৎপাদন পর্যায়ে আংশিক ভ্যাট অব্যাহতি রয়েছে। সরকারের দেওয়া নীতি-সহায়তা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এখন রেফ্রিজারেটর উৎপাদন শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিশ্বের সর্বাধুনিক রেফ্রিজারেটর এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। লাক্সারি সেগমেন্টের পণ্যও এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রেফ্রিজারেটর রপ্তানি হচ্ছে। সুতরাং কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে তৈরি করা রেফ্রিজারেটর আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। এ বিষয়টিতে আমাদের এখন দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও গবেষণায় ওয়ালটনের বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, ২০০৮ সাল থেকে প্রোডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের পাশাপাশি ওয়ালটন শুরু থেকে পণ্যের গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছে। রেফ্রিজারেটরের গবেষণা ও উদ্ভাবনে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ওয়ালটনের রয়েছে সবচেয়ে বড় আরঅ্যান্ডআই (রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন) সেন্টার। যেখানে সর্বোত্তম কোয়ালিটির পণ্য আরও সাশ্রয়ী মূল্যে কীভাবে দেওয়া যায় সেটা নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা চলছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতার চাহিদা ও রুচি অনুযায়ী আমরা ফ্রিজের ডিজাইন ও ফিচার আপডেট করছি। আমরা প্রতিনিয়তই আমাদের দেশের আবহাওয়ার ধরন অনুযায়ী এবং কনজ্যুমার বিহেভিয়র অনুযায়ী প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট করে আসছি। এ ছাড়া পণ্যের এনার্জি ইফিশিয়েন্সি বৃদ্ধির ব্যাপারেও নিরন্তর গবেষণা হচ্ছে । সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ায় ওয়ালটনের রিসার্চ ও ইনোভেশন সেন্টার চালু করা হয়েছে। আমাদের আরঅ্যান্ডআইয়ের যে সক্ষমতা তা যেন দেশের এবং দেশের মানুষের কাজে লাগে এটা নিশ্চিত করছি আমরা। থ্রিডি এমএসও, বিশ্বের প্রথম নাইন-ইন-ওয়ান কনভার্টিবেল মোড, ওয়াইড ভোল্টেজ রেঞ্জ, সিন্থো ফ্রেস, থ্যালেট ফ্রি গ্যাসকেটসহ ইনোভেটিভ সব ফিচার এবং প্রোডাক্ট ভ্যারিয়েন্ট এটার বড় প্রমাণ।

পণ্যের উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে তোফায়েল আহমেদ জানান, সম্প্রতি আমরা বিশ্বের প্রথম নাইন-ইন-ওয়ান কনভার্টিবেল মোডের ফ্রিজ উন্মোচন করেছি। একই সঙ্গে আমাদের রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম উৎপাদন করা ফোর-ডোর রেফ্রিজারেটর। জায়ান্ট টেক সিরিজের এসব ফ্রিজের মধ্য দিয়ে হাই-টেক রেফ্রিজারেটর উৎপাদন ও বিপণনে নতুন যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। স্মার্টফোনের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে জায়ানটেক সিরিজের এসব ফ্রিজ পরিচালনা করার পাশাপাশি স্মার্ট কন্ট্রোল, ইউটিউব ব্রাউজিং, অনলাইন গ্রোসারি শপিং, অফলাইন ভিডিও ও অডিও, কাউন্টডাউন ক্লক, অনলাইন রেসিপি, ক্লক, ক্যালেন্ডার, ইন্টারনেট ব্রাউজিং, সেলফি ক্যামেরা, ওয়েদার আপডেট ইত্যাদি প্রযুক্তি ও ফিচার পাচ্ছেন। রয়েছে টারবো ও ইকো ফিচারসমৃদ্ধ ডুয়ো কুলিং সেটিংস। এসব ফ্রিজের এমএসও (ম্যাট্রিকস স্পিড অপটিমাইজেশন) ইনভার্টার টেকনোলজি বাইরের তাপমাত্রা অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ খরচে ফ্রিজের অভ্যন্তরীণ সর্বোচ্চ কুলিং পারফরম্যান্স নিশ্চিত করে। ভবিষ্যতে আমরা আরও চমকপ্রদ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আসছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত