পণ্যমান ও বিশ্বস্ততা নিয়ে উৎপাদনশীলতার পথে

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৩, ১২:৩৯ এএম

ইলেকট্রনিকস পণ্যের ব্যবহার আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজকের পৃথিবীতে জীবনযাপন ইলেকট্রনিকস ছাড়া চলবে, তা আমরা ভাবতেই পারি না। সকালে জেগে ওঠা থেকে শুরু করে, রান্না থেকে গান শোনা পর্যন্ত, সবকিছুতেই কোনো না কোনোভাবে ইলেকট্রনিকস বা ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহারে আমরা অভ্যস্ত। সময় বাঁচানো ছাড়াও কাজের পরিধিকে সহজ করে দিয়ে এটি জীবনযাপনকে করেছে সহজসাধ্য।

ইলেকট্রনিকস সেক্টর বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল একটি ক্ষেত্র। পরিসংখ্যানগতভাবে, সারা দেশে ইলেকট্রনিকস সম্পর্কিত ব্যবসাগুলোতে নিযুক্ত ব্যক্তিদের সমন্বয় করে ৩,০০০-এরও বেশি ব্যবসায় চালু রয়েছে এবং প্রতি বছর এই খাতটি ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে যা প্রায় এক কোটিরও বেশি লোকের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের ইলেকট্রনিকস বাজারের প্রায় ৬৫ শতাংশ অংশীদার দেশি ব্র্যান্ডের কোম্পানিগুলো। একসময় আমদানির ওপর নির্ভরশীল হলেও বর্তমানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, এমন রেফ্রিজারেটর ব্র্যান্ডগুলো ধীরে ধীরে স্থানীয় বাজারের বড় অংশ অর্জন করছে। বর্তমানে দেশি ব্র্যান্ডের সময়োপযোগী ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কারণে বাজারে ক্রেতার কাছে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। তা ছাড়াও মূল্য খুব প্রতিযোগিতামূলক থাকায়, ক্রেতারা দেশি ব্র্যান্ডের প্রতি ঝুঁকছেন।

র‌্যাংগ্স ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের সঙ্গে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর আওতায়, সিলেট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাইটেক পার্কে ৩২ একর জমি বরাদ্দ পেয়েছে র‌্যাংগ্স। এ বছরই এই হাইটেক পার্কে উৎপাদন শুরু হচ্ছে এবং ২০২৪ সাল নাগাদ পূর্ণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। এই হাইটেক পার্কে পণ্যের লাইন আপের মধ্যে শুরুতেই রয়েছে রেফ্রিজারেটর, এসি ও টিভি। বার্ষিক পাঁচ লাখ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে যাত্রা শুরু করবে এই প্রজেক্ট। র‌্যাংগ্স তার নিজস্ব প্রোডাক্ট, রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্ট, ট্রেনিং ও আফটার সেলস সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের সহায়তায় নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে যুগোপযোগী পণ্য ক্রেতার নাগালে নিয়ে আসার জন্য বদ্ধপরিকর।

দেশীয় ব্র্যান্ডের মধ্যে হাতে গোনা সাত-আটটি ব্র্যান্ড-ই শুধু উৎপাদনকারী হিসেবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাকিরা সংযোজনকারী হিসেবে কাজ করছে। এখন বেসিক, স্মার্ট, এন্ড্রয়েড ইত্যাদি টিভি; ফ্রস্ট-নন ফ্রস্ট ফ্রিজ; ইনভার্টার-নন ইনভার্টার এসি এবং হোম এপ্ল্যায়েন্স উৎপাদন হচ্ছে। আমরা নতুন প্রযুক্তিসম্পন্ন নতুন নতুন মডেলের সনি ও র‌্যাংগ্স এলইডি টিভি; কেলভিনেটর ও র‌্যাংগ্স ফ্রিজ, ডিপ ফ্রিজ ও এসি সংযোজন ও বাজারজাতকরণের কাজ করছি।

গত মার্চ মাসেই র‌্যাংগ্সের ৩৯তম প্রতিষ্ঠা দিবস পালিত হয়েছে। র‌্যাংগ্স পরিবারের অভিভাবক, র‌্যাংগ্স ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের প্রয়াত চেয়ারম্যান আকতার হোসেন, বাংলাদেশের জনগণের কাছে প্রযুক্তিকে সাশ্রয়ীমূল্যে ও সহজলভ্য করার লক্ষ্যে একজন তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে এই অসাধারণ প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন। এই গৌরবময় যাত্রায়, র‌্যাংগ্স শুধু নিজস্ব ব্র্যান্ড র‌্যাংগ্স-ই প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং বাংলাদেশে অফিশিয়াল ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে তারা বিভিন্ন বিশ্বমানের ব্র্যান্ডের বাজারও প্রতিষ্ঠা করেছে।

গবেষকদের মতে, বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এর সহযোগী শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন উৎপাদন কর এবং শুল্কের সরকারি নীতি থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য দেশীয় এবং বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর দ্বারা তাদের উৎপাদনকে ধীরে ধীরে স্থানীয়করণের মাধ্যমে আরও বিনিয়োগ বাড়াবে। ফলে এই অভ্যন্তরীণ বাজার বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানির উদ্দেশ্য ও উৎপাদকদের বিনিয়োগ বাড়বে। সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন এবং অন্যান্য হোম এপ্ল্যায়েন্সের বাজার ২০২৫ সালের মধ্যে বার্ষিক ১০ বিলিয়ন ডলারে পরিণত হবে।

স্বাধীনতার আগে দেশের ইলেকট্রনিকস এসেম্বল শিল্প যেখানে রেডিও সেটের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। এখন উচ্চপ্রযুক্তির স্মার্টফোন, ল্যাপটপসহ স্থানীয় ক্রেতার প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের ইলেকট্রনিকস পণ্য এসেম্বল করছে। স্থানীয় উৎপাদকরা যখন রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন এবং অন্যান্য গৃহস্থালি সামগ্রীর মতো পণ্য উৎপাদন করছে, যখন তাদের মূল্য সংযোজক এবং বাজারের প্রতিযোগিতামূলক আমদানি করা পণ্যের মূল্যের মধ্যে অভাবনীয়ভাবে পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। সরকার কর্র্তৃক গৃহীত উৎপাদনবান্ধব নীতিমালা এসব স্থানীয় উৎপাদককে উৎসাহিত করেছে এবং বাজারের প্রবৃদ্ধিকে এতটাই বাড়িয়েছে যে দেশি কোম্পানিগুলো স্থানীয়করণের সুযোগকে পুঁজি করেছে। সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত বর্ধনশীল মধ্যম ও নিম্ন আয়ের ক্রেতার বিশাল স্থানীয় বাজারের জন্য পণ্যপ্রতি দাম অভাবনীয়ভাবে কমিয়ে আনার জন্য কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগে মনোযোগ দিয়েছে। দেশব্যাপী বিদ্যুতায়ন, ক্রমবর্ধমান আয়, জনসংখ্যা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন, ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং একযোগে সহজ ভোক্তা অর্থায়ন বাজারের বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।

স্থানীয় উৎপাদকদের মধ্যে দু-একটি ছাড়া কারোরই রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনারের মূল পার্টসের কম্প্রেশার উৎপাদন করার সক্ষমতা এখনো আসেনি। তাই এই পণ্যের ক্ষেত্রে এখনো এশীয় দেশের মধ্যে চায়না, থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইউরোপের ওপরে নির্ভরশীল। এলইডি টিভি, ওভেনসহ হোম ও কিচেন এপ্ল্যায়েন্সের উৎপাদনের সম্পূর্ণ সক্ষমতা বাংলাদেশের অনেক উৎপাদনকারী কোম্পানিরই রয়েছে। তাই এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সরকারে প্রণীত বিভিন্ন নীতি বিভিন্ন মেয়াদে চলমান রয়েছে এবং দেশীয় উৎপাদকরা নিঃসন্দেহে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা লাভ করে যাচ্ছে।

চীন ও এশিয়ার বিভিন্ন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের ক্রমবর্ধমান শ্রমব্যয়ের কারণে, বড় উৎপাদকরা আরও বেশি সস্তা উৎপাদন গন্তব্যে আউটসোর্স করতে আগ্রহী হচ্ছে। বাংলাদেশ তার শ্রমিকদের সাশ্রয়ী মূল্যের মজুরি কাঠামো, আইটি সেক্টরে ক্রমবর্ধমান দক্ষতা এবং হালকা প্রকৌশল, ভোক্তা ইলেকট্রনিকস উৎপাদনের জন্য ভবিষ্যতের হটস্পট হতে পারে। বাংলাদেশের ইলেকট্রনিকস খাত কোম্পানিগুলোকে প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন এবং কম খরচে শ্রম সম্পদের কারণে বিনিয়োগে প্রচুর রিটার্ন দেয়। বাংলাদেশ, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে শতভাগ বিদেশি মালিকানাসহ বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে। স্থানীয় বাজারজাতকরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র উৎপাদন করতে ট্যাক্স হলিডেসহ আরও বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ দিচ্ছে। ফলে কনজুমার ইলেকট্রনিকস শিল্প বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ দেখায়। ছোট পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে এবং অন্যান্য ম্যাক্রো এবং মাইক্রো অর্থনৈতিক কারণগুলো যেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, এটি খুব সহজেই বলা যায় যে, এ শিল্পটি আরও প্রসার পাবে।

স্থানীয় কোম্পানিগুলো যে আস্থা ও নির্ভরতা নিয়ে উৎপাদনশীলতার পথে এগোচ্ছে, তাতে দেশীয় চাহিদা পূরণ হবে। তবে এই প্রক্রিয়াটি এখনো আন্তর্জাতিক বড় খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগ অবস্থায় চলমান। সেদিন দূরে নয় যখন স্থানীয় উৎপাদক কোম্পানিগুলো পণ্য ও সেবার মান নিশ্চিত করে বৈশ্বিক আস্থা অর্জন করে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের মতো একই জনসংখ্যার ভোক্তা বাজারে প্রতিযোগিতা করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত