চট্টগ্রামে মে মাসে তিন খুনের ইন্ধনদাতা জনপ্রতিনিধিরা!

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৩, ০৫:২৭ এএম

নগরের পাহাড়তলী থানা এলাকায় গত মাসে পৃথক তিনটি খুনের ঘটনা ঘটে। ডিবি পুলিশের তদন্তে এসব ঘটনায় জড়িত আসামিদের ইন্ধনদাতা, পৃষ্ঠপোষকতাকারী হিসেবে কিছু জনপ্রতিনিধির নাম উঠে এসেছে। আবার এসব জনপ্রতিনিধি সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত। তাদের একজন ইলিয়াছ হোসেন। পরিবহন শ্রমিক নেতা হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি পাহাড়তলীতে জোড়া খুনের মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হন। ইলিয়াছ জাতীয় শ্রমিক লীগের পাহাড়তলী থানার সাধারণ সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে এলাকায় কিশোর গ্যাং পরিচালনার তথ্য আছে র‌্যাব ও পুলিশের কাছে।

গত ৯ মে চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী থানাধীন সাগরিকা ও মোড় এলাকায় নারী-সংক্রান্ত ঘটনার জেরে ছুরিকাঘাতে মাসুম ও সজীব নামে দুই যুবক খুন হন। ওইদিন রাতেই চট্টগ্রাম ছেড়ে পালানোর সময় চকরিয়া থেকে কিশোর গ্যাং নেতা ইলিয়াছকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। ডিবি পুলিশের এক উপকমিশনার জানান, পাহাড়তলীর জোড়া খুনে ইলিয়াছের মতো অভিযুক্ত অন্য আসামিরাও স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে খুন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে আসছিল। পাহাড়তলী ও আকবরশাহ থানা এলাকার প্রভাবশালী কয়েকজন সরকারদলীয় রাজনীতিবিদের সঙ্গে ইলিয়াছের যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।

গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য বলছে, কিশোর গ্যাং নেতা ইলিয়াছের সঙ্গে সখ্য রয়েছে ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি ও কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইসমাইল ও উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি ও একই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নিছার উদ্দিন আহমেদ মঞ্জুসহ কয়েকজন। নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (বন্দর) মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইলিয়াছ জানিয়েছিল, পাহাড়তলী থানাধীন সাগরিকা বিটাক মোড়ে তার একটা অফিস আছে। ওই অফিসে বসে দুটি কিশোর গ্যাং পরিচালনা করতেন তিনি। সম্প্রতি দুই কিশোর গ্রুপের মধ্যে নারীঘটিত বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়। পরে তিনি উভয় গ্রুপকে তার অফিসে ডেকে আনেন। বৈঠক চলাকালে তর্কাতর্কি শুরু হলে ইলিয়াছ নিজেই ‘শালাদের ধরে মার’ বলার সঙ্গে একপক্ষ আরেক পক্ষকে ছুরিকাঘাত করে। ছুরিকাঘাতে মাসুম ও সজীব নামে দুই যুবক মারা যান।

একই হত্যাকান্ডে ফয়সাল নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব-৭ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব আলম বলেন, ‘হামলাকারী ও হামলার শিকার দুটি গ্রুপই ইলিয়াছ হোসেন মিঠুর অনুসারী ছিল। শ্রমিক নেতার আড়ালে কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বেও ছিলেন ইলিয়াছ।’

ইলিয়াছের সঙ্গে সখ্যের অভিযোগ নাকচ করে নগরের উত্তর কাট্টলীর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নিছার উদ্দিন আহমেদ মঞ্জু বলেন, ‘ইলিয়াছের সঙ্গে কার সখ্য আছে সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুষ্ঠু তদন্তে বেরিয়ে আসবে।’

পাহাড়তলীতে জোড়া খুনের ঘটনার মাস না যেতেই একই থানার নয়াবাজার বিশ্বরোড এলাকায় আরেকটি নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটে। ২৮ মে আজাদুর রহমান আজাদ নামে এক নৈশপ্রহরীকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে একটি ভিডিওতে তাকে ছুরিকাঘাতকারী আবুল হাসনাত রাজু (৩৪) ও মো. ওসমানের (৩৫) নাম বলে যান আজাদুর। হত্যাকান্ডের পর ভারতে পালানোর সময় এ দুজনকে গ্রেপ্তার করে মহানগর ডিবি পুলিশ। এ ঘটনায় হওয়া মামলাটি তদন্ত করছে মহানগর ডিবি পুলিশ। আজাদুর হত্যাকান্ডে গত ২৯ মে আবু তাহের রাজীব নামে এজাহারভুক্ত এক আসামিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৭।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, আজাদুর খুনে অভিযুক্তরা সরকারদলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তারা দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। তাদের বিরুদ্ধে এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক, জুয়া ও নানা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনারও অভিযোগ রয়েছে। আজাদুর খুনের মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিরা নগরের ২৫ নম্বর রামপুর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও কাউন্সিলর এবং প্যানেল মেয়র আবদুস সবুর লিটনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। আসামিরা প্যানেল মেয়রের ছোট ভাই স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবদুল মান্নান খোকনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।

মহানগর ডিবি পুলিশের উপকমিশনার আলী হোসেন বলেন, ‘গ্রেপ্তারের পর রাজু ও ওসমান জানান, কাউন্সিলর লিটনের ভাইয়ের বাসায় বসে আজাদুরকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। হত্যাকান্ডের আগে ও পরে তারা মান্নানের বাসায় অবস্থান করেছিলেন। আমরা মান্নানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খুঁজছি।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক রমিজ আহমেদ বলেন, ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ওসমান ও রাজু স্থানীয় কাউন্সিলরের ছোট ভাই খোকনের অনুসারী। অভিযোগের বিষয়ে প্যানেল মেয়র আবদুর সবুর লিটন বলেন, ‘কার ইন্ধনে বা পৃষ্ঠপোষকতায় আজাদুর খুন হয়েছেন সেটা আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বলেছেন গ্রেপ্তার আসামিরা। এর বেশি কিছু বলতে চাই না।’

গত ২৮ মে নগরের আকবরশাহ থানাধীন সিটি গেটে একটি বাসে তল্লাশি চালিয়ে বিদেশি পিস্তল, গুলিসহ আরমান গনি (৩১) নামে এক পেশাদার অস্ত্র বিক্রেতাকে আটক করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অভিযুক্ত আরমান চান্দগাঁও থানাধীন খাজা রোডের মো. ইসমাইলের ছেলে। আরমান স্থানীয় চান্দগাঁও ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা মো. এসরারুল হকের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত